আপনি কি কখনো একটু শান্ত হয়ে ভেবে দেখেছেন প্রতিবছর এই যে আমরা পশু কুরবানি করি এর পেছনের আসল ঘটনাটি কি? এটা কি শুধুই গোস্ত খাওয়ার কোন উৎসব? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এমন এক ঈমান পরীক্ষার ইতিহাস। একজন বয়স্ক বাবা তার নিজের সবচেয়ে আদরের সন্তানকে সাথে নিয়ে যাচ্ছেন ধূষর মরুভূমির দিকে নিজের হাতে সেই জলজান্ত সন্তানের গলায় ধারালো ছুরি চালানোর জন্য। একটু চোখ বন্ধ করে চিন্তা করুন তো দৃশ্যটা। আজ আমরা জানবো সেই সত্য ইতিহাস। চলুন তাহলে এই বাস্তব ঘটনাটি শুরু করা যাক। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন মহান আল্লাহ তা'আলার একজন অনেক বড় এবং প্রিয় নবী। তাকে বলা হয় মুসলিম জাতির পিতা। তিনি সারাজীবন মানুষকে এক আল্লাহর দিকে ডেকেছেন। মূর্তি পূজার বিরুদ্ধে কথা বলার কারণে তৎকালীন নিষ্ঠুর রাজা নমরুদ তাকে বিশাল এক জ্বলন্ত আগুনের কুন্ডলীতে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তা'আলার প্রতি তার ঈমান এতই মজবুত ছিল যে তিনি একটুও ভয় পাননি। মহান আল্লাহ তাআলাও তার প্রিয় নবীকে রক্ষা করার জন্য আগুনকে নির্দেশ দিলেন, হে আগুন তুমি ইব্রাহিমের জন্য শান্ত ও আরামদায়ক হয়ে যাও। সেই দাউ দাউ করে জ্লা আগুন সাথে সাথে ঠান্ডা হয়ে গেল। আল্লাহ তাআলাকে খুশি করার জন্য তিনি নিজের জীবন দিতেও পিছন পা হননি। কিন্তু এই মহান নবীর জীবনে একটা অনেক বড় কষ্টের জায়গা ছিল। আর সেটা হলো তার কোন সন্তান ছিল না। বছর যায় দশক যায় কিন্তু তার ঘর আলো করে কোন বাচ্চা আসে না। একজন মানুষের জীবনে সন্তানের অভাব যে কতটা কষ্টের তা শুধু সেই বুঝতে পারে যার সন্তান নেই। চারপাশের মানুষ কত কথা বলতো কিন্তু তিনি সব ধৈর্য ধরে সহ্য করতেন। এভাবে বয়স বাড়তে বাড়তে তিনি যখন একেবারে বৃদ্ধ হয়ে গেলেন তার বয়স যখন 86 বছর হয়ে গেল তখন তিনি মহান আল্লাহর দরবারে হাত তুলে খুব কান্নাকাটি করে একটা দোয়া করলেন। তিনি বললেন, হে আমার রব আপনি আমাকে একটা নেককার সন্তান দান করুন। মহান আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় নবীর এই দোয়া সাথে সাথে কবুল করে নিলেন। এরপর হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের ঘরে জন্ম নিলেন এক সুন্দর ফুটফুটে সন্তান। তার নাম রাখা হলো হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম। 86 বছর বয়সে একদম বৃদ্ধ বয়সের সন্তান হওয়ায় হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তার ছেলে হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে নিজের জীবনের চেয়েও খুব বেশি ভালোবাসতেন। তাকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করতে চাইতেন না। কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা তার এই ভালোবাসার উপর একের পর এক অনেক বড় পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সন্তান যখন একদম ছোট তখন আল্লাহর নির্দেশে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তার স্ত্রী এবং কোলের শিশুকে মক্কার জনমানবহীন ধূষর মরুভূমিতে রেখে আসার জন্য রওনা [মিউজিক] হলেন যেখানে কোন পানি নেই কোন গাছপালা নেই চারদিকে শুধু খা করছে গরম বালি সেখানে তাদের রেখে যখন তিনি ফিরে আসছিলেন তখন তার স্ত্রী পিছন থেকে ডাক দিয়ে বললেন আপনি কি আমাদের এই নির্জন