আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহি
ওয়াবারাকাতুহু। প্রিয় দর্শক এক শান্ত ও সবুজ উপত্যাকায় বাস করত এক যুবক নাম তার
বিলাল। সে ছিল অত্যন্ত সৎ পরিশ্রমী এবং আল্লাহভীরু। তার জীবনে চাহিদা ছিল খুব কম।
আর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা ছিল অসীম। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে সে
আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাত এবং তার ঈমানকে আরো মজবুত করার জন্য দোয়া করত।
কিন্তু মহান আল্লাহ মাঝে মাঝে তার প্রিয় বান্দাদের কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই
করেন। সেই বছর উপত্যাকায় নেমে এলো এক ভয়াবহ দুর্যোগ। টানা কয়েক মাস ধরে এক
ফোঁটাও বৃষ্টি হলো না। মাঠঘাট শুকরিয়া চৌচির হয়ে গেল। নদীনালা শুকিয়ে পরিণত
হলো ধুষর বালুচরে। বিলালের জমিও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তার সযত্নে বোনা ফসলের
চারাগুলো পানির অভাবে হলুদ হয়ে ধীরে ধীরে মরে যেতে লাগল। বিলাল প্রতিদিন সকালে উঠে
আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতো এক টুকরো কালো মেঘের আশায়। কিন্তু আকাশ থাকতো নির্মেঘ ও
পরিষ্কার। সে গভীর রাতে উঠে তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে দু হাত
তুলে কানতো। হে আমার রব তুমিই তো একমাত্র রিজিকদাতা। তুমিই পারো এই কঠিন অবস্থা
থেকে আমাদের মুক্তি দিতে। আমার উপর রহম করো। হে আল্লাহ। গ্রামের অন্য কৃষকরা হতাশ
হয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছিল। কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাওয়ার কথাও
ভাবছিল। তারা বিলালকে এসে বলতো, বিলাল আর কতদিন অপেক্ষা করবে, দেখছো না সব শেষ হয়ে
যাচ্ছে। চলো আমরাও অন্য কোথাও যাই যেখানে অন্তত দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা থাকবে।
বিলাল তাদের কথা শুনতো আর শান্তভাবে হাসতো। সে বলতো, ভাই, আমি আমার রবের উপর
ভরসা রাখি। তিনি নিশ্চয়ই আমাদের জন্য উত্তম কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছেন। আমি এই
মাটি ছেড়ে কোথাও যাবো না। আমার বিশ্বাস আল্লাহ তার বান্দাকে কখনো নিরাশ করেন না।
তার এই কথা শুনে কেউ কেউ তাকে উপহাস করত। বলতো সে পাগল হয়ে গেছে। কিন্তু বিলাল
তাদের কথায় কান দিত না। তার মন ছিল শান্ত। কারণ সে জানতো তার ভর্ষার জায়গা
কত মজবুত। একদিন যখন তার ঘরে আর এক দানাও খাবার ছিল না, তখন সে শেষবারের মতো তার
শুকিয়ে যাওয়া জমিতে গেল। সে দেখল তার সব ফসল মরে কাঠ হয়ে গেছে। এক বুক দীর্ঘশ্বাস
ফেলে সে মাটিতে বসে পড়ল। তার চোখে পানি চলে এলো। কিন্তু এবার তা হতাশার নয়। বরং
আল্লাহর প্রতি নিজেকে পুরোপুরি শোপে দেওয়ার। সে মনে মনে বলল, হে আল্লাহ, আমি
আমার সবটুকু চেষ্টা করেছি। এখন যা হবে তা তোমারই ইচ্ছা। আমি তোমার সিদ্ধান্তে
সন্তুষ্ট। ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ করেই ঘটলো এক অদ্ভুত ঘটনা। বিলালের জমির এক
