খলিফা উমর (রাঃ) কেন এই সাহাবীকে সেনাপতি বানাতে ভয় পেতেন? | Bara Bin Malik (RA)

ইমানের আলো2,406 words

Full Transcript

চোখ বন্ধ করে একবার দৃশ্যটা কল্পনা করুন। চারদিকে হাজার হাজার রক্ত পিপাসু শত্রু। তাদের চোখে মুখে হিংস্রতা। হাতে চকচকে ধারালো কলোয়ার আর বিষ মাখানো তীর মাঝখানে একটি বিশাল দুর্গ যার দরজা ভেতর থেকে শক্ত করে বন্ধ করা। দুর্গের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক ভন্ড নদী। আর তার বিশাল হিংস্র সেনাবাহিনী। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিম বাহিনী চরম হতাশ হয়ে পড়েছে। তারা বুঝতে পারল এই দুর্গের পাহাড় সমান উঁচু দেয়াল টপকানো বা লোহার মজবুত দরজা ভাঙ্গা কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় ঠিক সেই চরম হতাশার মুহূর্তে মুসলিম বাহিনীর ভেতর থেকে একজন অতি সাধারণ রোগা পাতলা মানুষ সামনে এগিয়ে এলেন। তিনি মুসলিম সেনাপতিকে এমন এক পাগলাটে এবং ভয়ঙ্কর প্রস্তাব দিলেন যা শুনে বড় বড় বীর সাহাবীদেরও আত্মা কেঁপে উঠল। তিনি বললেন তোমরা আমাকে একটা বড় শক্ত ঢালের উপর বসাও। তারপর সবাই মিলে বর্ষা দিয়ে আমাকে শূন্যে তুলে ওই দুর্গের দেয়ালতোপকে সোজা হাজার হাজার শত্রুর মাঝখানে ছুড়ে মারো। আমি একা ওদের সাথে লড়বো আর ওই দরজা ভেতর থেকে খুলে দেব। একবার ভাবা যায়? একজন একা মানুষ হাজার হাজার তলোয়ারের মাঝখানে ঝাপ দিতে চাইছেন। এটা কি কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নাকি এটা নিশ্চিত মৃত্যু? কে ছিলেন এই অকুতভাই বীর? কেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা? হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে কখনো কোন সেনাদলের প্রধান বানাতে চাইতেন না এবং কি ঘটেছিল সেই মৃত্যুর বাগানে চলুন আজ আমরা ইসলামের ইতিহাসের সেই রক্তক্ষয়ী ময়দানে ফিরে যাই যে ইতিহাস শুনলে আপনার শরীরের পশম দাঁড়িয়ে যাবে আর ঈমান নতুন করে জেগে উঠবে সময়টা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের ঠিক পরের কথা মদিনায় তখন প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু এর শাসনকাল চলছে নবীজির ইন্তেকালের খবর শুনে আরবের বিভিন্ন দিকে হঠাৎ করে বিশৃঙ্খলা শুরু হলো। অনেকেই ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী হতে শুরু করল। আর সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে দাঁড়ালো বেশ কয়েকজন ভন্ড নবী। এদের মধ্যে সবচেয়ে ধুর্ত হিংস্র এবং শক্তিশালী ছিল মুসাইলামা কাজ্জাব বা চরম মিথ্যুক মুসাইলামা। ইয়ামামা নামক এলাকায় সে নিজেকে নবী বলে দাবি করল। তার গোত্রের নাম ছিল বানু হানিফা। এই গোত্রের প্রায় 4 হাজার দুর্ধর্শ যোদ্ধা এই ভন্ড নবীর পক্ষে অস্ত্র ধরল তারা মদিনার দিকে তেড়ে আসার এবং ইসলামকে ধ্বংস করার হুমকি দিল খলিফা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বুঝতে পারলেন এই ফিতনা বা বিপদকে এখনই সমূলে উপরে না ফেললে ইসলামের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে [মিউজিক] তিনি কাল বিলম্ব না করে ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাপতি আল্লাহর তরবারি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর নেতৃত্বে এক বিশাল মুজাহিদ বাহিনী পাঠা ইয়ামামার দিকে। এই মুসলিম বাহিনীর ভেতরেই এমন একজন সাহাবী ছিলেন যার নাম শুনলেই কাফেরদের অন্তরে ভয় ঢুকে যেত। তিনি দেখতে [মিউজিক] হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ বা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর মত সুঠাম দেহের অধিকারী ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন খুব রোগা পাতলা। গায়ের রং ছিল কালো। শরীরের হাড্ডিগুলো গোনা যেত আর চুলগুলো ছিল উষ্ক খুষ্ক। দেখলে মনে হতো খুব সাধারণ একজন মানুষ। কিন্তু তার বুকের ভেতর যে ঈমানের আগুন জ্বলছিল, তা পৃথিবীর যেকোনো আগ্নেয়গিরির চেয়ে উত্তপ্ত ছিল। তার নাম হযরত বারা ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি ছিলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের 10 বছরের খাদেম বিখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু এর আপন ভাই। হযরত বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন [মিউজিক] এমন একজন মানুষ যিনি মৃত্যুকে এক বিন্দুও ভয় পেতেন না বরং তিনি মৃত্যুকে পাগলের মত খুঁজতেন তিনি চাইতেন [মিউজিক] যেভাবেই হোক আল্লাহর রাস্তায় যেন তার মৃত্যু হয় তিনি যুদ্ধে গেলে নিজের জীবনের কোন মায়া করতেন না [মিউজিক] গায়ে কোন বর্ম পড়তেন না এমনভাবে শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়তেন যে মনে হতো তিনি নিজের জন্য শাহাদাতের পেয়ালা খুঁজছেন। তার এই ভয়ঙ্কর সাহসিকতা আর মৃত্যুর প্রতি ভালোবাসার কথা আরবের সবাই জানতো। এতটাই জানতো যে পরবর্তীতে খলিফা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু তার সব গভর্নরদের কাছে একটি কড়া লিখিত নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন। তিনি চিঠিতে লিখেছিলেন খবরদার তোমরা বারা ইবনে মালিককে কখনো কোন সেনাদলের প্রধান বানাবে না। [মিউজিক] কারণ ও মৃত্যুকে এত ভালোবাসে যে সেনাপতি হলেও পুরো বাহিনীকে নিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঝাপিয়ে পড়বে। সেই মৃত্যুর পাগল বারা ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু এখন ইয়ামামার রণাঙ্গনে দাঁড়িয়ে আছেন। যুদ্ধ শুরু হল। ইয়ামামার যুদ্ধ ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম ভয়ানক এবং রক্তক্ষয়ী একটি যুদ্ধ। মুসাইলামা কাজ্জাবের 4 হাজার সৈন্য ছিল চরম উগ্র। প্রথমদিকে যুদ্ধের ময়দানে মুসলিমদের চরম বিপদে পড়ে যায়। কাফেরদের প্রবল আক্রমণে মুসলিমদের সারি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। চোখের সামনে অনেক বড় বড় বীর সাহাবী এবং কুরআনের হাফেজ শহীদ হতে লাগেন। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হলো যে কাফেররা মুসলিমদের তাবু পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারা মুসলিমদের জিনিসপত্র লুট করতে শুরু করে। এই দৃশ্য দেখে হযরত বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর চোখের সামনে যেন ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। তিনি তার ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে মাটিতে নেমে পড়েন। হাতের তলোয়ার শক্ত করে ধরে তিনি তার কওমের লোকদের ডাক দিয়ে বজ্রকণঠে চিৎকার করে উঠলেন। হে আনসাররা তোমরা কি পালাচ্ছো? কোথায় পালাবে তোমরা? মদিনায় আজ থেকে মদিনা বলতে তোমাদের আর কিছু নেই। আজ তোমাদের সামনে শুধু দুটো জিনিস। এক আল্লাহ আর দুই জান্নাত। আল্লাহর কসম আমি বারা ইবনে মালিক আজ এখান থেকে এক পাও নড়বো না। এই কথা বলে বারা ইবনে মালিক একা কাফেরদের বিশাল বাহিনীর দিকে ঝড়ের বেগে ছুটে গেলেন। তার হাতের তলোয়ার যেন বিদ্যুতের মত চমকাতে লাগলো। ডানে বামে সামনে পেছনে কাফেরদের কচুকাটা করতে শুরু করলেন। তার এই রুদ্র মূর্তি আর মরণপন্ন লড়াই দেখে অন্য মুসলিমদের শিরায় শিরায় নতুন করে রক্ত টকবক করে উঠলো। তারা আবার ঘুরে দাঁড়ালো। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তার বাহিনীকে নতুন করে সাজালেন শুরু হলো এক মহা প্রলয়ঙ্করী প্রত্যাক্রমণ এই মুসলিমদের প্রচন্ড ঈমানী আক্রমণের সামনে মুসাইলামা কাজ্জাবের বিশাল বাহিনী আর টিকতে পারল না তারা লেজ গুটিয়ে ময়দান ছেড়ে পালাতে শুরু করল কিন্তু তারা পালিয়ে গেল কোথায় তারা পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিল ইয়ামামার এক বিশাল দুর্গে দুর্গটি আসলে একটি বিশাল বাগান যার চারপাশ পাহাড়ের মত উঁচু আর পাথরের মত শক্ত দেয়াল দিয়ে ঘেরা এর নাম ছিল হাদিকাতুর রহমান বা দয়াময়ের বাগান। কিন্তু এই যুদ্ধের পর থেকে ইতিহাস এই বাগানকে এক নতুন নামে চেনে। হাদিকাতুল মাউথ বা মৃত্যুর বাগান। ভন্ড নবী মুসাইলামা তার হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে সেই বাগানে ঢুকে পড়ল এবং ভেতর থেকে বিশাল লোহার দরজা শক্ত করে বন্ধ করে দিল। মুসলিম বাহিনী সেই দেয়ালের বাইরে এসে আটকা পড়ল। দেয়াল এত উঁচু যে টপকানোর কোন উপায় নেই। দরজা এত মজবুত যে হাতির পাল দিয়েও ভাঙ্গা অসম্ভব। আর কাফেররা দেয়ালের উপর থেকে বৃষ্টির মত তীর আর পাথর ছুড়ছে। মুসলিমরা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আর ভেতরে মুসাইলাম নিরাপদে হাসছে সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু চিন্তায় পড়ে গেলেন। যদি এই ভন্ড নবী আজ বেঁচে যায় তাহলে সে আবার নতুন করে বাহিনী তৈরি করবে। ইসলাম আবার বিপদে পড়বে। কিন্তু ভেতরে তো ঢোকার কোন রাস্তাই নেই। কি করা যায় এখন? চারদিকে এক চরম হতাশা নেমে এলো। ঠিক সেই চরম মুহূর্তে যখন সবাই ভাবছে আজ কিছু করা সম্ভব নয়, তখনই সেই রোগা পাতিলা ধুলোমাখা মানুষটি হযরত বারা ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু সেনাপতির সামনে এসে দাঁড়ালেন। হযরত বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর চোখে মুখে কোন ভয় নেই। কোন ক্লান্তি নেই। আছে শুধু এক অদ্ভুত জেদ। তিনি সেনাপতিকে উদ্দেশ্য করে সেই অবিশ্বাস্য প্রস্তাবটি দিলেন। তিনি খুব শান্ত। কিন্তু দৃহ কন্ঠে বললেন হে আমার মুসলিম ভাইয়েরা তোমরা আমাকে একটা বড় ঢালের উপর বসাও তারপর সেই ঢালটাকে তোমাদের বর্ষার মাথায় তুলে ধরো এরপর তোমরা সবাই মিলে সেই বর্ষাগুলো দিয়ে আমাকে শূন্যে তুলে ওই দুর্গের দেয়ালের ওপারে কাফেরদের বাগানের ঠিক মাঝখানে ছুড়ে মারো আমি একা ওদের সাথে লড়বো আর ওই দরজা ভেতর থেকে খুলে দেব কি ভয়ঙ্কর কথা দেয়ালের ওপারে আছে হাজার হাজার রক্ত পিপাসু শত্রু যারা তলোয়ার হাতে প্রস্তুত হয়ে আছে আর বারা ইবনে মালিক বলছেন তাকে একা সেই মৃত্যুর মুখে ছুড়ে ফেলতে হবে। সাহাবীরা চমকে উঠলেন। তারা বললেন না বারা তুমি একা ওই হাজার হাজার তলোয়ারের নিচে গিয়ে কি করবে? মাটিতে পড়ার আগেই তো ওরা তোমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। আমরা আমাদের ভাইকে নিজের হাতে এভাবে মরতে দিতে পারি না। কিন্তু বারা ইবনে মালিক তো সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তিনি ছিলেন শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করার জন্য পাগল পাড়া একজন প্রেমিক। সাহাবীদের কসম দিয়ে বললেন আমি তোমাদের আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি তোমরা আমাকে দেয়ালের ওপারে ছুড়ে মারো| হয় আমি দরজা খুলে দেবো না হলে আমি আমার রবের রাস্তায় শহীদ হব আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না তারই ঈমানি যেদের কাছে সবাই হার মানলেন তাড়াতাড়ি একটি শক্ত এবং বড় ঢাল জোগাড় করা হলো বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু তার তলোয়ারটি শক্ত করে ধরে সেই ঢালের উপর উঠে বসলেন। কয়েকজন শক্তিশালী সাহাবী তাদের লম্বা বর্ষাগুলো সেই ঢালের নিচে ঢোকালেন। তারপর তারা একযোগে আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে ঢালটিকে শূন্যে তুলে ধরলেন। সবার বুক ধরফর করছে। বাতাসে একটা পিনপতন নীরবতা। বর্ষার সাহায্যে বারা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে সেই উঁচু দেয়ালের উপর দিয়ে শূন্যে ছুড়ে মারা হলো। মুহূর্তের জন্য বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু শূন্যে ভেসে রইলেন। দেয়ালের ওপারে থাকা কাফেররা হঠাৎ অবাক হয়ে দেখল আকাশ থেকে একজন মানুষ পাখির মতো তাদের দিকে ধেয়ে আসছে। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই বিশাল বাগানের ভেতরে হাজার হাজার কাফেরের ঠিক মাঝখানে গিয়ে সজোরে আছড়ে পড়লেন। পড়ার সাথে সাথেই বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। বাঘের মত লাফিয়ে উঠলেন তিনি। তার লক্ষ্য একটাই যে কোন মূল্যে ওই লোহার দরজাটা খুলতে হবে। তিনি ডানে-বামে তলোয়ার চালাতে চালাতে দরজার দিকে এগোতে লাগলেন। কাফেররা যখন ঘোর থেকে বের হলো তারা চারদিক থেকে বারা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ঘিরে ফেলল। হাজার হাজার মানুষ ঝাপিয়ে পড়ল একা একজনের ওপর। তারা বৃষ্টির মত তলোয়ার আর বর্ষা দিয়ে তাকে আঘাত করতে শুরু করল। কিন্তু বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু সেদিন যেন কোন মানুষের শক্তিতে লড়ছিলেন না। তিনি লড়ছিলেন এক আসমানি শক্তিতে। তার শরীরে একের পর এক তলোয়ারের কোপ বসতে লাগলো। বর্ষা বিধতে লাগলো। তীরের আঘাতে তার শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেল। রক্তে পুরো শরীর ভেসে যাচ্ছে। মাংস কেটে ঝুলছে কিন্তু তার হাতের তলোয়ার থামছে না। তিনি যেন মৃত্যুর যন্ত্রণাকে অনুভবই করছেন না। তিনি শুধু দরজার দিকে এগোচ্ছেন। কাফেররা এই একজন মানুষের রুদ্র মূর্তি দেখে ভয়ে কাঁপতে লাগল। তারা ভাবল, এ কেমন মানুষ? এত আঘাত পাওয়ার পরও সে কিভাবে দাঁড়িয়ে আছে? সে কি মানুষ নাকি অন্য কিছু? অবশেষে অমানসিক এক লড়াইয়ের পর বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই বিশাল লোহার দরজার কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হলেন। তার শরীরে তখন আর কোন শক্তি অবশিষ্ট নেই। রক্তক্ষরণে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছেন। কিন্তু তিনি তার জীবনের শেষ শক্তিটুকু একত্র করে সেই বিশাল লোহার দরজার খিল খুলে দিলেন। ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে বিশাল সেই দরজাটা হা করে খুলে গেল। আর বাইরে অপেক্ষারত মুসলিম বাহিনী যারা এতক্ষণ শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে ছিল তারা আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে বন্যার জলের মত বাগানের ভেতরে প্রবেশ করল শুরু হলো এক মহা প্রলয় তারা কাফেরদের উপর এমনভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল যে সেই বাগানটি সত্যিই মৃত্যুর বাগানে পরিণত হল ভন্ড নবী মুসাইলামা কাজ্জাব তার হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে সেই বাগানের ভেতরেই মারা পড়ল ইসলামের এক বিরাট বিজয় অর্জিত হল কিন্তু বিজয়ের এই আনন্দে সাহাবীরা মেতে উঠলেন না সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং অন্যান্য সাহাবীরা পাগলের মতো খুঁজতে লাগলেন সেই রোগা পাতলা মানুষটিকে রক্তের সাগরে লাশের স্তুপের মাঝে তারা খুঁজতে লাগলেন হযরত বারা ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুকে অবশেষে তারা তাকে পেলেন। [মিউজিক] কিন্তু তার অবস্থা দেখে বড় বড় বীর সাহাবীদেরও চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়তে লাগলো। বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু দরজার কাছেই পড়ে আছেন। তার শরীরটা আর চেনার উপায় নেই। তাফসীর এবং ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য কিতাবগুলোতে উল্লেখ আছে, সেদিন বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর শরীরে 80রও বেশি তলোয়ার, বর্ষা এবং তীরের আঘাত লেগেছিল। ভাবুন একবার, একজন মানুষের শরীরে 80র বেশি গভীর ক্ষত। শরীরের এমন কোন জায়গা বাকি ছিল না, যেখানে অস্ত্রের আঘাত লাগেনি। হাড়গুলো দেখা যাচ্ছিল। সবাই ভাবলো এই মানুষটির আর বাঁচার কোন সম্ভাবনা নেই। সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজে তার পাশে বসলেন। তিনি সবচেয়ে ভালো চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। টানা এক মাস ধরে খালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজে বারা রাদিয়াল্লাহু আনহুর এর সেবা যত্ন [মিউজিক] করলেন। আর আল্লাহর কি কুদরত দেখুন। যে মানুষটি মৃত্যুকে পাগলের মত ভালোবাসতেন, যিনি মৃত্যু খোঁজার জন্য একা হাজার শত্রুর মাঝে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন, আল্লাহ তাকে সেদিন মৃত্যু দিলেন না। দীর্ঘ এক মাসের চিকিৎসার পর 80টি ক্ষতের যন্ত্রণা সহ্য করেও বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। কিন্তু সুস্থ হয়ে তিনি খুশি হলেন না। তার মনে এক বিশাল কষ্ট। তিনি বাচ্চাদের মতো কাঁদতেন আর বলতেন হায় আল্লাহ আমাকে শাহাদাতের মর্যাদা দিলেন না। আমি এত চেষ্টা করলাম কিন্তু মৃত্যু আমাকে ধরা দিল না। তিনি ভাবতেন হয়তো তার কোন ভুলের কারণে আল্লাহ তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করেননি। কিন্তু তিনি জানতেন না আল্লাহ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন ইসলামের আরো বড় কোন বিজয়ের জন্য। এর কয়েক বছর পরের কথা। মদিনায় তখন হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খেলাফতকাল। পারস্যের বর্তমান ইরান সুপারপাওয়ার পার্ষিকদের সাথে মুসলিমদের এক বিশাল যুদ্ধ শুরু হলো। জায়গাটির নাম তুস্তার। এই তুস্তার দুর্গে মুসলিমরা দীর্ঘ সময় ধরে আটকে ছিল। যুদ্ধ যখন প্রচন্ড আকার ধারণ করল, মুসলিম বাহিনী একটু বিপাকে পড়ল। পার্সিকরা প্রবল আক্রমণ চালাচ্ছিল। তখন সাহাবীরা বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে ছুটে এলেন। কেন এলেন জানেন? কারণ সাহাবীরা জানতেন যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে একটি অলৌকিক কথা বলেছিলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন আমার উম্মতের মধ্যে এমন অনেক উস্কো চুলওয়ালা ধুলোমাখা মানুষ আছে যাদের সাধারণ মানুষ হয়তো পাত্তা দেয় না। কিন্তু তারা যদি কোন বিষয়ে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে বসে পড়ে তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তাদের সেই কসম পূরণ করেন। আর বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদেরই একজন। এই হাদিসটি তিরমিজি শরীফে রয়েছে সাহাবীরা বারা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন হে বারা নবীজি বলেছেন তোমার কসম আল্লাহ ফেরান না তুমি আল্লাহর কাছে কসম খেয়ে আমাদের বিজয়ের জন্য দোয়া করো আজ পরিস্থিতি খুব খারাপ বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুললেন তার চোখ দিয়ে অঝরে পানি পড়ছিল তিনি আল্লাহর কাছে এক অদ্ভুত দোয়া করলেন তিনি বললেন হে আল্লাহ আমি তোমার নামে কসম খেয়ে বলছি তুমি আজ আমাদের বিজয় দান করো এবং হে আল্লাহ আমাকে আমার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ দাও আমাকে আজ তুমি শাহাদাত নসিব করো সুবহানাল্লাহ [মিউজিক] তিনি শুধু বিজয় চাইলেন না তিনি তার দীর্ঘদিনের সেই না পাওয়া আক্ষেপ সেই মৃত্যু চাইলেন আল্লাহ তার এই প্রিয় বান্দার কসম পূরণ করলেন সেই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী এক বিশাল বিজয় লাভ করল তুস্তারের অজয় দুর্গজয় হলো কিন্তু যুদ্ধ শেষে যখন সবাই বিজয়ের আনন্দে আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিচ্ছে তখন দেখা গেল সেই ধুলোমাখা উস্কো চুলের অকুতভয় বীর হযরত বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু একটি তলোয়ারের আঘাতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছেন। তার সারা শরীর রক্তে মাখা কিন্তু তার মুখে লেগে আছে এক অপার্থিব প্রশান্তির হাসি। তিনি তার রবের কাছে তার প্রিয় নবীজির কাছে চিরদিনের জন্য চলে গেছেন। যেই মৃত্যুকে তিনি ইয়ামামার মৃত্যুর বাগানে খুঁজে পাননি। যেই মৃত্যুর জন্য তিনি 80টি আঘাত সহ্য করেও কাঁদতেন সেই কাঙ্খিত মৃত্যুকে তিনি তুস্তারের ময়দানে হাসি মুখে বরণ করে নিলেন। হযরত বারা রাদিয়াল্লাহু আনহু এর এই ঘটনা আমাদের এক বিশাল শিক্ষা দেয়। একজন মানুষের আসল শক্তি [মিউজিক] তার সুঠাম দেহ বা পেশিতে থাকে না। আসল শক্তি থাকে তার হৃদয়ের ভেতরে লুকানো ঈমান বা বিশ্বাসে। যখন একজন মানুষ আখেরাতকে ভালোবেসে দুনিয়ার মায়াকে তুচ্ছ করতে পারে, তখন পৃথিবীর কোন শক্তি কোন পাহাড় সমান দেয়াল বা হাজার হাজার শত্রুর তলোয়ার তাকে আটকে রাখতে পারে না। [নাক ডাকা] আজ আমরা দুনিয়ার সামান্য বিপদে হতাশ হয়ে পড়ি। অথচ সাহাবীরা জানতেন মৃত্যু মানেই শেষ নয় বরং মৃত্যু মানেই হল আসল জীবনের শুরু প্রিয় রবের সাথে মিলনের শুরু। আল্লাহ ওপর ভরসা থাকলে একজন সাধারণ চাষী বা অতি সাধারণ মানুষও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে। ভিডিওটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদেরও ইসলামের এই গৌরবময় ইতিহাস জানার সুযোগ করে দিন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সাহাবীদের মত মজবুত ঈমান দান করুন। আমিন।

Need a transcript for another video?

Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.

Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact

খলিফা উমর (রাঃ) কেন এই সাহাবীকে সেনাপতি বানাতে ভয় পেতেন?...