মরুভূমিতে একা রেখে যাচ্ছেন হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম কোন উত্তর দিলেন তখন তার স্ত্রী বুঝতে পারলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন এটা কি মহান আল্লাহ তাআালার নির্দেশ হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম মাথা নেড়ে বললেন হ্যাঁ তখন সেই ঈমানদার স্ত্রী বললেন তাহলে আপনি নিশ্চিন্তে যান যে আল্লাহ আমাদের এখানে রাখতে বলেছেন সেই আল্লাহ আমাদের ধ্বংস হতে দেবেন না এরপর পানির তৃষ্ণায় ছোট্ট শিশু হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম যখন মরুভূমির বালিতে পা ছুড়ে কান্নাকাটি করছিলেন তখন মা পানির খোঁজে সাফা এবং মারওয়া পাহানের এর মাঝখানে পাগলের মতো সাতবার দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন। মহান আল্লাহ তাআলা জিবরাঈল আলাইহিস সালামকে পাঠিয়ে সেখানে জমজম কূপের সৃষ্টি করে তাদের রক্ষা করেছিলেন। এভাবে দিন পার হতে লাগল। মরুভূমির সেই কষ্টকর পরিবেশে হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলেন। তিনি যখন একটু বড় হলেন তখন শুরু হলো ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং কঠিন পরীক্ষা। তখন হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের বয়স ছিল 13 বছরের কাছাকাছি। জিলহজ মাসের 8 তারিখ রাতে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম শান্তিতে ঘুমিয়েছিলেন। হঠাৎ তিনি স্বপ্নে দেখলেন মহান আল্লাহ তাআলা তাকে বলছেন, "হে ইব্রাহিম, তুমি তোমার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস আমার রাস্তায় কুরবানী করো। সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি ভাবলেন, আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস তো উট। তাই তিনি আল্লাহর রাস্তায় 100 টি উট কুরবানী করে দিলেন। এর পরের দিন অর্থাৎ জিলহজ মাসের 9 তারিখ রাতেও তিনি আবার একই স্বপ্ন দেখলেন। তখন তিনি চিন্তা করলেন নবীদের স্বপ্ন তো কোন সাধারণ মানুষের মতো স্বপ্ন নয়। নবীদের স্বপ্ন হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সরাসরি নির্দেশ ওহী। পৃথিবীতে আমার কাছে আমার আদরের ছেলে হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের চেয়ে বেশি প্রিয় আর কিছুই নেই। তার মানে মহান আল্লাহ তাআলা আমাকে আমার নিজের ছেলেকে কুরবানী করতে বলছেন। এটা বুঝতে পেরে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের বুকটা কেঁপে উঠলো। সারা জীবনের দোয়ার ফসল 86 বছর বয়সে পাওয়া বুকের ধনকে নিজের হাতে জবাই করতে হবে যে কোন বাবার কলিজা ফেটে যাওয়ার কথা। কিন্তু তিনি তো আল্লাহর নবী। আল্লাহর নির্দেশ পালন করার জন্য তিনি নিজের জানও দিয়ে দিতে পারেন। তিনি মন স্থির করে ফেললেন যে আল্লাহর হুকুমের সামনে দুনিয়ার কোন মায়া কোন ভালোবাসা তিনি রাখবেন না। এরপর হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তার স্ত্রী অর্থাৎ হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের মাকে গিয়ে বললেন, ছেলেকে ভালো করে গোসল করিয়ে সবচেয়ে সুন্দর জামাকাপড় পড়িয়ে দিন। আমরা একটু বাইরে যাব। মা তো আর জানতেন না যে বাবা ছেলেকে আজ কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি খুব খুশি মনে তার ছেলেকে খুব সুন্দর করে সাজিয়ে দিলেন। চোখের সুরমা পড়িয়ে দিলেন। চুলে তেল দিয়ে সুন্দর করে আঁচড়ে দিলেন। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম একটা ধারালো ছুরি আর একটা শক্ত রশি নিজের সাথে লুকিয়ে নিলেন যাতে ছেলে বা মা প্রথমেই ছুরি আর রশি দেখে ভয় না পেয়ে যায়। এরপর বাবা আর ছেলে মিলে মিনার ময়দানের দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে একসময় হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তার ছেলের কাছে আসল কথাটি খুলে বললেন। পবিত্র কোরআনের ভাষায় তিনি তার ছেলেকে অত্যন্ত আদরের সাথে ডাক দিয়ে বললেন, হে আমার আদরের ছেলে আমি তো স্বপ্নে দেখেছি যে আমি তোমাকে জবাই করছি। অর্থাৎ কুরবানি করছি। এখন তুমি চিন্তা করে দেখো তোমার মতামত কি? একটু ভেবে দেখুন, একটা 13 বছরের ছোট্ট বাচ্চাকে যদি বলা হয়, যে তাকে আজ জবাই করা হবে, তাহলে সে কি করবে? সে ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করবে। বাবার হাত ছাড়িয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। কিন্তু হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম তো সাধারণ কোন বাচ্চা ছিলেন না। তিনিও ছিলেন একজন ভবিষ্যৎ নবী। তিনি একটুও ভয় পাননি। একবারের জন্যও কানলেন না। তিনি তার বাবাকে খুব শান্ত ও আদবের সাথে বললেন, হে আমার বাবা, আপনাকে আল্লাহ তাআলা যে নির্দেশ দিয়েছেন, আপনি সেটাই পালন করুন। আপনি ইনশাআল্লাহ আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। আমি একটুও কষ্ট পেয়ে ছটফট করব না। ছেলের মুখে এই ঈমানদীপ্ত কথা শুনে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের চোখ দিয়ে অঝরে পানি চলে আসলো। তিনি তার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন এবং আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন যে আল্লাহ তাকে এমন এক নেককার সন্তান দিয়েছেন। তারা আবার মক্কার পথ ধরে মিনার দিকে এগোতে লাগলেন। এদিকে এইসব দৃশ্য দেখে ইবলিশ শয়তান খুব চিন্তায় পড়ে গেল। শয়তান বুঝতে পারল আজ যদি ইব্রাহিম এই কুরবানি সত্যি [মিউজিক] সত্যি করে ফেলে তাহলে তো মহান আল্লাহর কাছে তার এবং তার ছেলের সম্মান অনেক বেশি বেড়ে যাবে যা শয়তান কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিল না শয়তান চিন্তা করল এই তো শেষ সুযোগ এদেরকে ধোঁকা দিতেই হবে এদের মনে সন্দেহ ঢোকাতেই হবে এবং এই কুরবানির যে কোন মূল্যে আটকাতে হবে তাই শয়তান মানুষের রূপ ধারণ করে এক বৃদ্ধ মানুষের বেশে এসে তাদের রাস্তার সামনে এসে দাঁড়ালো এবং ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে বলতে লাগলো হে ইব্রাহিম তুমি কি পাগল হয়ে গেছো? তুমি কি বুঝতে পারছো না যে তুমি কি করতে যাচ্ছ? এটা কোন আল্লাহর নির্দেশ হতে পারে না। এটা তোমার মনের একটা ভুল ধারণা। তুমি কি তোমার এত আদরের ছেলেকে তোমার বৃদ্ধ বয়সের একমাত্র সম্বলকে নিজের হাতে জবাই করবে? তুমি এটা করো না। ফিরে যাও। কিন্তু ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম খুব ভালো করেই জানতেন যে এটা শয়তানের ধোঁকা। তিনি সাথে সাথে শয়তানের কথায় কান না দিয়ে তাকে পাথর ছুড়ে মারলেন। শয়তান সেখান থেকে পালিয়ে গেল। একটু দূর যাওয়ার পর শয়তান আবার আরেক জায়গায় দাঁড়িয়ে তাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করল। এবারেও হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তাকে পাথর ছুড়ে তাড়িয়ে দিলেন। এভাবে শয়তান মোট তিন জায়গায় তাদের ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আর হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তিন জায়গাতেই সাতটি করে পাথর ছুড়ে শয়তানকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন আজ পর্যন্ত আমরা যারা হজে যাই তারা মিনার সেই তিন জায়গায় শয়তানকে পাথর ছুড়ে মারি যা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সেই পাথর ছোড়ার স্মৃতি হিসেবে পালন করা হয় শয়তানের ধকা থেকে পার হয়ে বাবা ও ছেলে মিনার সেই নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে পৌঁছালেন। চারদিক একদম নিড়িবিলি জনমানবহীন একটা জায়গা। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তার সাথে থাকা দড়ি আর ছুরিটা বের করলেন। তখন ছোট্ট ছেলে হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম তার বাবাকে দেখে কয়েকটি খুব আবেগময় কথা বললেন। যা শুনলে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম বললেন, হে আমার আদরের বাবা, আপনি আমাকে এই দড়ি দিয়ে খুব শক্ত করে বেঁধে নিন যাতে ছুরির ব্যথায় আমি ছটপট করে আপনার গায়ে কোন আঘাত না করে ফেলি। কারণ আমি যদি ব্যথায় আপনার সাথে বেয়াদবি করে ফেলি। তবে আল্লাহ আমার উপর রাগ করবেন। আর বাবা আপনার ছুরিটা খুব ভালো করে ধারালো করে নিন। যাতে আমার গলায় যখন আপনি ছুরিটা চালাবেন তখন খুব তাড়াতাড়ি আমার প্রাণটা বেরিয়ে যায় এবং আমার কষ্ট কম হয়। বাবা আপনি আমাকে উপুর করে শুয়ে দিন। আমার মুখের দিকে তাকাবেন না। কারণ আমার মুখের দিকে তাকালে আপনার মনে আমার জন্য মায়া চলে আসতে পারে। আর তখন হয়তো আপনি আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে পারবেন না। আর বাবা আমার গায়ে যে জামাটা আছে সেটা সাবধানে খুলে রাখুন। রক্ত লেগে জামাটা যেন নষ্ট না হয়ে যায়। আমার এই জামাটা আমার মায়ের কাছে নিয়ে যাবেন। আমার মা যখন আমার জন্য খুব কান্নাকাটি করবেন তখন এই জামাটা দেখে তিনি বুকে একটু শান্তি পাবেন। ছেলের মুখে এমন বড় বড় এবং বুকের ভেতর দাগ কেটে যাওয়া কথা শুনে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের মনের অবস্থা কেমন হয়েছিল তা একবার চিন্তা করুন। তিনি চোখের পানি মুছলেন আর নিজের ছেলেকে শেষবারের মত বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিলেন। এরপর তিনি তার আদরের সন্তানকে মাটিতে উপুর করে শুয়ে দিলেন। ঠিক যেভাবে হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম বলেছিলেন, সন্তানের হাত পা শক্ত করে বাঁধা হলো। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম নিজের চোখটা একটা কাপড় দিয়ে খুব শক্ত করে বেঁধে নিলেন, যাতে ছেলের কষ্ট দেখে হাত কেঁপে না ওঠে। এরপর তিনি তার হাতের সেই ধারালো ছুরিটা হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের গলায় বসিয়ে দিলেন। তিনি নিজের পুরো শক্তি দিয়ে ছুরি চালাতে শুরু করলেন। একবার দুইবার তিনবার। কিন্তু একি এত ধারালো ছুরি দিয়ে জবাই করার পরও গলা তো কাটছে না। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম খুব অবাক হলেন। তিনি আবার নিজের সবটুকু জোর দিয়ে ছেলের গলায় ছুরি টানতে লাগলেন। কিন্তু না গলার চামড়ার একটু জায়গাও কাটলো না। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম খুব হতাশ হয়ে পড়লেন। তিনি রাগের মাথায় হাতের ছুরিটা পাশে থাকা একটা পাথরের উপর সজরে ছুড়ে মারলেন। পাথরের গায়ে লাগার সাথে সাথে সেই পাথরটা দুই টুকরো হয়ে গেল। তখন হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ছুরিকে উদ্দেশ্য করে বললেন হে ছুরি তুমি এত শক্ত পাথরকে দুই টুকরো করে দিলে আর একটা নরম গলার চাম্মা কাটতে পারছ না কেন কাটছো না তুমি মহান আল্লাহর হুকুমে তখন সেই ছুরি কথা বলে উঠল ছুরি বলল হে আল্লাহর নবী আপনি আমাকে জবাই করার জন্য নির্দেশ দিচ্ছেন কিন্তু মহান আল্লাহ তাআলা যিনি সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি কোনভাবেই ইসমাইলের গলায় একটুও আচড় না কাটি আপনার নির্দেশ বড় নাকি আল্লাহর নির্দেশ বড়? আমি কিভাবে আল্লাহর হুকুম অমান্য করি? হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম অবাক হয়ে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে আসমান থেকে মহান আল্লাহ তাআলা তার প্রিয় ফেরেশতা জিব্রাইল আলাইহিস সালামকে পাঠিয়ে দিলেন। জিব্রাইল আলাইহিস সালাম চোখের পলকে বেহেশত থেকে খুব সুন্দর একটা তরতাজা বড় দুম্বা নিয়ে পৃথিবীতে নেমে আসলেন। তিনি এসে দেখলেন যে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ছুরি চালাচ্ছেন। তখন জিব্রাইল আলাইহিস সালাম জোরে জোরে বলে উঠলেন, আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আকবার। এই আওয়াজ শুনে হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম বুঝতে পারলেন যে আল্লাহর সাহায্য চলে এসেছে। তখন তিনি বললেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার। আর হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম বললেন আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ। আজ পর্যন্ত আমরা ঈদের দিনগুলোতে এই তাকবীরটি খুব আনন্দের সাথে পাঠ করে থাকি। এরপর জিব্রাইল আলাইহিস সালাম হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামকে সেই জায়গা থেকে সরিয়ে দিলেন এবং ঠিক সেই জায়গায় জান্নাতের সেই দুম্বাটিকে শুইয়ে দিলেন। হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম তো চোখ বেঁধে রেখেছিলেন। তিনি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলেন না। তিনি নিজের পুরো শক্তি দিয়ে ছুরি চালালেন এবং অনুভব করলেন যে জবাই সম্পন্ন হয়েছে। রক্তে মাটি ভিজে গেল। তিনি মনে মনে ভাবলেন যে তিনি আল্লাহর নির্দেশ পুরোপুরি পালন করেছেন এবং নিজের সবচেয়ে আদরের ছেলেকে কুরবানী করে দিয়েছেন। তিনি যখন আস্তে আস্তে তার চোখের বাঁধনটা খুললেন তখন তিনি এমন একটা দৃশ্য দেখলেন যা দেখে তিনি পুরোপুরি অবাক হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন যে তার আদরের ছেলে হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম একদম সুস্থ অবস্থায় একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছেন। আর তার জায়গাতে একটা বিশাল বড় সুন্দর জান্নাতি দুম্বা জবাই হয়ে রক্তে ভেসে আছে। এই দৃশ্য দেখে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। তিনি