কোনায় যেখানে একটি পুরনো গাছের গোড়া ছিল সে দেখতে পেল মাটির ভেতর থেকে হালকা ভেজা
ভাব উঠে আসছে। কৌতুহলী হয়ে সে কাছে গিয়ে মাটি সরালো। আর সাথে সাথেই তার চোখ
বিশ্বয়ে বড় বড় হয়ে গেল। সে যা দেখল তা ছিল এক চরম পরীক্ষার মাঝে আল্লাহর পক্ষ থেকে
পাঠানো এক অলৌকিক ইশারা যা তার ধৈর্যের বাঁধকে এক নতুন উত্তেজনায় কাঁপিয়ে দিল।
বিশ্বয়ে হতবাক হয়ে বিলাল দেখল যেখান থেকে সে মাটি সরিয়েছে সেখান থেকে স্বচ্ছ
পানির একটি ছোট ধারা বুদবুদ করে বেরিয়ে আসছে। এই শুষ্ক মৃতপ্রায় উপত্যকায়
যেখানে এক ফোঁটা পানির জন্য সবাই হাহাকার করছে সেখানে তার নিজের জমিতে পানির উৎস।
সে দ্রুত হাত দিয়ে আরো মাটি সরাতে লাগলো। যতই সে মাটি সরাচ্ছিল পানির ধারাটি ততই
শক্তিশালী হচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট একটি ঝর্ণার মত পানি বইতে শুরু করল।
বিলালের চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়তে লাগল। সে মাটিতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ল এবং
কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো, আলহামদুলিল্লাহ, হে আমার রব তুমি সত্যিই
তোমার বান্দার দোয়া শোনো। তুমি মহান। তুমিই একমাত্র সাহায্যকারী। তার মনে হলো
এই পানি শুধু তার তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নয় বরং এটি ছিল তার অটল বিশ্বাসের পুরস্কার
তার ধৈর্যের ফল। সে উঠে দাঁড়িয়ে প্রাণ ভরে সেই পানি পান করল। বহুদিন পর এমন
মিষ্টি ও ঠান্ডা পানি তার গলা দিয়ে নামতেই যেন তার শরীরের সমস্ত ক্লান্তি দূর
হয়ে গেল। সে তার ছোট্ট মাটির পাত্রটি ভরে নিয়ে কুড়ে ঘরের দিকে ফিরে গেল। তার মনে
হচ্ছিল যেন সে নতুন জীবন পেয়েছে। পরদিন সকাল থেকে বিলাল এক নতুন উদ্যমে কাজে লেগে
গেল। সে একটি ছোট নালা তৈরি করে ঝর্ণার পানি তার শুকিয়ে যাওয়া জমিতে পৌঁছে
দেওয়ার ব্যবস্থা করল। গ্রামের লোকেরা যখন দেখল বিলাল তার মৃত জমিতে কাজ করছে তখন
তারা অবাক হলো। কেউ কেউ তাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগল। একজন বয়স্ক লোক
এগিয়ে এসে বলল, বিলাল কি করছো তুমি? এই মরা জমিতে পানি কোথায় পাবে? বৃথা পরিশ্রম
করে নিজেকে আর কষ্ট দিও না। বিলাল শান্তভাবে বলল চাচা আমার আল্লাহ আমার জন্য
ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। লোকটি কৌতুহলী হয়ে তার সাথে জমির দিকে এগিয়ে গেল। যখন
সে দেখল বিলালের জমির এক কোনা থেকে সত্যিই পানি বের হচ্ছে এবং সেই পানি দিয়ে সে তার
জমিতে সেচ দিচ্ছে। তখন তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। সে দৌড়ে গ্রামে ফিরে গিয়ে
সবাইকে এই অবিশ্বাস্য খবর দিল। খবর শুনে গ্রামের মানুষজন বিলালের জমিতে ভিড়
জমালো। তারা নিজেদের চোখে এই অলৌকিক ঘটনা দেখে অবাক হয়ে গেল। যারা বিলালকে পাগল
বলে উপহাস করেছিল তারা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। তারা বুঝতে পারল এটা বিলালের
ঈমান এবং আল্লাহর উপর তার অটল ভরসার ফল। গ্রামের মোড়ল এগিয়ে এসে বিলালকে বলল,
বিলাল, আমরা তোমার ধৈরি পরীক্ষা নিতে গিয়ে ভুল করেছি। আমরা হতাশ হয়ে
পড়েছিলাম। কিন্তু তুমি আল্লাহর উপর বিশ্বাস হারাওনি। তোমার এই পানি শুধু
তোমার জন্য নয় এটা পুরো গ্রামের জন্য আল্লাহর রহমত। তুমি কি আমাদের এই পানি
ব্যবহার করার অনুমতি দেবে? বিলাল বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বলল, অবশ্যই এই
পানি আমার একার নয়। এটা আমাদের সবার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। আমরা সবাই মিলে
এই পানি ব্যবহার করব এবং আবার আমাদের জমিতে ফসল ফালাবো। বিলালের উদারতায়
গ্রামের সবাই মুগ্ধ হলো। তারা সবাই মিলে কাজে লেগে গেল। ঝর্ণার পানি দিয়ে তারা
নিজ নিজ জমিতে সেজ দেওয়া শুরু করল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই উপত্যকার চেহারা বদলাতে
শুরু করল। শুকিয়ে যাওয়া মাটি আবার নরম হলো। আর কৃষকদের মুখে ফুটে উঠলো নতুন আশার
আলো। কিন্তু শয়তান কি কখনো মানুষের ভালো সহ্য করতে পারে? গ্রামের এক কোনায় বাস
করত এক ধনী, লোভী ও হিংসুটে লোক। নাম তার কাসেম। তার অনেক জমি ও সম্পদ ছিল। কিন্তু
তার মনে কোন শান্তি ছিল না। সে সবসময় অন্যের ভালো দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে
যেত। যখন সে শুনল যে বিলালের জমিতে পানির উৎস পাওয়া গেছে এবং সেই পানি দিয়ে পুরো
গ্রামের মানুষ উপকৃত হচ্ছে তখন তার মনে হিংসার আগুন জ্বলে উঠল। কাসেম ভাবতে লাগলো
একটা সাধারণ ছেলে যার কিছুই ছিল না সে আজ গ্রামের সবার চোখে নায়ক হয়ে গেল। আর আমি
এত সম্পদের মালিক হয়েও কারো চোখে পড়ছি না। এই ঝর্ণা আমার জমিতে হতে পারতো। এই
সম্মান আমার প্রাপ্য ছিল। এই হিংসা থেকেই তার মনে এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের জন্ম নিল।
সে ঠিক করল যেভাবেই হোক এই ঝর্ণার দখল তাকে নিতেই হবে। সে বিলালের জীবনকে আবার
অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার জন্য এক গভীর চক্রান্ত আটতে শুরু করল। যা ছিল বিলালের
জন্য ঈমানের আরো এক কঠিন পরীক্ষার পূর্বাভাস। উপত্যকার সবার জীবন যখন ধীরে
ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছিল। ঠিক তখনই কাসেমের মনে
হিংসার আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না যে বিলালের
মত এক সাধারণ যুবক গ্রামের মানুষের কাছে এত সম্মান পাচ্ছে। তার লোভী মন তাকে
বোঝাতে লাগলো ওই ঝরণার মালিকানা তারই হওয়া উচিত। একদিন গভীর রাতে কাসেম তার
বিশ্বস্ত কয়েকজন লোককে ডেকে পাঠালো। লোকগুলো ছিল নিষ্ঠুর এবং টাকার জন্য যে
কোন কাজ করতে পারত। কাসেম তাদের সামনে তার ঘৃন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরল। শোনো বিলালের
ওই ঝর্ণা আমার চাই। কিন্তু সরাসরি দখল করতে গেলে গ্রামের মানুষ আমার বিরুদ্ধে
চলে যাবে। তাই আমাদের এমন কিছু করতে হবে যাতে বিলাল নিজেই এই গ্রাম ছেড়ে পালাতে
বাধ্য হয় অথবা সবাই তাকে ঘৃণা করতে শুরু করে। তাদের সরদার জিজ্ঞেস করল, হুজুর কি
করতে হবে আমাদের? কাসেম বলল, আমরা বিলালের উপর চুরির অপবাদ দেব। এমন এক চুরি যা
গ্রামের মানুষ কখনো ক্ষমা করবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাসেম তার নিজের
কোষাগার থেকে সবচেয়ে মূল্যবান একটি স্বর্ণের হার চুরি করে লুকিয়ে ফেলল।
হাড়টি ছিল তার বংশের ঐতিহ্য এবং গ্রামের সবাই জানতো এর মূল্য কতখানি। পরদিন সকালে
কাসেম সারা গ্রামে চিৎকার করে বেড়াতে লাগল যে তার সবচেয়ে দামি হাড়ই চুরি হয়ে
গেছে। খবরটি বাতাসের মত ছড়িয়ে পড়ল। গ্রামের মোড়ল এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিরা
কাসেমের বাড়িতে ছুটে এলেন। কাসেম কান্নার অভিনয় করে বলতে লাগলো আমার সব শেষ হয়ে
গেল ওই হারটি আমার পূর্বপুরুষের আমানত ছিল যে আমার এত বড় সর্বনাশ করেছে আমি তাকে
ছাড়বো না মোরল তাকে শান্ত করার চেষ্টা করে বললেন তুমি চিন্তা করো না কাসেম আমরা
সবাই মিলে চোরকে খুঁজে বের করবই ঠিক তখনই কাসেম তার ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় জাল চালল
সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল আমার শুধু একজনকে সন্দেহ হয় সে হলো বিলাল সে ছাড়া আর কে
এমন কাজ করতে পারে সে তো গরীব হয়তো লোভ সামলাতে পারেনি। এই কথা শুনে সবাই চমকে
উঠলো। বিলালের মত একজন আল্লাভিরু ও সৎ যুবক চুরি করতে পারে এটা তাদের বিশ্বাস
হচ্ছিল না। কিন্তু কাসেম এমনভাবে কথাগুলো বলল যেন সে নিশ্চিত। সে আরো যোগ করল।
আপনারা সবাই মিলে ওর কুড়েঘর তল্লাশি করে দেখতে পারেন। আমার বিশ্বাস হারটি সেখানেই
পাওয়া যাবে। কাসেমের লোকেরা আগেই সুযোগ বুঝে রাতের অন্ধকারে হাড়টি বিলালের কুড়ে
ঘরের ভেতরে তার বিছানার নিচে লুকিয়ে রেখে এসেছিল। গ্রামের মানুষ দ্বিধায় পড়ে গেল।
বিলালের সততার প্রতি তাদের বিশ্বাস নাকি কাসেমের এই আত্মবিশ্বাসী অভিযোগ। অবশেষে
মোড়ল সিদ্ধান্ত নিলেন সত্যিটা যাচাই করার জন্য বিলালের ঘর তল্লাশী করা হবে। বিলাল
তখন তার জমিতে কাজ করছিল। তাকে ডেকে আনা হলো। যখন সে শুনল তার উপর চুরির অপবাদ
দেওয়া হয়েছে তখন সে শান্তভাবে বলল আমি কোন চুরি করিনি আমার আল্লাহ সাক্ষী আপনারা
আমার ঘর তল্লাশি করতে পারেন| তার চেহারায় কোন ভয় বা অস্থিরতা ছিল না কারণ সে জানতো
সে নির্দোষ মোড়ল এবং গ্রামের কয়েকজন লোক বিলালের কুড়ে ঘরে প্রবেশ করল কাসেমও
তাদের সাথে ছিল তার মুখে ছিল এক শয়তানি হাসি তল্লাশি শুরু হলো ঘরের সামান্য
আসবাবপত্র ওলটপালট করে খোঁজা হলো কিন্তু কিছুই পাওয়া গেল না গ্রামের মানুষেরা
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে কাসেমের ভাড়াটে সর্দার
যে ভিড়ের মধ্যে মিশে ছিল সে চিৎকার করে উঠলো ওই তো বিছানার নিচে কি যেন চকচক
করছে। একজন এগিয়ে গিয়ে বিলালের বিছানার নিচ থেকে মাটির পাত্র সরাতেই বেরিয়ে এলো
সেই স্বর্ণের হার। মুহূর্তের মধ্যে পুরো দৃশ্যপট পাল্টে গেল। যারা একটু আগেও
বিলালের সততার কথা ভাবছিল তাদের চোখে মুখে এখন অবিশ্বাস ফুটে উঠল। কাসেম বলল আমি
বলেছিলাম না এই হলো তোমাদের সৎ বিলাল সে আমাদের সবার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে
গ্রামের মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ল তারা বিলালকে ঘিরে ধরে নানা কটু কথা বলতে লাগল
আমরা তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম আর তুমি এই প্রতিদান দিলে তোমার মত চোরের এই গ্রামে
কোন জায়গা নেই বিলাল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে বুঝতে পারছিল না কিভাবে
হাড়টি তার ঘরে এলো সে বারবার বলতে লাগলো আল্লাহর কসম আমি এই হাড় চুরি করিনি এটা
আমার বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র কিন্তু প্রমাণের সামনে তার কথা কারো কানে
পৌঁছলো না। মোরল গম্ভীর মুখে রায় দিলেন, বিলাল তুমি আমাদের বিশ্বাসের অমর্যাদা
করেছো। চুরির শাস্তি হিসেবে তোমাকে এই গ্রাম থেকে নির্বাসিত করা হলো। কাল সূর্য
ওঠার আগে তুমি এই উপত্যকা ছেড়ে চলে যাবে। আর ওই ঝরণার পানি এখন থেকে গ্রামের
কৃষকদের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে। যার দেখাশোনার দায়িত্ব কাসেমের উপর দেওয়া
হলো। বিলাল স্তব্ধ হয়ে গেল। তার পৃথিবী যেন এক মুহূর্তে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।যে
যে গ্রামের জন্য সে এত কিছু করল সেই গ্রাম থেকেই তাকে বিতাড়িত করা হচ্ছে। সে বুঝতে
পারল এই সবকিছুর পেছনে ওই হিংসুটে লোকটি রয়েছে। গভীর রাতে বিলাল শেষবারের মতো তার
কুড়ে ঘরে বসেছিল। তার মনে কোন রাগ বা ঘৃণা ছিল না। ছিল শুধু এক গভীর কষ্ট। সে
নামাজের জন্য দাঁড়ালো। সে আল্লাহর কাছে তার সমস্ত যন্ত্রণা উজাড় করে দিল। সে
বলল, "হে আমার রব, তুমি তো সবকিছু দেখছো। তুমি জানো আমি নির্দোষ। আমার উপর এই কঠিন
পরীক্ষা কেন তা তুমিই ভালো জানো। আমি তোমার সিদ্ধান্তেই সন্তুষ্ট। আমাকে ধৈর্য
ধরার শক্তি দাও এবং আমার জন্য যা উত্তম সেই পথে খুলে দাও। নামাজ শেষে এক অদ্ভুত
প্রশান্তি তার মনকে ঘিরে ফেলল। সে বুঝতে পারল এই উপত্যকার মায়া তাকে ত্যাগ করতে
হবে। হয়তো এর পেছনেও আল্লাহর কোন মহান পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে। ভোরের আলো ফোটার
আগেই এক হাতে পানির একটি ছোট পাত্র আর অন্তরে আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাস নিয়ে
বিলাল এক অজানা পথের দিকে যাত্রা শুরু করল। পেছনে ফেলে গেল তার প্রিয় উপত্যকা
তার সাজানো স্বপ্ন আর একরাশ মিথ্যে অপবাদ। তার এই নতুন সফর তাকে কোথায় নিয়ে যাবে
তা ছিল সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। উপত্যকা ছেড়ে বিলাল এক অনিশ্চিত যাত্রাপথে পা বাড়ালো।
তার কোন নির্দিষ্ট গন্তব্য ছিল না। ছিল না কোন পথের দিশা। তার একমাত্র সঙ্গী ছিল
আল্লাহর উপর তার অটল বিশ্বাস। তার সাথে থাকা সামান্য পানিও একসময় শেষ হয়ে গেল।
ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তার শরীর দুর্বল হয়ে পড়ছিল। কিন্তু তার মন ছিল শান্ত। যখনই
তার পা আর চলতে চাইতো না সে মাটিতে বসে পড়তো এবং আল্লাহর কাছে শক্তি চাইতো। সে
মনে মনে বলতো হে আল্লাহ তুমি আমাকে এই পথে এনেছো। তুমি আমাকে পথ দেখাবে। কয়েকদিন
এভাবে চলার পর একদিন দুপুরে সে দূর থেকে ধুলোর ঝড় দেখতে পেল। প্রথমে সে ভাবল এটা
হয়তো সাধারণ মরুঝড় কিন্তু কিছুক্ষণ পর সে বুঝতে পারল একদল ঘোড় হওয়ার
দ্রুতগতিতে তার দিকেই এগিয়ে আসছে তাদের পোশাক এবং হাতে থাকা অস্ত্র দেখে বিলালের
মনে কিছুটা ভয় জন্মালো সে ভাবল এরা হয়তো দুঃস্যু দল পালানোর কোন পথ না দেখে সে
সেখানেই দাঁড়িয়ে আল্লাহর নাম স্মরণ করতে লাগল ঘোড়া সওয়ার দলটি তার সামনে এসে
থামলো তাদের নেতা ঘোড়া থেকে নেমে বিলালের দিকে এগিয়ে এলেন। তার চোখে ছিল তীক্ষ্ণ
দৃষ্টি তিনি রুক্ষ গলায় জিজ্ঞেস করলেন কে তুমি এই জনশূন্য প্রান্তরে একা একা কি
করছো বিলাল শান্তভাবে উত্তর দিল আমার নাম বিলাল আমি একজন মুসাফির আমার কোন
নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই আল্লাহ আমাকে যেদিকে নিয়ে যান আমি সেদিকেই যাচ্ছি
লোকটি বিলালের সরল এবং শান্ত উত্তর শুনে কিছুটা অবাক হলেন। তিনি তার আপাদমস্তক
পর্যবেক্ষণ করলেন। নেতা আবার প্রশ্ন করলেন তোমার সাথে কোন মালপত্র বা সম্পদ নেই তুমি
কি কোন কিছু থেকে পালিয়ে যাচ্ছ বিলাল এক মুহূর্ত ভাবল সে চাইলে তার সাথে ঘটে
যাওয়া অবিচারের কথা বলে সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টা করতে পারতো কিন্তু সে তা
না করে বলল আমি সত্য থেকে পালাচ্ছি না বরং মিথ্যার কাছ থেকে দূরে চলে এসেছি আমার
সবচেয়ে বড় সম্পদ আমার ঈমান আর তা আমার সাথেই আছে বিলালের এই গভীর অর্থবহ কথা
দলনেতার মনে দাগ কাটলো তিনি নিজে একজন জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন এবং
মানুষের চরিত্র বুঝতে পারতেন। তিনি বুঝতে পারলেন এই যুবক কোন সাধারণ মানুষ নয়। তার
পেছনে নিশ্চয়ই কোন কাহিনী আছে। দলনেতা তার সঙ্গীদের ইশারা করে থামতে বললেন এবং
বিলালের পাশে বসলেন। তিনি নিজের পানির পাত্রটি বিলালের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
আমার নাম হাশিম। আমরা এই অঞ্চলের শাসক সুলতানের বিশেষ প্রহরী। আমরা এক পলাতক
অপরাধীকে খুঁজছি। তুমি কি এই পথে কাউকে যেতে দেখেছো? বিলাল পানি পান করে আল্লাহর
শুকরিয়া আদায় করল এবং বলল, না আমি গত কয়েকদিনে কোন মানুষ দেখিনি। হাশিম
বিলালের সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বললেন বিলালের জ্ঞান, তার বিনয় এবং আল্লাহর
প্রতি তার গভীর বিশ্বাস হাশিমকে মুগ্ধ করল। তিনি বুঝতে পারলেন এমন একজন সৎ ও
জ্ঞানী যুবককে এভাবে প্রান্তরে ফেলে যাওয়া ঠিক হবে না। হাশিম একটি সিদ্ধান্ত
নিলেন। তিনি বিলালকে বললেন বিলাল তোমার মত একজন মানুষের জায়গাই জনশূন্য প্রান্তর
নয়। তুমি যদি রাজি থাকো তবে আমাদের সাথে আমাদের রাজধানীতে চলতে পারো। সেখানে তুমি
অন্তত নিরাপদে থাকতে পারবে এবং নিজের যোগ্যতায় কোন কাজ খুঁজে নিতে পারবে।
বিলালের জন্য এটা ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে পাঠানো এক অপ্রত্যাশিত সাহায্য। সে
কৃতজ্ঞতার সাথে রাজি হয়ে গেল। হাশিম তাকে তার নিজের ঘোড়ার পেছনে বসিয়ে নিলেন এবং
তারা রাজধানীর দিকে রওনা হলো। কয়েকদিনের দীর্ঘ যাত্রার পর তারা এক বিশাল ও সমৃদ্ধ
নগরীতে পৌঁছলো। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা সেই নগরীর বিশাল ফটক, সুন্দর রাস্তাঘাট
এবং মানুষের কোলাহল দেখে বিলাল অবাক হয়ে গেল। তার ছোট্ট উপত্যকার জীবনের চেয়ে এ
ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ। হাশিম বিলালকে রাজদরবারের এক কোনায় একটি ছোট থাকার
জায়গা করে দিলেন। তিনি তাকে বললেন, আপাতত তুমি এখানেই থাকো। আমি সুলতানের সাথে কথা
বলে তোমার জন্য কোন কাজের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব। বিলাল নতুন পরিবেশে নিজেকে
মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। সে রাজদরবারের মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায়
করতো এবং বাকি সময় আল্লাহর ইবাদতে মশকুল থাকতো। তার বিনম্র আচরণ, সততা এবং প্রখর
জ্ঞান দরবারের অন্য কর্মচারীদের নজরে পড়ল। একদিন সুলতানের ব্যক্তিগত
গ্রন্থাগারে কিছু পুরনো পুথি গোছানোর কার্য চল ছিল। পুথি গুলো ছিল অত্যন্ত
মূল্যবান এবং সেগুলো পাঠোদ্ধার করার জন্য জ্ঞানী লোকের প্রয়োজন ছিল। হাশিম এই
সুযোগে সুলতানের কাছে বিলালের কথা বললেন। সুলতান প্রথমে একজন সাধারণ যুবকের উপরই
দায়িত্ব দিতে ইতস্তত করছিলেন। কিন্তু হাশিমের অনুরোধে তিনি বিলালকে একবার সুযোগ
দিতে রাজি হলেন। যখন বিলালকে গ্রন্থাগারে আনা হলো সে তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে
সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল। সে এমন সব পুরনো ও জটিল ভাষার পুঁথি অনায়াসে পাঠোদ্ধার
করতে লাগলো যা দরবারের বড় বড় জ্ঞানী ব্যক্তিরাও পারেননি। তার কাজে সুলতান
অত্যন্ত খুশি হলেন। তিনি বুঝতে পারলেন বিলাল কোন সাধারণ যুবক নয় সে এক অমূল্য
রত্ন। সুলতান বিলালকে তার ব্যক্তিগত উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ করলেন। বিলালের
জীবন এক নতুন মোড় নিল। যে যুবককে একদিন মিথ্যা অপবাদ দিয়ে গ্রাম থেকে বের করে
দেওয়া হয়েছিল, সে আজ এক বিশাল সাম্রাজ্যের সুলতানের পাশে জায়গা
পেয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার এত কাছাকাছি এসেও বিলালের মনে কোন অহংকার জন্মালো না। সে
আগের মতোই বিনয়ী এবং আল্লাহভীরু রইল। সে সবসময় সুলতানকে ন্যায় ও সততার সাথে
রাজ্য পরিচালনার পরামর্শ দিত। আসসালামু আলাইকুম। আমাদের ইসলামিক ভয়েস বাংলা
চ্যানেলের ভিডিওগুলো যদি আপনার ভালো লাগে তবে অবশ্যই ভিডিওটিকে লাইক কমেন্ট এবং
শেয়ার করবেন আর নতুন নতুন ইসলামিক গল্প দাওয়া নবীদের জীবনী ও শিক্ষামূলক ভিডিও
পেতে আমাদের চ্যানেলটিকে সাবস্ক্রাইব করতে ভুলবেন না আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত
দান করুন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা দান করুন আমিন
Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.
Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact