সুন্দরী এতিম মেয়ের করুণ কাহিনী; পর্বঃ-১ || Islamic Moral Story || iRC

iRC 2,866 words

Full Transcript

একটা এক গ্রামে একজন মৎস শিকারী বাস করতেন। তার ঘরে ছিল এক অত্যন্ত সুন্দরী মেয়ে। যার নাম ছিল আয়েশা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত মেয়েটির মা মারা গেলেন। কিছুদিন পর বাবা আরেকজন মহিলাকে বিয়ে করলেন। সেই সৎমা ছিল খুবই দুষ্ট এবং ঘৃণিত। তার আগের স্বামী থেকে জন্ম নেওয়া এক কুৎসিত ও নির্বোধ মেয়েও ছিল। একদিন সেই শিকারী প্রচুর মাছ ধরে ঘরে ফিরল। তখন সৎ মা আয়েশাকে বলল, মাছগুলো পরিষ্কার করে চামড়া ছাড়িয়ে রান্না করো। আয়েশা তখন তার কাজ করছিল আর অভ্যাস মতো গুনগুন করে গান গাইছিল। হঠাৎ সে দুর্বল ও অচেনা একটা আওয়াজ শুনতে পেল। অবাক হয়ে চারপাশে তাকালো। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। সে ভাবল, হয়তো এটা কোন খাবার খুঁজতে আসা বিড়ালের শব্দ। কিন্তু আওয়াজটা আবারো শোনা গেল। এবার অনেক স্পষ্টভাবে। সে সামনে তাকিয়ে দেখল একটি অদ্ভুত চেহারার মাছ কথা বলছে। মাছটি বলল, তুমি খুব দয়ালু ও উদার মেয়ে। আমি মাছদের রাজ্যের রাজকন্যা। আমার বাবা আমাকে কখনো গভীর সমুদ্র ছেড়ে ওপরে না আসতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি তার কথা শুনিনি। ওপরে উঠে এসে বিশুদ্ধ বাতাস ও পাখিদের ডাক শুনে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমি সাঁতার কাটতে কাটতে তোমার বাবার জালে আটকে গিয়েছি। অনুগ্রহ করে আমাকে মুক্তি দাও। আমার বাবা নিশ্চয়ই আমাকে খুঁজছেন এবং আমার অনুপস্থিতিতে কষ্ট পাচ্ছেন। এটা শুনে আয়েশা বলল, যখন উত্তর দিক থেকে বাতাস বইবে আমি তোমাকে সমুদ্রে ফেলে দেব। সেই বাতাস তোমাকে তোমার রাজ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। তখন মাছটি বলল, আমি তোমার অনুগ্রহ আজীবন মনে রাখবো। আরেকটি কথা তুমি জেনে রাখো যে সাগরের অনেক গোপন রহস্য আছে। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণের সমুদ্রে একেকটি প্রতিরূপ থাকে। আয়েশা তখন তার কাজ ছেড়ে মাছটিকে পানি ভর্তি একটি পাত্রে রাখল এবং সমুদ্রের দিকে ছুটলো। যখন উত্তর দিকের বাতাস বইতে শুরু করল তখন মাছটি তাকে একটি ছোট শাখা দিল এবং বলল যদি কখনো আমার প্রয়োজন হয় এই শাখাটি উত্তর দিকে ঝুলিয়ে দিও। তখন এর ভেতর থেকে মধুর সুর বের হবে। আর আমি সঙ্গে সঙ্গেই তোমার কাছেই চলে আসবো। অতঃপর আয়েশা মাছটিকে সমুদ্রে ফেলে দিল এবং দ্রুত বাড়ি ফিরে রান্নার কাজ শেষ করতে লাগল। যেন সৎমা কিছু টের না পায়। কিন্তু বিষয়টা এত সহজ ছিল না। আয়েশা সমুদ্রে থাকাকালীন সৎমা এসে তাকে না দেখে খুব দু হয়ে যায় এবং প্রতিশোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। সে সিদ্ধান্ত নিল যে মেয়েটির নামে অভিযোগ করে বাবাকে দিয়ে তাকে মারবে এবং ঘরে বন্দী করবে। যাইহোক আয়েশা ঘরে ফিরে এসে সেই শাখাটি একটি সুতোইয় বেঁধে গলায় ধুলিয়ে রাখলো এবং কাজে লেগে গেল। কিছুক্ষণ পর বাবা ঘরে এলেন রাগান্বিত অবস্থায়। কিন্তু মেয়েকে মনোযোগ সহকারে কাজ করতে দেখে শান্ত হয়ে গেলেন এবং বললেন দ্রুত করো না হলে খেতে দেরি হয়ে যাবে আর আমাদের জন্য জবের রুটি বানাতে ভুলো না। কিন্তু সৎমা গোপনে রান্নাঘরে গিয়ে খাবার ও রুটিতে বেশি লবণ দিয়ে দিল। অতঃপর যখন বাবা খেতে বসলেন তখন রাগে ফেটে পড়লেন এবং মেয়েকে অবহেলার অভিযোগে দোষারোপ করলেন। তিনি হাড়ি উল্টে ফেললেন এবং রুটিগুলো মাটিতে ছুড়ে মারলেন। তারপর বললেন, আমাকে কলসি এনে দাও। আমার পিপাসা পেয়েছে। তখন আয়েশা গিয়ে দেখে কলসি ফাঁকা। সৎমা তখন বলল, শাস্তি হিসেবে কূপ থেকে নিজেই পানি ভরে নিয়ে এসো। আয়েশা জানতো না যে কলসিটি ইচ্ছাকৃতভাবেই সৎমায় খাড়ি করে রেখেছে। তাই তার চোখে পানি চলে এলো। মায়ের মৃত্যুর পর থেকে তার জীবন হয়ে উঠেছিল অসহনীয় কষ্টের। সে কেবল ধৈর্যই ধরতে পারতো। অতঃপর আয়েশা কুপে পৌঁছে দেখে সেখানে দুজন অশারোহী দাঁড়িয়ে আছে। তারা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কারণ সেখানে কোন বালতি ছিল না ফলে তারা পানি তুলতে পারছিল না। মেয়েটিকে দেখে তারা আনন্দিত হয়েছিল এবং তাকে অনুরোধ করেছিল যেন সে তাদের পানি দেয়। তখন বাবার ভয়ে থাকা সত্ত্বেও আয়েশা ডোল ভর্তি করে তাদের পানি দিল। তারা পানি খেল এবং নিজেদের পানির থলিটিও ভরে নিল। বিদায়ের আগে তারা মেয়েটির জন্য দোয়া করল এবং তার ভালো কামনা করল। প্রথম অশারোহী বলল, আল্লাহ ইচ্ছা করলে তুমি যখনই হাসবে তোমার মুখ থেকে সোনার কণা ঝরবে। আর তুমি যখনই কাঁদবে বৃষ্টির মত পানি ঝরবে। দ্বিতীয় অস্বারোহী বলল আল্লাহ ইচ্ছা করলে তুমি যেদিকেই হাঁটবে তোমার পেছনে রেশমে কাপড় ছড়িয়ে যাবে আর তুমি সেই রেশমে নিজেকে জড়িয়ে রাখবে। এই সুন্দর দোয়া শুনে আয়েশার মন আনন্দে ভরে গেল এবং মনে আশা জাগল। অতঃপর যখন সে বাড়ির দিকে ফিরছিল তখন ভারী বালতিটি টেনে নিয়ে গিতে গিতে তার হাতগুলো ব্যথায় ও ক্লান্তিতে ভরে গেল। কিন্তু পথের মাঝখানে সে শুনল কেউ তাকে ডাকছে। হে আয়েশা আমাকে একটু পানি দাও। সে চারপাশে তাকালো কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। তারপর আবারও সেই কন্ঠ শুনল। আমি হে আয়েশা আমি কমলাপুর গাছ। এটা শুনে আয়েশা তাকিয়ে দেখে গাছটি শুকিয়ে গেছে। প্রায় মরে যাচ্ছে। সে গাছটিকে পানি দিল এবং আবার কুপে ফিরে গিয়ে বালতি ভরল। অতঃপর বাড়ির পথে ফেরার সময় জঙ্গলে আবার একটি কন্ঠ শুনল। এবার একটি ছোট বিড়াল রাস্তার ধারে শুয়েছিল। বিড়ালটি বলল, আমি অসুস্থ। আমাকে একটু পানি দাও। আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন। ফলে আয়েশার মনে মায়া জাগল। সে বিড়ালের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল এবং পানি পান করালো। পানি পেয়ে বিড়ালটি জীবন্ত হয়ে উঠল। কিন্তু এখন বালতিতে সামান্য পানি অবশিষ্ট ছিল। তাই পরিব মেয়েটি আবার কুপে ফিরে গিয়ে পা টেনে টেনে বালতি ভরল। সে জানত এবার অনেক দেরি হয়ে গেছে। এবং এখন তাকে দ্রুত যেতে হবে। যদিও পায়ে প্রচন্ড ব্যথা। ফিরে যাওয়ার পথে সে মনে মনে বলল আজ বাবা আমাকে মারবে এবং হয়তো অন্ধকার ঘরে বন্দি করবে কিন্তু তাতে আমার কিছুই যায় আসে না কারণ আমি ভালো কাজ করেছি আমার মা সবসময় আমাকে ভালো কাজ করতে বলতেন হঠাৎ কমলালেবুর গাছটি বলল ধন্যবাদ আয়েশা আমার সুগন্ধ আবার ফিরে এসেছে আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমার কাছেও বুনোফুলের ঘ্রাণ থাকবে এরপর বিড়ালটি দোয়া করে বলল আমার চোখের আলো ফিরে এসেছে আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমি তোমার অন্ধকার রাতগুলো আলোকিত করে দেবো। এই সুন্দর কথাগুলো শুনে আয়েশা খুশিতে ভরে গেল। তার ক্লান্তি ও দুঃখ ভুলে গেল এবং বাড়ির পথে চলতে লাগলো। অতঃপর যখন সে বাড়ি পৌঁছালো তখন তার বাবা রাগ করে জিজ্ঞেস করল, কেন এত দেরি করলে? আমার খাবার নষ্ট করাটা কি যথেষ্ট ছিল না? এখন আবার আমাকে পানি ছাড়া রেখেছো? আয়েশা তখন যা ঘটেছিল সব তাকে বলল। কিন্তু বাবা চিৎকার করে বলল। তোমার কি দরকার অশারোহী গাছ বা বিড়ালের বিষয়ে ভাবনা? দেখা যাক তারা তোমাকে সাহায্য করতে পারে কিনা। যখন তুমি তিনদিন অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি থাকবে। এখন পুরানো কাপড় পড়ে ফেলো আর কানের দুলগুলো খুলে ফেলো। তুমি ওসবের যোগ্য নয়। আয়েশা বাবার হঠাৎ রাগ দেখে অবাক হয়ে গেল। সে বুঝলো যে এর পেছনে সৎমার ষড়যন্ত্র আছে। সে কাঁদতে শুরু করল। কিন্তু বাবার হৃদয় এখন কঠিন হয়ে গেছে। সে আর মেয়ের প্রতি কোন দয়া দেখালো না। কিছুক্ষণের মধ্যে আয়েশা ভিখারিনীর মত হয়ে গেল। ছেড়া জামা ও ফুটো জুতো পড়ে। বাবা তাকে পিঠে ধাক্কা দিয়ে অন্ধকার কুঠুরির ভেতর ফেলে দিলেন এবং দরজা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিলেন। আয়েশা ভয় পেয়ে গেল। জায়গাটা সেজ সাথে ও অন্ধকার ছিল। সে এক কোণে বসে পড়ল এবং কাঁদতে শুরু করল। চোখের অশ্রু মাটিতে পড়তে লাগল। সে বলল, হে আল্লাহ, আমি কি এমন খারাপ কাজ করেছি যে এমন দুর্ভাগা জীবন পেতে হলো? প্রতিদিনই চিৎকার আর শাস্তি। আমার সেই দয়ালু বাবা আর আগের মতো নেই। আমি একসময় সুখী ও আদুরে ছিলাম। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর পর সব শেষ হয়ে গেছে। সৎমা আমার সৌন্দর্য, সেলাই দক্ষতা ওর রেশমের সুন্দর নকশা দেখে হিংসায় পুড়ে যেত। সে আমাকে হেয়ও করার চেষ্টা করতো এবং ঘরের সব কাজ আমাকে দিয়ে করাতো। যাতে আমি আর সুন্দর কাপড়ের নকশা করতে না পারি। অনেকদিন হয়ে গেছে আয়েশা হাতে সুচ বা কাপড় নেয়নি। এই চিন্তায় ডুবে থাকতেই হঠাৎ সে দেখল অন্ধকারে দুটি চোখ জলজল করছে। আয়েশা ভায়ে গুটিয়ে গেল। প্রায় চিৎকার করে ফেলত। কিন্তু তখনই একটি কন্ঠ বলল, আমি সেই বিড়াল যাকে তুমি জঙ্গলে পানি দিয়েছিলে। আমি এসেছি তোমার অন্ধকার আলোকিত করতে যেমনটা তোমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। অতঃপর বিড়ালটি কাছে এসে তার কোলে বসল। হঠাৎ তার চোখ দুটো এত উজ্জ্বল হয়ে উঠল যেন দুটি প্রদীপ। আয়েশা চারপাশে তাকিয়ে দেখল এই প্রথম সে কুঠুরির ভেতরের জিনিসগুলো দেখতে পাচ্ছে। জায়গাটা ছিল বহু পুরনো। শত শত বছরের পুরাতন। আর কেউ কখনো ভেতরে ঢুকে দেখেনি। তখন বিড়ালটি বলল, চলো আমি তোমাকে কিছু দেখাবো। অতঃপর আয়েশা কুঠুরির বিশালতা দেখে বিস্মিত হলো এবং তার দুঃখ ভুলে গেল। সে বিড়ালের পেছনে হাঁটতে লাগল। দেয়ালে খোদাই করা সুন্দর নকশা ভাস্কর্য দেখতে পেল। হঠাৎ সে কুয়ের পাশে দেখা দুই অসারোহীর একজনকে দেখল। তিনি তাকে একটি বাক্স দিলেন এবং বললেন আমি আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি। তুমি এখন সবচেয়ে সুন্দর রেশমে নিজেকে জড়াতে পারবে। আয়েশা তখন বাক্সটি খুলে দেখল তার ভেতরে ছিল একটি রুপার আয়না, হাতির দাঁতের তৈরি চিরুনিী এবং পাঁচটি রেশমী পোশাক। তখন সে মনে মনে বলল, এটা বিশ্বাসই করা যাচ্ছে না। অতঃপর সে সেখান থেকে একটি পোশাক বেছে নিল। পুরনো জামা খুলে নতুনটি পড়ে নিল। তারপর চুল আঁচড়ে আয়নায় নিজের দিকে তাকালো। আয়েশা আয়নায় নিজেকে দেখে বলল, আমি যেন নিজেকেই আর চিনতে পারছি না। তখন বিড়ালটি বলল, চলো এবার পথ চলা চালিয়ে যাই। অতঃপর অল্প সময় পর তারা দ্বিতীয় অস্বারহীর কাছে পৌঁছল। তিনি তাকে আরেকটি বাক্স দিলেন। এর ভেতরে ছিল চকচকে চামড়ার তৈরি একজোড়া জুতো এবং সুন্দর গয়না। আয়েশা তার ছেড়া জুতো ফেলে দিল এবং নতুন জুতো পায়ে দিল। এরপর নিজের পছন্দমত হার ও আংটি পড়ে নিজেকে সাজিয়ে নিল এবং বিশ্বয় ভরে পথ চলা অব্যাহত রাখল। পথে তার দেখা হলো কমলালেবুর গাছটির সঙ্গে। গাছটি তাকে চোখের কাজল, সুগন্ধি ও ফলভর্তি একটি ঝুড়ি দিল এবং গাছটি বলল, আমি আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি। জেনে রেখো আমরা সবাই তোমার করা সৎকর্মের প্রতিদান দিতে এসেছি। মানুষ যেমন বপন করে তেমনিই ফসল পায়। যে ভালো বপন করে সে ভালোই পায়। গাছটি আরো বলল, এই কুঠুরিটি একসময় ছিল জীনদের সবচেয়ে বড় রাজ্য। তারা পৃথিবীতে অরাজকতা ছড়িয়ে দিয়েছিল। অবশেষে একদিন আল্লাহ তাদের শাস্তি দিলেন। ফলে আমাদের জাতি থেকে কেবল আমরাই কয়েকজন বেঁচে আছি। আমাদের দেখতে পায় কেবল সৎ এবং পরিশুদ্ধ মানুষ। অতঃপর আয়েশা বাকি দিনটি কাটানো জ্বীনদের রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখতে। দেয়ালের পাথরের খোদাই করা নকশাগুলো তাকে মুগ্ধ করল। সে বলল, যখন আমি এখান থেকে বের হবো আমি রেশমের কাপড়ে এই নকশাগুলোর মত সূচিকর্ম করব। তারপর সে একটি বাড়িতে প্রবেশ করে ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে একটি থালায় তার প্রিয় সব খাবার সাজানো আছে। সে পেট ভরে খেয়ে নিল। অতঃপর তৃতীয় দিনের সন্ধ্যা নামলে সে কুঠুরি দরজার কাছে বসে অপেক্ষা করতে লাগল। কেউ এসে তাকে বের করবে বলে। কিছুক্ষণ পর সে তার সৎমার পায়ের শব্দ শুনতে পেল। সৎমা হাতে গতকালের অবশিষ্ট মাছ ও রুটি নিয়ে এসেছিল। কিন্তু দরজা খুলে যখন আয়েশাকে দেখল ঝলমলে রেশম ও সোনায় মোড়া সুন্দরভাবে সজ্জিত তখন তার হাত থেকে থালাটি পড়ে গেল। সে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারলো না এবং বলল, তুমি কি সত্যিই আয়েশা? সেই জেলের মেয়ে? তখন আয়েশা বলল, হ্যাঁ আমি আয়েশা। সৎমা তার স্বামীকে ডেকে বলল, এসো দেখো তোমার মেয়েকে। আমি জানতে চাই কে তাকে এইসব ধনসম্পদ দিয়েছে। তখন জেলে অবাক হয়ে বলল, কি বলছো নারী? অতঃপর জেলে যখন নিচে নেমে কুঠুরিতে ঢুকলো তখন অবাক হয়ে মুখ হা করে তাকিয়ে রইল। তখন আয়েশা বলল, ওরা বন্যপ্রাণী বাবা। আমি যাদের সাহায্য করেছিলাম তারা আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে এসেছে। কিন্তু জেলে তার গল্পে তেমন মনোযোগ দিল না। তার চোখ শুধু সোনালুপার বাক্সের দিকে ছিল। সে বলল, আমি বড় একটা নৌকা কিনবো। আমরা মাছ ধরে প্রচুর লাভ করব। খুব ভালো কাজ করেছো আয়েশা। তুমি তোমার বাবাকে ও পরিবারকে গ্রামের ধনী লোকদের একজন করে তুলবে। তারপর সে মেয়েকে জড়িয়ে ধরল কপালে চুমু খেল এবং প্রতিশ্রুতি দিল আর কেউ কখনো তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে না। এরপর আয়েশার জীবন অনেক ভালো হয়ে গেল। ঘরের কাজও অনেক কমে গেল কারণ বাবা এবার সৎ মেয়েকেই সব কাজ করতে বাধ্য করলেন। আয়েশা আবার সূচিকর্মে ফিরে গেল এবং জীনদের রাজ্যে দেখা নকশাগুলো রেশমের কাপড়ে ফুটিয়ে তুলল। যখন সবাই সেই কাজ দেখল তারা মুগ্ধ হয়ে গেল এবং বাবার ভালোবাসা মেয়ের প্রতি আরো বেড়ে গেল। অবশেষে সে তার স্বপ্নের নৌকাটিও কিনে ফেলল। কিন্তু সৎমা আয়েশার প্রতি প্রচন্ড হিংসায় জ্বলে উঠলো। বাবার কাছে মেয়ের সম্মান ও অবস্থান বেড়ে যেতে দেখে সে বলল, আমি অবশ্যই চাতুরির আশ্রয় নিয়ে তার গোপন রহস্য জেনে নেব। এটা করতেই হবে। অতঃপর একদিন সৎমা আয়েশার কাছে এসে আগের কঠোর আচরণের জন্য ক্ষমা চেয়ে বলল তোমার বোনের বোকামি আর কুৎসিত চেহারাই আমাকে সবসময় উত্তেজিত রেখে এসেছে তুমি বুঝতে পারছো তো তখন আয়েশা সরলভাবে বলল হ্যাঁ আমি বুঝি আমার বন্যপ্রাণীরা ওকে সাহায্য করতে পারবে ওরা জীনদের রাজ্যের অবশিষ্ট বাসিন্দা সে সৎমাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব ঘটনা খুলে বলল তখন সৎমা মনে মনে হাসলো এবং বলল আমার মেয়ে তোমার চেয়ে সুন্দরও ধনী হবে আর তোমার সঙ্গে কি করব তুমি তা দেখবে হে অভিশপ্ত তো মেয়ে আয়েশা এইসব কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। অতঃপর পরেরদিন সকালে সৎমা তার মেয়েকে একটি বালতি দিল এবং বলল, কি করতে হবে? সে বলল, কষ্ট সহ্য করে ধৈর্য ধরো। দিনের শেষে তুমি ধনী হয়ে উঠবে ও জীন তোমাকে সুন্দর মুখ দেবে। কিন্তু মেয়েটি ছিল কৃপণ ও খারাপ মনের। যখন সে কোপে পৌঁছালো এবং বালতি ভরল তখন অশারোহীরা এসে তার কাছে পানি চাইল। তখন মেয়েটি বলল, আমি তোমাদের বাবার দাসী নই। ফলে তারা রেগে গিয়ে তারা তার জন্য বদদোয়া করল। তারপর সে যখন কমলালেবু গাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন গাছটি তাকে ডাকল এবং পানি চাইল। মেয়েটি শুকনো গাছটি দেখে বলল, আমি আমার বাবাকে ডেকে আনবো। সে তোমাকে কেটে জ্বালানি কাঠ বানাবে। তাই গাছটি অভিশাপ দিল। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তোমার গন্ধ হবে তোমার নোংরা জীভের মতই বাজে। এটা শুনে মেয়েটি হাসলো এবং চলে গেল। অতঃপর আরেকটু এগোতেই সে বিড়ালের দেখা পেল। বিড়ালটি অসুস্থ কন্ঠে বলল, আমি অসুস্থ। আমাকে একটু পানি দাও। আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করুন। তখন সে উত্তর দিল, তুমি এখানেই পড়ে থাকো যতক্ষণ না ইঁদুর এসে তোমার লেজ খেয়ে যায়। লেজ ছাড়া তুমি আরো সুন্দর দেখাবে। তখন বিড়ালটি রেগে গিয়ে অভিশাপ দিল। আল্লাহ ইচ্ছা করলে ইদুররা রাতে এসে তোমার কান খেয়ে ফেলবে। যেন তুমি আরো কুৎসিত হয়ে যাও। অতঃপর যখন মেয়েটি বাড়ি ফিরল তখন সৎমা জিজ্ঞেস করল, তুমি কি আমি যা বলেছিলাম সব করেছো? সে উত্তর দিল, হ্যাঁ মা। তখন সৎমা বলল, তাহলে যাও কুঠুরিতে ঢুকে পড়ো। ভয় পেও না। এখানে খাবার-দাবার আছে। যদি কিছু দরকার হয় দরজায় করা নাড়বে। আমি খুলে দেব। আর একটি সাদা বিড়াল আসবে তাকে অনুসরণ করবে। সে তোমাকে সোনা আর রেশমের কাছে নিয়ে যাবে। অতঃপর মেয়েটি অন্ধকারে বসে রইল। হঠাৎ সে দেখল লাল চোখওয়ালা অসংখ্য প্রাণী তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে ভয় পেয়ে একটি কাঠ জ্বালালো। তারপর অসংখ্য ছোট ইদুর তার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তাকে কামড়াতে শুরু করল। মেয়েটি দৌড়াতে লাগলো। চিৎকার করতে লাগলো। মুখ থেকে তাদের দূরে সরাতে চাইল। কিন্তু ইঁদুরগুলো তার কান কেটে ফেলল। ভয়ে সে দৌড়াতে লাগলো এবং একটি রুপালী বাক্স দেখতে পেল যা অন্ধকারে ঝলমল করছিল। সে তার দিকে দৌড়ে গেল। বাক্স খুলল এবং দেখল ভেতরে কেচো ও তেলাপোকা। তারা তাকে আক্রমণ করল এবং তার পোশাকের ভেতরে ঢুকে পড়ল। অতঃপর ভয়ে সে আবার দৌড়ে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লো। দরজা খুলে সৎমা মেরে নোংরা অবস্থা দেখে বিরক্ত হল। সে তাকে গোসল করালো ও পরিষ্কার করল। কিন্তু মেয়েটি ভয়ঙ্কর কুৎসিত হয়ে গিয়েছিল। তার মুখ জুড়ে ছিল কামড় আর আচরের দাগ। তখন সৎমা প্রচন্ড রেগে গিয়ে বলল, আমার মেয়ের সাথে যা ঘটেছে সবই সেই আয়েশার চালাকি। সে আমাকে ধোঁকা দিয়েছে। আমি বুঝে নেব কিভাবে তার থেকে প্রতিশোধ নেওয়া যায়। তোমার সর্বনাশ হবে। হে জেলের মেয়ে। অতঃপর একদিন সৎমা আয়েশাকে বলল, আমি তোমার বোনের জন্য কিছু ভেসদ সংগ্রহ করব ওষুধ বানানোর জন্য। আমি চাই তুমি আমার সাথে জঙ্গলে চলো। তখন আয়েশা বলল, ঠিক আছে আমি তোমার কথামতোই করব। অতঃপর তারা অনেকদূর হাঁটলো। আর আয়েশা বারবার জিজ্ঞেস করছিল, আর কতদূর? সৎমা প্রতিবার বলছিল, এখনো না। শেষ পর্যন্ত তারা একটি উঁচু পাহাড়ে পৌঁছালো। তখন সৎমা বলল, ওখানে একটি লাল রঙের দন্ডল ফুল জন্মায়। তুমি সেটি আমার জন্য নিয়ে আসো। আমি ক্লান্ত। এখানেই তোমার জন্য অপেক্ষা করব। তাড়াতাড়ি করো। আমাদের সময় নেই। আয়েশা পাহাড়ের দিকে যেতেই সৎমা মনে মনে বলল, এখন আমি এখান থেকে চলে যাব আর সে কখনোই আর বাঁচতে পারবে না। এই পাহাড়ে শিয়াল, শকুন, বিষাক্ত বিছা সবকিছু আছে। এমনকি যদি সে এগুলো থেকে বেঁচেও যায়, তাহলে পথ খুঁজে পাবে না। গরম আর ক্ষুদায় সেই মরেই যাবে। এটাই হবে আমার মেয়ের জন্য তার শাস্তি। অতঃপর আয়েশা ফুল খুঁজতে লাগলো কিন্তু কিছুই পেল না। ফিরে এসে দেখে সৎমা তাকে ফেলে চলে গেছে। সে পথ মনে করার চেষ্টা করল। কিন্তু সব পথ একই রকম লাগছিল। আয়েশা চিৎকার করতে লাগলো যদি কেউ শোনে কিন্তু আশেপাশে কেউ ছিল না। তাই ক্লান্ত হয়ে সে একটি গাছের নিচে বসে পড়ল এবং কাটতে লাগল। হঠাৎ সে দেখল দুটো কবুতর ঝগড়া করছে। পুরুষ কবুতরটি বলল, আমরা ঠিক করেছিলাম শীতের জন্য বীজ জমিয়ে রাখবো। কিন্তু আজ আমি দেখেছি সেগুলোর কিছু নেই। তখন স্ত্রী কবুতরটি বলল, বিশ্বাস করো আমি ছুঁইনি। আজ খুব গরম ছিল। এটা শুনে আয়েশা বলল, তোমার স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে দোষ দিও না। প্রচন্ড গরমের কারণে বীজ শুকিয়ে গেছে। যদি শিশির পড়ে তাহলে তা আবার আগের মতো হয়ে যাবে। তখন স্ত্রী কবুতরটি নিচে নেমে আয়েশার কোলে বসে বলল, ধন্যবাদ তোমাকে। তোমার এই পরামর্শ না পেলে আমি বিপদে পড়তাম। তোমার এই সদয়তার জন্য আমি তোমাকে কিভাবে পুরস্কৃত করব? তখন আয়েশা বলল, আমি আমার বোনের জন্য ডন্ডল ফুল চাই এবং আমাদের সমুদ্রের ধারে বাড়িতে ফিরতে চাই। কিন্তু আমি পথ জানি না। এটা শুনে কবুতরটি অবাক হয়ে বলল, এই ফুল পাহাড়ে জন্মায় না। তোমাকে এই নির্জন জায়গায় কে এনেছে? আয়েশা তখন বুঝলো যে সৎমায় তাকে মৃত্যুর ফাঁদে ফেলতে চেয়েছিল। ভবিষ্যতে তাকে আরো সতর্ক থাকতে হবে। এদিকে আরেকটি কবুতর তার ঠোঁটে একটি লাল ডন্ডল ফুল নিয়ে এসে বলল আমাকে অনুসরণ করো আমি তোমাকে সমুদ্রের পথ নিয়ে যাব যদি তাড়াতাড়ি যাও তাহলে রাত নামার আগেই বাড়ি পৌঁছে যাবে অতঃপর যখন আয়েশা বাড়ির কাছে পৌঁছালো তখন তার পায়ে প্রচন্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল কারণ সে না থেমে দৌড়েছিল অতঃপর সে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল এবং হাপাতে লাগল সৎমা তাকে অবাক হয়ে দেখছিল মনে মনে ভাবছিল ওই মেয়েটি জঙ্গলের পথ কিভাবে খুঁজে পেল। তখন আয়েশা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তীক্ন কন্ঠে বলল, আমি এখন গোসল করে ঘুমাতে চাই। কিছু জিজ্ঞেস করবে না। পরেরবার যদি এমন কিছু করো, আমি বাবাকে সব বলে দেব। বুঝেছো? অতঃপর আয়েশা ঘরে ফিরে নিরাপদে ঘুমাতে গেল। কিন্তু সৎ মাতাকে এত সহজে ছেড়া দেবে না। সে আবার নতুন কোন ষড়যন্ত্র করবে আয়েশা থেকে মুক্তি পেতে। প্রিয় বন্ধু, গল্পের দ্বিতীয় পর্বে আমরা দেখবো এরপর কি হয়। যদি আপনি এখান পর্যন্ত গল্প শুনে থাকেন তাহলে কমেন্ট করে জানান আপনি কোন জায়গা থেকে ভিডিওটি দেখলেন। আর দ্বিতীয় পর্ব চান কিনা সেটাও বলুন। আল্লাহর রহমতে ভালো থাকবেন।

Need a transcript for another video?

Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.

Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact

সুন্দরী এতিম মেয়ের করুণ কাহিনী; পর্বঃ-১ || Islamic Moral ...