মরুভূমির মানুষ কীভাবে ৫০০ রোমান যুদ্ধজাহাজ সাগরে ডুবিয়ে দিল? 😱 | Islamic History Bangla

ইমানের আলো2,316 words

Full Transcript

চোখ বন্ধ করে একবার দৃশ্যটা কল্পনা করুন। চারদিকে সাগরের ভয়ঙ্কর গর্জন আর আকাশ চিড়ে নেমে আসছে কান ফাটানো বজ্রপাত। পাহাড় সমান বিশাল ঢেউয়ের তড়ে কাঠের জাহাজগুলো আছড়ে পড়ছে একে অপরের গায়ে। আর ঠিক সেই উত্তাল মাঝ সমুদ্রে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চলছে এক রক্তক্ষয়ী লড়াই। জাহাজ থেকে বৃষ্টির মত তীর ছোড়া হচ্ছে। রক্তের স্রোত আর যোদ্ধাদের চিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস। একদিকে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সুপারপাওয়ার রোমান সাম্রাজ্যের 500 দানবীয় রণতরী আর অন্যদিকে অন্যদিকে এমন একদল মানুষ যাদের জন্ম হয়েছে মরুভূমির তক্ত বালুতে যারা [মিউজিক] জীবনে কখনো ঠিকমতো সাঁতারও কাটেনি কিভাবে মরুভূমির এই সাধারণ মানুষগুলো সমুদ্রের বুকে 700 বছরের অজেয় রোমান নৌবাহিনীকে চিরতরে সাগরের অতল গহব্বরে ডুবিয়ে দিয়েছিল চলুন একটু পেছনে ফেরা যাক সময়টা তখন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসনামল। তার যোগ্য নেতৃত্বে মুসলমানরা তখন স্থলভাগের এক অজয় সুপারপাওয়ারে পরিণত হয়েছে। পূর্ব থেকে পশ্চিম চারদিকে মুসলমানদের হুংকার। কিন্তু মাটিতে মুসলমানরা যতই শক্তিশালী হোক না কেন তাদের একটি বিশাল দুর্বলতা তখনো রয়ে গিয়েছিল। আর তা হলো সমুদ্রপথ। ভূমধ্য সাগরে [মিউজিক] তখন একছত্র আধিপত্য ছিল বিশাল রোমান সাম্রাজ্যের। রোমানরা খুব ভালো করেই জানতো যে মুসলমানরা মরুভূমির মানুষ। তারা বালুর বুকে লড়তে জানলেও সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে লড়ার কোন ক্ষমতা তাদের নেই। আর এই সুযোগটাই রোমানরা বারবার কাজে লাগাতো। তারা সমুদ্রপথে এসে মুসলমানদের উপকূলীয় শহরগুলোতে হঠাৎ হামলা করে আবার গভীর সমুদ্রে মিলিয়ে যেত। মুসলমানদের তখন নিজস্ব কোন নৌবাহিনী ছিল না। তাই তারা এই হামলার কোন জবাবও দিতে পারতো না এই পরিস্থিতি খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন তখনকার সিরিয়ার গভর্নর অত্যন্ত বিচক্ষণ সাহাবী হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে একটি চিঠি পাঠালেন। [মিউজিক] চিঠিতে তিনি খুব জোরালোভাবে আবেদন করলেন যে রোমানদের এই বারবার হামলার জবাব দিতে হলে মুসলমানদেরও নিজেদের একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কিন্তু খলিফা হযরত ওমর এই প্রস্তাব সরাসরি বাতিল করে দেন। এর পেছনে একটি বিশাল কারণ ছিল। গত 700 বছর ধরে ভূমধ্য সাগর ছিল পুরোপুরি রোমানদের হাতের মুঠো হয়ে। তাদের কাছে ছিল সেই যুগের সবচেয়ে আধুনিক আর শক্তিশালী 1000 রণতরী। এই সমুদ্রের উপর তাদের এতটাই নিয়ন্ত্রণ ছিল যে ভূমধ্য সাগরকে তখন রোমানদের নিজেদের পুকুর বলা হতো। খলিফা ওমর জানতেন সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের কোনো অভিজ্ঞতা মুসলমানদের নেই। তাই এমন এক অপরিচিত ময়দানে নিজের প্রিয় ভাই ও সৈন্যদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে তিনি কিছুতেই রাজি ছিলেন না। তবে দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাহাদাতের পর। মুসলমানদের নতুন খলিফা হিসেবে দায়িত্ব নেন হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি খলিফা হওয়ার পর সিরিয়ার সেই দূরদর্শী গভর্নর হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহুর দায়িত্ব আরো বাড়িয়ে দিলেন। তাকে পুরো শাম বা সিরিয়া অঞ্চলের প্রধান গভর্নর নিযুক্ত করা হলো। সুযোগ পেয়ে হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আবারো নৌবাহিনী গড়ার সেই পুরনো দাবিটি নতুন খলিফা হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে পেশ করলেন কিন্তু খলিফাও প্রথমে রাজি হননি তিনি চিঠির জবাবে লিখলেন যখন হযরত ওমর তোমাকে নৌবাহিনী বানাতে নিষেধ করেছিলেন তখন আমি তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম [মিউজিক] তাই এখনো আমি তোমাকে এর অনুমতি দিতে পারছি না কিন্তু হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু হাল ছাড়ার পাত্র ছিলেন না তিনি ক্রমাগত খলিফাকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে লাগলেন। একটি চিঠিতে তিনি রোমানদের দ্বীপ সাইপ্রাসের কথা উল্লেখ করে লিখেছিলেন সাইপ্রাস আমাদের উপকূলের এত কাছে যে তাদের কুকুর ডাকার আওয়াজও আমাদের কানে এসে পৌঁছায়। এর মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে রোমানরা কতটা কাছাকাছি বসে মুসলমানদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবশেষে তার ক্রমাগত পীড়াপিড়িতে হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সাইপ্রাসে হামলা করার অনুমতি দিলেন। তবে তিনি একটি কঠিন শর্ত জুড়ে দিলেন। তিনি বললেন, তুমি যদি মনে করো সমুদ্রের বুকে যুদ্ধ করা সত্যিই এত সহজ আর নিরাপদ তাহলে এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক সেনাপতিকে তাদের নিজেদের স্ত্রীদেরও সাথে নিয়ে যেতে হবে। খলিফা ভেবেছিলেন এই শর্ত শুনে হয়তো তারা পিছিয়ে যাবে। কিন্তু হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে এই শর্ত মেনে নিলেন। আর এর মাধ্যমেই শুরু হলো ইসলামের ইতিহাসের প্রথম নৌবাহিনী গড়ার কাজ। আরব আর মরুভূমির এই মানুষদের জীবনে যারা কখনো একটা ছোট নৌকাও ঠিকমত বানায়নি তারা কিভাবে বিশাল যুদ্ধজাহাজ বানাবে? এই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য মুসলমানরা এক দারুণ কৌশল অবলম্বন করল। আসলে মুসলমানরা যখন রোমানদের কাছ থেকে মিশর এবং ফিলিস্তিনের মত এলাকাগুলো জয় করেছিল, তখন সেখানে রোমানদের তৈরি করা বিশাল বিশাল জাহাজ বানানোর কারখানা মুসলমানদের হাতে এসেছিল। আগে রোমানরা এই কারখানাগুলোতে তাদের নৌবাহিনীর জন্য ড্রমন নামের অতিকায় যুদ্ধজাহাজ তৈরি করতো। কারখানাগুলো এতদিন অযত্নে পড়েছিল। কিন্তু এখন খলিফার নির্দেশে সেই পুরনো কারখানাগুলোর ধুলো ঝেড়ে আবার চালু করা হলো। রোমানদের অধীনে কাজ করা বড় বড় খ্রিস্টান ইঞ্জিনিয়ার আর কারিগরদের ডেকে এনে বলা হলো এখন থেকে তোমরা আর রোমানদের জন্য নয় বরং মুসলমানদের জন্য এই সামুদ্রিক জাহাজগুলো তৈরি করবে রাত দিন এক করে শ্রমিকরা কাজ করতে লাগলো দেখতে দেখতে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম নৌবহর প্রস্তুত হয়ে গেল বেশ কিছু যুদ্ধজাহাজ যখন সম্পূর্ণ তৈরি তখন খলিফার শর্তানুযায়ী হযরত মুয়াবিয়া এবং তার সেনাপতিরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে নিয়ে [মিউজিক] সাইপ্রাসের উদ্দেশ্যে সমুদ্রের বুকে ভেসে পড়লেন। আর ঠিক এই যাত্রাপথেই [মিউজিক] লুকিয়ে আছে এক অসাধারণ এবং আবেগজনক একটি ঘটনা যা শুনলে [মিউজিক] আপনার গায়ে কাটা দিয়ে উঠবে। এই নৌবহরে হযরত মুয়াবিয়ার একজন সেনাপতির স্ত্রীও ছিলেন যার নাম ছিল উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা। আপনি কি জানেন এই উম্মে হারামকে? চলুন। এই উত্তাল সমুদ্র থেকে আপনাদের নিয়ে যাই কয়েক বছর আগের মদিনার এক শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে। দিনটি ছিল খুবই শান্ত। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আপন খালা এই উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহার বাড়িতেই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ঘুমের মাঝেই হঠাৎ নবীজির পবিত্র চোখ খুলে যায় এবং তার চেহারায় এক অপূর্ব হাসির রেখা ফুটে ওঠে। তিনি মুচকি হাসছিলেন। নবীজির এই হাসি দেখে তার খালা উম্মে হারাম অত্যন্ত কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আপনি কেন হাসছেন? তখন দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু [মিউজিক] আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত আনন্দিত কন্ঠে বললেন আমাকে এখনই একটি দৃশ্য দেখানো হয়েছে। আমি দেখলাম আমার উম্মতের কিছু সাহসী মানুষ সমুদ্রের বুকে যুদ্ধ করার জন্য এমনভাবে জাহাজে চড়ে এগিয়ে যাচ্ছে যেন কোন পরাক্রমশালী বাদশাহ তার রাজকীয় সিংহাসনে বসে আছেন। এই কথা শোনা মাত্রই উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা বলে উঠলেন ইয়া রাসূলাল্লাহ আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন যেন আমিও সেই সৌভাগ্যবান নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারি| দয়ার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম [মিউজিক] তাকে নিরাশ করলেন না। তিনি অত্যন্ত শান্ত কন্ঠে এবং নিশ্চিত করে জবাব দিলেন হ্যাঁ আপনি অবশ্যই সেই বাহিনীর সাথে থাকবেন। ভাবতে পারছেন বহু বছর আগের সেই [মিউজিক] ছোট্ট ভবিষ্যৎবাণী আজ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তব হতে চলেছে। উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা আজ সেই জাহাজে [মিউজিক] বসেই সাইপ্রাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। মুসলমানদের এই সুবিশাল নৌবহর দেখে সাইপ্রাসের অধিবাসীরা এতটাই ভয় পেয়ে গেল যে তারা বিন্দুমাত্র যুদ্ধ না করেই মুসলমানদের কাছে আত্মসমর্পণ করল। এটি ছিল সমুদ্রের বুকে মুসলমানদের [মিউজিক] প্রথম কোন মাস্করিক বিজয়। কিন্তু বিজয়ের এই আনন্দের মাঝেই নেমে আসে এক বিষাদের ছায়া। সাইপ্রাসে পৌঁছানোর পর উম্মে হারাম রাদিয়াল্লাহু আনহা [মিউজিক] তার ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়েন এবং শাহাদাত বরণ করেন। যে স্বপ্নের জন্য তিনি জীবনভর অপেক্ষা করেছিলেন সেই স্বপ্ন পূরণ করেই তিনি মহান রবের কাছে ফিরে গেলেন। আজও সাইপ্রাসের মাটিতে তার [মিউজিক] পবিত্র কবর সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। যাকে তুরস্কের মানুষজন অত্যন্ত সম্মানের সাথে হালা [মিউজিক] সুলতান বলে স্মরণ করে। সাইপ্রাস জয় করার পর পরবর্তী চার বছর এই এলাকাটি মুসলমানদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় আরো অনেক নতুন রণতরী। এই বিশাল নৌবহর নিয়ে হযরত মুয়াবিয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত [মিউজিক] নিলেন। এবার তার লক্ষ্য সরাসরি রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যান্টিনোপল। বলা হয়ে থাকে মুসলমানদের নৌবহর রোমান রাজধানীর এত কাছে পৌঁছে গিয়েছিল যে মুসলমান যোদ্ধারা নিজেদের চোখে রোমান বাদশার বিশাল সুরক্ষিত দুর্গ দেখতে পাচ্ছিল তারা এই হামলার জন্য মরিয়া ছিল কারণ তাদের মনে গেঁথে ছিল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি সুসংবাদ যেখানে তিনি বলেছিলেন যে মুসলিম বাহিনী সবার প্রথমে রোমান বাদশার শহরে হামলা করবে তাদের জন্য জান্নাত অবধারিত কিন্তু ঠিক যখন মুসলমানরা চূড়ান্ত হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখনই পিছন থেকে খবর আসে যে সাইপ্রাসের মানুষজন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। এই খবর শোনা মাত্রই হযরত মুয়াবিয়া আবেগের বসে রাজধানী আক্রমণ না করে পেছনের নিজেদের এলাকা সুরক্ষিত করার জন্য পুরো নৌবহর নিয়ে আবার সাইপ্রাসের দিকে প্রচন্ড বেগে ফিরে এলেন এবং খুব দ্রুতই সাইপ্রাসের বিদ্রোহ কঠোর হাতে দমন করে এলাকাটি পুনরায় নিজেদের দখলে নিলেন। কিন্তু মুসলমানদের এই দুঃসাহস দেখে রোমান বাদশা কনস্ট্যান্সের ক্ষোভ এবার বাঁধ ভাঙল। এতদিন যারা কেবল মরুভূমির বালুতে যুদ্ধ করেছে তারা আজ আমার রাজধানীর দরজা পর্যন্ত এসে ভয় দেখাচ্ছে বাদশাহ সিদ্ধান্ত নিলেন এবার তিনি মুসলমানদের রোমান নৌবাহিনীর আসল চেহারা দেখাবেন। প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকা রোমান বাদশাহ নিজে সেনাপতির দায়িত্ব নিয়ে প্রায় 500 টি বিশাল ভ্রমণ রণতরি নিয়ে মুসলমানদের চিরতরে শেষ করে দেওয়ার জন্য রওয়ানা হলেন। সাগরের বুক চিড়ে এই দানবীয় নৌবহর প্রচণ্ড বেগে মুসলমানদের দিকে ধেয়ে আসতে লাগলো। কিন্তু সাইপ্রাসের কাছাকাছি পৌঁছতেই রোমান বাদশার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তিনি দেখলেন রোমানদের ধ্বংস করার জন্য মুসলমানদের প্রায় 200 যুদ্ধজাহাজ আগেই সাগরের বুকে বুক [মিউজিক] চিতিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আসলে খলিফা হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর কাছে রোমানদের এই বিশাল প্রস্তুতির [মিউজিক] খবর আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। তিনি এক মুহূর্তেও দেরি না করে সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া এবং মিশরের গভর্নর আব্দুল্লাহ বিন সাদ রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন যেন তারা তাদের সমস্ত নৌবাহিনী নিয়ে রোমান বাদশাকে মাঝ দরিয়ায় আটকে দেয় দুই বিশাল নৌবাহিনী যখন একে অপরের মুখোমুখী হলো তখন এক অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হল। সমুদ্রের বাতাস হঠাৎ করে মুসলমানদের প্রতিকূলে বইতে শুরু করল। বাতাস এতই শক্তিশালী ছিল যে তা মুসলমানদের জাহাজগুলোকে পেছনের দিকে ধাক্কা দিচ্ছিল। এই অবস্থায় যদি যুদ্ধ শুরু হয় তবে বিশাল আকৃতির রোমান জাহাজগুলো খুব সহজেই বাতাসের বেগকে কাজে লাগিয়ে মুসলমানদের ছোট জাহাজগুলোর উপর উঠে গিয়ে সেগুলোকে চুরমার করে দিতে পারবে। প্রকৃতির এই বিরূপ আচরণ দেখে মুসলিম সেনাপতি এক দারুণ কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি সাথে সাথে নির্দেশ দিলেন সমস্ত জাহাজের নোংর সাগরের বুকে ফেলে দেওয়া হোক। এরপর তিনি রোমান বাদশার কাছে একটি বার্তা পাঠালেন। তিনি বললেন মাঝসাগরে যুদ্ধ করার চেয়ে চলো আমরা কোন বড় উন্মুক্ত সমভূমিতে গিয়ে মুখোমুখি লড়াই করি। এই বার্তা পেয়ে রোমান বাদশাহ এবং তার বিশাল বাহিনী অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। কারণ রোমানরা খুব ভালো করেই জানতো, যে মাটিতে নেমে যুদ্ধ করলে মুসলমানদের সাথে টেকা বিশ্বের কোন শক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সমুদ্র হলো তাদের নিজেদের এলাকা। বাদশাহ অহংকারের সাথে জবাব দিলেন যুদ্ধ সাগর বক্ষেই হবে। যখন রোমানরা মুসলমানদের এই অসহায়ত্ব দেখে হাসাহাসি করছিল ঠিক তখনই ঘটলো এক অলৌকিক ঘটনা। মুসলিম সেনাপতি হঠাৎ নির্দেশ দিলেন সমস্ত নগর তুলে ফেলতে। নোর তোলা মাত্রই কোন এক অদৃষ্ট ইশারায় হঠাৎ করেই সমুদ্রের বাতাসের দিক সম্পূর্ণ পালতে গেল। যে বাতাস এতক্ষণ মুসলমানদের পেছনে ঠেলে দিচ্ছিল সেই বাতাস এখন মুসলমানদের পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে রোমানদের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। এই অলৌকিক সাহায্য দেখে সমস্ত মুসলিম বাহিনী একযোগে তাকবীর ধ্বনি দিয়ে উঠল। আল্লাহু আকবার। বাতাসের প্রচন্ড বেগে মুসলমানদের 200 রণতরী তীরের মতো ছুটে চলল রোমান বাহিনীর দিকে। বাতাসের এই হঠাৎ পরিবর্তন দেখে রোমান বাদশার মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল কয়েকদিন আগে দেখা একটা ভয়ঙ্কর স্বপ্নের কথা। সে তার প্রাসাদের জ্যোতিষীদের এই স্বপ্নের কথা বলেছিল। জ্যোতিষীরা ভয়ে ভয়ে রাজাকে বলেছিল মহারাজ এই স্বপ্নের কেবল একটাই অর্থ আমাদের নিশ্চিত পরাজয় এবং ধ্বংস ইতিহাসের পাতায় এই লোমহর্ষক যুদ্ধকে বলা হয় জাত আস সাওয়ারি বা মাস্তু সমূহের যুদ্ধ কারণ সে যুগে তো আর আজকের মত কামান বা বারুদের গোলা ছিল না নৌযুদ্ধ হতো তীর বর্ষা আর তলোয়ার দিয়ে মুসলমানরা যখন রোমান জাহাজের একদম কাছে পৌঁছে গেল তখন তারা এক অভাবনীয় কাজ করে বসল তারা মোটা এবং শক্তর রশি ছুড়ে দিয়ে নিজেদের জাহাজগুলোকে রোমানদের দানবীয় জাহাজগুলোর সাথে শক্ত করে বেঁধে ফেলল। এর ফলে একটা বিশাল সুবিধা হলো। সাগরের ঢেউয়ে যেখানে রোমানদের জাহাজগুলো দুল ছিল এবং তাদের তিরন্দাজদের নিশানা বারবার ভুল হচ্ছিল সেখানে মুসলমানদের জাহাজগুলো একে অপরের সাথে বাঁধা থাকার কারণে একদম স্থির ছিল। মুসলমানদের ছোড়া প্রতিটি তীর নিখুতভাবে রোমান সৈন্যের বুকে গেঁথে যেতে লাগল। মাঝ সাগরের বুকে জাহাজগুলোকে জোড়া লাগিয়ে এক বিশাল ভাসমান রণক্ষেত্র তৈরি করা হলো। তলোয়ারের ঝনঝনি, যোদ্ধাদের চিৎকার আর সাগরের ঢেউড়ের শব্দ মিলেমিশে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। যুদ্ধ যখন চরম আকার ধারণ করেছে তখন হঠাৎ আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল। শুরু হলো বজ্রপাত আর সাগরের বুকে এক বিশাল সামুদ্রিক ঝড়। কিন্তু এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাঝেও এক মুহূর্তের জন্যও যুদ্ধ থামলো না। মুসলমানরা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে লড়াই করে রোমানদের তচনচ করে ফেলল। অবস্থা খারাপ দেখে রোমানরা তাদের শেষ চালটি চালল। তারা বুঝতে পারল যে মুসলমানদের যদি হারাতে হয় তাহলে তাদের প্রধান সেনাপতি আব্দুল্লাহ বিন সাদকে শেষ করতে হবে। রোমানদের একটি বিশেষ দল তাদের জাহাজ নিয়ে সরাসরি মুসলিম সেনাপতির জাহাজে আক্রমণ করল এবং মোটা চেন দিয়ে সেনাপতির জাহাজকে নিজেদের জাহাজের সাথে বেঁধে মূল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগলো। এই আকস্মিক হামলায় মুসলিম সেনাপতি আহত হলেন। কিন্তু দূর থেকে এক সাধারণ মুসলিম যোদ্ধা এই দৃশ্য দেখে নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করলেন। তিনি এক লাফে ওই দুই জাহাজের মাঝখানে গিয়ে পড়লেন এবং নিজের সর্বশক্তি দিয়ে তলোয়ারের কোপে সেই শক্ত রশি কেটে দিলেন। মুসলিম সেনাপতির প্রাণ তো বেঁচে গেল কিন্তু ওই বীর মুসলিম যোদ্ধা সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে হারিয়ে গেলেন। শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন। এই দৃশ্য দেখে বাকি মুসলিম যোদ্ধাদের রক্ত যেন টকবক করে ফুটতে শুরু করল। তাদের আক্রমণের ধার এতই বেড়ে গেল যে রোমানদের অহংকারের প্রতীক ওই বিশাল জাহাজগুলো এক এক করে সাগরের বুকে ডুবতে শুরু করল। পাঁচ জাহাজের বিশাল রোমান নৌবহর আক্ষরিক অর্থেই কচুকাটা হতে লাগলো। রোমান বাদশাহ কনস্ট্যান্স বুঝতে পারলেন যে এই মৃত্যুপুরি থেকে রক্ষা পাওয়ার আর কোন উপায় নেই। নিজের সম্মান বাঁচাতে এই প্রতাপাধীন রাজা তার রাজকীয় মুকুট আর পোশাক খুলে ফেললেন। একজন সাধারণ সৈন্যের পোশাক গায়ে জড়িয়ে কোনমতে নিজের প্রাণটি হাতে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেন। আর এভাবেই খলিফা হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর শাসন আমলে মুসলমানরা সমুদ্রের বুকে তাদের প্রথম এবং সবচেয়ে বড় এবং ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করল। এই একটি যুদ্ধ রোমান সাম্রাজ্যের মেরুদন্ড চিরতরে ভেঙে দিয়েছিল। তাদের 700 বছরের সামুদ্রিক দম্ভ ধুলোই মিশে গিয়েছিল। কিন্তু খলিফা হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এখানেই থেমে থাকতে চাননি। তিনি জানতেন কনস্টান্টিনোপলের পতন এত সহজে হবে না। তাই তিনি এক নতুন এবং যুগান্তকারী মাস্টারপ্লান তৈরি করলেন। তিনি তার এক দূরবর্তী গভর্নরের কাছে একটি চিঠি এবং একটি বিশাল মানচিত্র পাঠালেন। সেখানে তিনি ইসলামের ভবিষ্যতের পথরেখা এঁকেছিলেন। তার পরিকল্পনা ছিল মুসলমানরা প্রথমে উত্তর আফ্রিকা হয়ে স্পেইন জয় করবে। এরপর সেখান থেকে ফ্রান্স তারপর ইতালি এবং গ্রিস হয়ে পুরো ইউরোপ জয় করতে করতে পিছন দিক থেকে রোমান রাজধানী চূড়ান্ত আঘাত হানবে কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় খলিফার এই মহান স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হওয়ার আগেই নিজ গৃহেই নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন তবে শাহাদাতের স্বাদ গ্রহণ করার আগেই হযরত উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং তার নির্বাচিত সেনাপতিরা ইসলামের ইতিহাসে এমন এক অমর কীর্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন যা আজীবন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে একটা মরুভূমির জাতি যারা কোনদিন সমুদ্রের বিশাল ঢেউ দেখেনি তারা কেবল ঈমান আর সাহসের জোরে তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় সুপারপাওয়ারের 700 বছরের পুরনো নৌ আধিপত্যকে চিরতরে সাগরের অতল গহব্বরে ডুবিয়ে দিয়েছিল। আর এভাবেই রচিত হয়েছিল ইসলামের গৌরবময় নৌ ইতিহাসের প্রথম এবং অবিস্মরণীয় অধ্যায়। যারা আল্লাহর উপর ভরসা করে সমুদ্রের ঢেউও তাদের পথ আটকে দাঁড়াতে পারে

Need a transcript for another video?

Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.

Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact

মরুভূমির মানুষ কীভাবে ৫০০ রোমান যুদ্ধজাহাজ সাগরে ডুবিয়ে দ...