দৌড়ে গিয়ে তার কলিজার টুকরা সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। মহান আল্লাহ তা'আলার তরফ থেকে আওয়াজ আসলো, হে ইব্রাহিম তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যি করে দেখিয়েছো। আমি তো শুধু তোমার মন পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম যে আমি তোমাকে বেশি ভালোবাসো নাকি নিজের আদরের সন্তানকে বেশি ভালোবাসো। [মিউজিক] তুমি এই কঠিন পরীক্ষায় খুব ভালোভাবে পাশ করেছো। আমি এভাবেই নেককার এবং ভালো মানুষদের পুরস্কার দিয়ে থাকি। আসলে মহান আল্লাহ তাআলা কখনোই চাননি যে একজন বাবা তার নিজের ছেলেকে জবাই করুক। আল্লাহ তাআলা শুধু দেখতে চেয়েছিলেন হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের মনের ভেতর আল্লাহর প্রতি কতটা ভালোবাসা আছে। তিনি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে আল্লাহর হুকুমের সামনে দুনিয়ার [মিউজিক] কোন মায়াই তার কাছে বড় নয়। মহান আল্লাহতালা পিতা ও পুত্রের এই চরম ত্যাগ ও পরীক্ষাকে এত বেশি পছন্দ করলেন যে কিয়ামত পর্যন্ত আসা সমস্ত সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য এই কুরবানী করাকে ওয়াজিব বা অবশ্য পালনীয় একটি ইবাদত হিসেবে ঠিক করে দিলেন। আজ যে আমরা প্রতিবছর জিলহজ্ মাসে গরু, ছাগল, ভেড়া, উট বা দুম্বা দিয়ে কুরবানী করি এটা মূলত আমাদের পিতা হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের সেই পবিত্র ইতিহাস ও ত্যাগের স্মৃতিকেই আমাদের মনে মনে করিয়ে দেয়। আমরা যখন পশুর গলায় ছুরি চালাই তখন আসলে আমাদের মনের ভেতরের লোভ- অহংকার আর দুনিয়ার প্রতি যে মায়া আছে সেটাকেই জবাই করতে বলা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ তাআলা খুব পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন যে আল্লাহর কাছে কুরবানির পশুর গোশত বা রক্ত কিছুই পৌঁছায় না বরং আল্লাহর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের মনের ভয় বা তাকওয়া। অর্থাৎ তুমি কতটা খাঁটি নিয়তে এবং শুধু আল্লাহকে রাজি খুশি করার জন্য কুরবানী করছো। আল্লাহ তাআলা শুধু সেটাই দেখেন। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা কুরবানী করেন শুধু অন্য মানুষকে দেখানোর জন্য। কে কত বেশি দাম দিয়ে গরু কিনলো, কার গরু কত বড় এই নিয়ে তারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করেন। আবার অনেকে ভাবেন যে কুরবানী মানেই শুধু সারা বছরের জন্য ফ্রিজ ভর্তি করে গোস্ত জমিয়ে রাখা আর খুব মজা করে খাওয়া। কিন্তু সহিহ হাদিস এবং কোরআনের আলোকে আমরা খুব ভালো করেই বুঝতে পারলাম যে কুরবানির আসল উদ্দেশ্য এটা একেবারেই নয়। কুরবানী হলো নিজের মনের অহংকার দূর করে আল্লাহর প্রতি নিজেকে পুরোপুরি সোপে দেওয়া। তাই এই সামনের কুরবানির ঈদে আমরা যখন পশু কুরবানী করব তখন আমাদের মনে হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালামের সেই বাস্তব ইতিহাসকে স্মরণ রাখতে হবে। কুরবানির গোশত নিজেরা খাবো। গরীব দুঃখীদের দেব এবং আত্মীয়স্বজনদের বাসায় পাঠাবো। মহান আল্লাহ তাআলা যেন আমাদের সবাইকে সঠিক নিয়তে কুরবানী করার তৌফিক দান করেন। আমিন।
Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.
Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact