খাইবার যুদ্ধে কী ঘটেছিল? যে মোজেজা দেখে শত্রুরাও কেঁপে উঠেছিল! | Hazrat Ali (RA) History

ইমানের আলো2,399 words

Full Transcript

কল্পনা করুন এমন এক যুদ্ধের কথা যেখানে 1400 সাহাবী আটকা পড়েছেন এক অভেদ্য পাথরের দুর্গের সামনে। আর উপর থেকে তীরের বৃষ্টি আর বিশাল পাথর ফেলা হচ্ছে। পাথর আর তীরের আঘাতে যখন সবাই ক্ষতিগ্রস্ত ঠিক তখনই মদিনার আকাশে ধ্বনিত হলো এক অলৌকিক ঘোষণা। [মিউজিক] কে সেই বীর যার চোখের ইশারায় সুস্থ হয়ে গেল কঠিন অসুখ। কিভাবে একজন মানুষ একাই উপড়ে ফেললেন কয়েকশো মর ওজনের লোহার দরজা। আজ আমরা [মিউজিক] ফিরে যাবো ইতিহাসের সেই রোমাঞ্চকর এবং গায়ে কাটা দেওয়া যুদ্ধের ময়দানে। যার নাম খায়বার। প্রস্তুত হন ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মোজেজা আর বীরত্বের সাক্ষী হতে। সময়টা হিজরী সপ্তম সাল। মদিনা মুনাওয়ারা যেখানে আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার প্রাণপ্রিয় সাহাবীরা বসবাস করতেন। কিন্তু মদিনার এই শান্তিময় পরিবেশ কিছুতেই সহ্য হচ্ছিল না কিছু ষড়যন্ত্রকারী। মদিনা [মিউজিক] থেকে বেশ দূরে অবস্থিত এক উর্বর মরুদান যার নাম ছিল খাইবার। খাইবার কোন সাধারণ গ্রাম বা শহর ছিল না। এটি ছিল তৎকালীন আরবের ইহুদিদের সবচেয়ে বড় নিরাপদ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাটি। সেখানে ছিল পরপর কয়েকটি বিশাল [মিউজিক] এবং অভেদ্য দুর্গ বা কেল্লা। তাদের কাছে ছিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের বিশাল মজুদ দুর্গের ভিতর সুরক্ষিত পানির কুয়া, বছরের পর বছর বসে খাওয়ার মত অফুরন্ত খাবার আর হাজার হাজার দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। মদিনা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর ইহুদিরা এই খাইবারে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু তারা সেখানে শান্তিতে বসে থাকেনি। তারা মদিনার মুসলমানদের ধ্বংস করার জন্য আরবের বিভিন্ন গোত্রের সাথে গোপনে ষড়যন্ত্র করতে শুরু করল। তাদের একটাই লক্ষ্য ইসলামকে পৃথিবীর বুক থেকে চিরতরে মুছে ফেলা। তারা মক্কার কুরাইশদের উসকে দিচ্ছিল অন্যান্য গোত্রকে টাকা আর অস্ত্রের লোভ দেখাচ্ছিল। এই ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের খবর যখন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে পৌঁছলো, তিনি বুঝতে পারলেন এই বিষ ফোড়াকে এখনই উপড়ে ফেলতে হবে। নইলে [মিউজিক] মদিনার নিরীহ মানুষগুলো আর কোনদিন শান্তিতে ঘুমাতে পারবে না। ইসলাম সবসময় শান্তির কথা বলে। কিন্তু যখন শত্রুরা অস্তিত্ব মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করে তখন চুপ করে বসে থাকাও বোকামি। নবীজি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাল ক্ষেপণ করলেন না মাত্র চোদ্দশ সাহাবীর এক ছোট কিন্তু ঈমানে টকবক করা এক বাহিনী নিয়ে তিনি খাইবারের দিকে রওনা দিলেন। মরুভূমির রুক্ষ তপ্ত আর দীর্ঘ পথ। সাহাবীদের পায়ে কষ্ট পেটে ক্ষুধা কিন্তু বুকে আল্লাহর প্রতি অগাধ প্রেম। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মুসলিম বাহিনী রাতের ঘুটঘুটা আধারে খায়বারের একেবারে কাছে এসে পৌঁছলো। তারা এত নিঃশব্দে এত সুশৃঙ্খলভাবে সেখানে তাবু ফেলল যে খাইবারের সতর্ক ইহুদি পাহারাদাররাও টেরই পেল না যে তাদের মাথার উপর মৃত্যুর পরোয়ানা এসে হাজির হয়েছে। চারদিক নিস্তব্ধ। শুধু মরুভূমির বাতাসের সনসন শব্দ। সাহাবীরা নীরবে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন রইলেন। পরদিন সূর্য ওঠার সাথে সাথে খাইবারের কৃষকরা যখন প্রতিদিনের মতো কোদাল আর ঝুড়ি নিয়ে বাগানে কাজ করতে বের হলো তখন বাইরের দৃশ্য দেখে তাদের চোখ কপালে উঠে গেল। তারা দেখল তাদের সেই বিশাল দুর্গের ঠিক বাইরেই মুসলিম বাহিনীর সারি সারি তাবু অস্ত্র সসজ্জিত মুসলিম মুজাহিদরা একদম প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ভোরের আলোতে সাহাবীদের হাতের তলোয়ার গুলো চকচক করছে। কৃষকরা ভয়ে চিৎকার করতে করতে দুর্গের ভিতর দৌড় দিল। তারা পাগলের মত চিৎকার করে বলতে লাগলো মোহাম্মদ এসে গেছে তার বাহিনী এসে গেছে দ্রুতগতিতে দুর্গের বিশাল বিশাল লোহার দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হলো ভিতর থেকে শুরু হলো খাইবারের ঐতিহাসিক যুদ্ধ কিন্তু এই যুদ্ধ বদর বা উহুদের মত কোন খোলা ময়দানের যুদ্ধ ছিল না এটি ছিল এক দীর্ঘমেয়াদী অবরোধ ইহুদিরা তাদের সুরক্ষিত পাথরের দুর্গের ভিতর একেবারে নিরাপদ আর মুসলিমরা খোলা আকাশের নিধে ইহুদিরা দুর্গের উচু দেয়াল থেকে বৃষ্টির মত তীর আর পাথর ছুড়তে লাগলো। সাহাবীরা অনেক চেষ্টা করলেন দেয়াল টপকানোর কিন্তু কিছুতেই পারলেন না। মুসলমানদের সাহসের কাছে ধীরে ধীরে খায়বার এলাকার ছোট ছোট কয়েকটি দুর্গ পতন [মিউজিক] হতে লাগলো ঠিকই। কিন্তু সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে সুরক্ষিত দুর্গটি যার নাম ছিল কামুচ [মিউজিক] দুর্গ সেটি কোনভাবেই জয় করা যাচ্ছিল না। দিনের পর দিন কেটে যাচ্ছে। সাহাবীরা ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন। মুসলমানদের রসদ আর খাবার ফুরিয়ে আসতে লাগলো। পেটে তীব্র ক্ষুধা। এমনও দিন গেছে গাছের পাতা সেদ্ধ করে খেতে হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ থামানোর বা মদিনায় ফিরে যাওয়ার কোন উপায় নেই। প্রথম দিন নবীজি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বক্কর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে ইসলামী বাহিনীর পতাকা তুলে দিয়ে পাঠালেন। তিনি সারাদিন বীরের মত লড়াই করলেন কিন্তু দুর্গ জয় হলো না। পরদিন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা বীর কেশরী হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাতে পতাকা দেওয়া হলো। তিনিও তার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে লড়লেন কিন্তু সেই অভেদ্য পাথরের দেয়াল আর বিশাল দরজা কিছুতেই ভাঙ্গা গেল না| এখানে তাদের বীরত্বের বা ঈমানের কোন কমতি ছিল না বরং আল্লাহ তাআলা এই মহান বিজয় অন্য আরেকজন সৌভাগ্যবান মানুষের ভাগ্যে লিখে রেখেছিলেন সাহাবীদের মাঝে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসলো [মিউজিক] তারা ভাবতে শুরু করলেন তবে কি কামসদুর্গ জয় হবে না আমরা কি [মিউজিক] খালি হাতে মদিনায় ফিরে যাব ইহুদিরা কি তাহলে জিতে যাবে সন্ধ্যা নেমে এল খাইবারের প্রান্তরে [মিউজিক] চারদিক থমথমে মুসলিম শিবিরে এক নীরব দুশ্চিন্তা ঠিক সেই রাতে এশার নামাজের পর নবীজি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের সামনে এসে দাঁড়ালেন তার পবিত্র চেহারা অত্যন্ত শান্ত কিন্তু চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা তিনি সাহাবীদের দিকে তাকিয়ে ঘোষণা দিলেন আগামীকাল সকালে আমি এই পতাকা এমন একজন ব্যক্তির হাতে তুলে দেব যার হাতে আল্লাহ এই দুর্গ বিজয় দান করবেন সে এমন একজন মানুষ যে আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালোবাসে এবং স্বয়ং আল্লাহ ও তার রাসূলও তাকে ভালোবাসেন সে কখনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিঠ দেখিয়ে পালিয়ে আসার মানুষ নয় সুবহানাল্লাহ একটু গভীরভাবে নিজের বিবেককে প্রশ্ন করে দেখুন তো কি এক অসাধারণ সুসংবাদ আর কি এক অবিশ্বাস্য সার্টিফিকেট স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলছেন আল্লাহ ও তার রাসূল তাকে ভালোবাসেন একজন মুমিনের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া পৃথিবীতে আর কি হতে পারে? যার উপর স্বয়ং আল্লাহ রাজি। দুনিয়ার আর কোন রাজত্ব বা সম্পদের কি তার প্রয়োজন আছে? এই কথা শোনার পর সেই রাতে কোন সাহাবীর চোখেই ঘুম আসলো না। সবাই আবেগে ভালোবাসায় আর প্রতীক্ষায় ছটফট করতে লাগলেন। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু পরবর্তীতে [মিউজিক] আবেগ জড়িত কন্ঠে বলেছিলেন, আমি জীবনে কোনদিন সেনাপতি হওয়ার বা নেতৃত্ব পাওয়ার ইচ্ছা করিনি। কিন্তু সেই রাতে আমি শুধু এটাই কামনা করছিলাম যে কাল যেন আমাকেই ডাকা হয়। কাল যেন আমি সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হতে পারি। প্রত্যেক সাহাবী সারারাত জেগে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করে দোয়া করছিলেন। সবার মনে একটাই প্রশ্ন কাল সকালে নবীজি কাকে ডাকবেন? আবু বক্করকে, ওমরকে নাকি অন্য কাউকে? ভোর হল, ফজরের নামাজ শেষ হল। পূব আকাশে সূর্য উকি দিচ্ছে। হাজার হাজার সাহাবী অধীর আগ্রহে নবীজির তাবুর সামনে ভিড় করে আছেন। সবার বুক ধুকুক করছে। সবাই পায়ের আঙ্গুলের উপর ভর দিয়ে একটু উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। গলাটা [মিউজিক] একটু বাড়িয়ে দিচ্ছেন যাতে নবীজির নজর অন্তত তাদের উপর পড়ে। নবীজি তাবু থেকে বের হলেন। তার হাতে সেই কাঙ্খিত বিজয়ের পতাকা। সকালের স্নিগ্ধ বাতাস এসে সেই পতাকা দুলিয়ে দিচ্ছে। সবাই মনে মনে ভাবছেন, হয়তো আজ আমার নামটা উচ্চারিত হবে। নবীজি ভিড়ের মধ্যে চোখ বুলালেন কিন্তু যাকে খুঁজছিলেন তাকে দেখতে পেলেন না। তখন তিনি উচ্চস্বরে ডাক দিলেন আলী ইবনে আব তালিব কোথায় সবাই চমকে উঠলেন হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু কিন্তু তিনি এই মুহূর্তে যুদ্ধ করার মত অবস্থায় নেই। সাহাবীরা অত্যন্ত আদবের সাথে নিচু স্বরে জানালেন ইয়া রাসূলাল্লাহ আলীর তো চোখ ফুটেছে তার চোখের ব্যথায় অবস্থা এতটাই খারাপ যে তিনি চোখ মেলেই তাকাতে পারছেন না আলো তো দূরের কথা তিনি তীব্র যন্ত্রণায় তাবুর ভিতর শুয়ে আছেন। [গলা পরিষ্কার করা] নবীজি বললেন, তাকেই আমার কাছে নিয়ে এসো। কয়েকজন সাহাবী দৌড়ে গেলেন| তারা হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে প্রায় ধরে ধরে [মিউজিক] অত্যন্ত সাবধানে নবীজির সামনে নিয়ে এলেন। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর চোখ তখন তীব্র ব্যথায় লাল হয়ে আছে। ফুলে গেছে। ভোরের আলোতে তাকাতেও তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। তিনি কোনমতে মাথা নিচু করে নবীজির সামনে এসে বসলেন। নবীজি তার আদরের জামাতা এবং সাহাবীর এই কষ্ট দেখে ব্যথিত হলেন। তিনি হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর মাথাটা পরম মমতায় নিজের দিকে একটু টেনে নিলেন। তারপর তিনি তার পবিত্র মুখের একটুখানি লালা আঙ্গুলে নিলেন এবং পরম মমতায় হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর দুই চোখের [মিউজিক] উপর লাগালেন। আর সাথে সাথে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। সুবহানাল্লাহ। যে চোখের যন্ত্রণায় হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু একটু আগেও কাতরাতচ্ছিলেন। নবীজির সেই পবিত্র [মিউজিক] স্পর্শ লাগার সাথে সাথেই চোখের পলকে সেই ব্যথা গায়েব হয়ে গেল। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু চোখ মেলে তাকালেন। তার চোখ দুটো একদম পরিষ্কার, উজ্জ্বল এবং সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেল। মনে হচ্ছিল যেন তার চোখে কোনদিনই কোন অসুখ [মিউজিক] ছিল না। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন। তার শরীরের সমস্ত ক্লান্তি চোখের যন্ত্রণা আর [মিউজিক] দুর্বলতা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। নবীজি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার হাতে সেই বিজয়ের পতাকা তুলে দিলেন। তবে যাওয়ার আগে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে একটি মহা মূল্যবান নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন হে আলী তুমি শান্তভাবে তাদের দুর্গের দিকে এগিয়ে যাও। সেখানে গিয়ে প্রথমে তাদের আল্লাহর দিকে ইসলামের দিকে ডাকবে। আল্লাহর কসম তোমার মাধ্যমে যদি আল্লাহ একজন মানুষকেও হেদায়েত দান করেন তবে তা তোমার জন্য লাল উটের চেয়েও উত্তম। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু পতাকা হাতে নিয়ে তার সেই বিখ্যাত দুই দিকওয়ালা তলোয়ার জুলফিকার কোমরে বেঁধে ঘোড়ায় চড়ে সোজা খাইবারের দুর্গের দিকে রওনা হলেন। তার পেছনে নির্ভীক মুসলিম বাহিনী। অন্যদিকে খাইবারের কামুজ দুর্গের ভেতরে তখন ইহুদিদের মধ্যে এক ধরনের চরম অহংকার বিরাজ করছে। তারা ভাবছে দুনিয়ার কোন শক্তি এই দুর্গ ভাঙতে পারবে না। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু দুর্গের একদম কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি নবীজির নির্দেশমত তাদের শান্তির পথে ইসলামের পথে দাওয়াত দিলেন। কিন্তু ইহুদিরা তাচ্ছিল্যের সাথে প্রত্যাখ্যান করল। তারা ভাবলো মুসলমানদের আজ চিরতরে শেষ করে দেবে। এই ভেবে তারা দুর্গের বিশাল লোহার দরজা খুলে দিল। আর ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো খাইবারের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, সবচেয়ে শক্তিশালী এবং নিষ্ঠুর যোদ্ধা। তার নাম ছিল মারহাব। এই মারহাব কোন সাধারণ যোদ্ধা ছিল না। সে ছিল বিশাল দেহের অধিকারী এক আস্ত দানব। তার উচ্চতা আর স্বাস্থ্য দেখে সাধারণ মানুষ এমনিতেই ভয়ে পিছিয়ে যেত। তার সারা শরীর দুই স্তরের ভারী লোহার বর্মে ঢাকা। এমনকি তার মাথায় ছিল দুটো লোহার হেলমেট। আর তার উপর একটা বিশাল পাথর বসানো। যাতে কেউ তার মাথায় তলোয়ারের আঘাত করতে না পারে। সে অহংকার করে বলত সে একাই হাজারজন সৈন্যের সমান। মারহাব তার বিশাল ঘোড়া ছুটিয়ে ময়দানের মাঝখানে এল। তার ভারী তলোয়ার ঘোরাতে ঘোরাতে অহংকারের সাথে সুর করে কবিতা গাইতে শুরু করল। পুরো খাইবার জানে যে আমি মারহাব। আমি এমন এক বীর যে অস্ত্রে সজ্জিত এবং যুদ্ধে পরীক্ষিত। যখন যুদ্ধের আগুন জ্বলে তখন আমিই সবার আগে থাকি। তার এই ভয়ঙ্কর হুংকার শুনে চারপাশ কেঁপে উঠলো। মুসলিম বাহিনীর অনেকেই এই বিশাল দানবকে দেখে কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন, কিন্তু হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর ডিকশনারিতে ভয় বলে কোন শব্দ ছিল না। তিনি ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামলেন। তার পরনে কোন ভারী লোহার বর্ম নেই। কিন্তু [মিউজিক] তার বুকে আছে আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস আর নবীজির দেওয়া সেই সুসংবাদ। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু তার বিখ্যাত তলোয়ার জুলফিকার হাতে নিয়ে মারহাবের দিকে বীরদর্পে এগিয়ে গেলেন। মারহাবের কবিতার জবাবে তিনি কবিতা পড়লেন। আমি সেই ব্যক্তি আমার মা আমার নাম রেখেছেন হায়দার অর্থাৎ সিংহ। আমি জঙ্গলের সেই ভয়ঙ্কর সিংহের মত যাকে দেখে সবাই ভয় পায়। আমি আজ তোমাদের এমন মার মারবো যা তোমরা কোনদিনও কল্পনাও করোনি। এই কথা শুনে মারহাব অপমানের রেগে আগুন হয়ে গেল। সে তার বিশাল তলোয়ার নিয়ে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর উপর পাগলের মত ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হলো ইতিহাসের অন্যতম সেরা এবং রোমাঞ্চকর মল্যযুদ্ধ। তলোয়ারে তলোয়ারে আঘাতের ঝনঝন শব্দে পুরো খাইবার প্রান্তর কেঁপে উঠলো। মারহাব তার পুরো শারীরিক শক্তি দিয়ে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আঘাত করার চেষ্টা করছে। সে একের পর এক কোপ মারছে। কিন্তু হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এতই ক্ষিপ্র আর দ্রুত যে মারহাবের ভারী তলোয়ার কেবল বাতাস কাটছে। তাকে ছুতেও পারছে না। যখন তাদের তলোয়ারে তলোয়ারে ধাক্কা লাগছিল তখন ঘর্ষণে আগুনের ফুলকি ছিপে বেরচ্ছিল ময়দানে। হঠাৎ মারহাব প্রচন্ড জোরে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে একটি আঘাত করল ঢালটি ছিটকে অনেক দূরে পড়ে গেল চারদিক স্তব্ধ ময়দানে পিনপতন নীরবতা যুদ্ধের ময়দানে একজন যোদ্ধার হাত থেকে ঢাল পড়ে যাওয়া মানেই নিশ্চিত [মিউজিক] মৃত্যু মারহাব এক শয়তানি হাসি হাসলো সে ভাবল এবার এই খালি হাত আলীকে আমি এক কোপে দুই টুকরো করে ফেলবো [মিউজিক] কিন্তু সে জানতো না হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর আসল ঢাল কোন কাঠ বা লোহার ছিল না। তার আসল ঢাল ছিল স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'আলার পক্ষ থেকে আসা এক গায়েবী সাহায্য। ঢাল হারিয়ে হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু [মিউজিক] এক বিন্দুও ভয় পেলেন না। তিনি সোজা দুর্গের সেই বিশাল লোহার দরজার দিকে দৌড় দিলেন। এই দরজা কোন সাধারণ [মিউজিক] দরজা ছিল না। সিরাত এবং ইতিহাসের কিতাবে এসেছে এই দরজা এতটাই ভারী আর মজবুত ছিল, যে তা খোলা বা বন্ধ করার জন্য প্রতিদিন বহু মানুষের প্রয়োজন হতো। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই দরজার পাল্লার একটি অংশ শক্ত করে ধরলেন| তার বাহুতে তখন যেন ঐশ্বরিক শক্তি ভর করেছে| তিনি আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে আল্লাহু আকবার বলে এক প্রচন্ড টান দিলেন এবং সবার চোখের সামনে সেই বিশাল লোহার দরজা তার কবজি থেকে মরমর শব্দে উপড়ে গেল। শুধু উপড়ে ফেলাই নয়, হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই বিশাল আকার কয়েকশো মণ ওজনের লোহার দরজাকে তার এক হাতে শূন্যে উত্তোলন করলেন। তিনি সেই দরজাকেই তার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেন। মারহাব এই দৃশ্য দেখে ভয় পেয়ে গেল। [মিউজিক] তার হাত কাঁপতে শুরু করল। সে বুঝতে পারল সে আজ কোন সাধারণ মানুষের সাথে লড়ছে না। সে লড়ছে আল্লাহর এক গায়েবী শক্তির সাথে। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই বিশাল দরজাকে বা হাতে ঢাল ধরে ডান হাতে তার বিখ্যাত তলোয়ার জুলফিকার নিয়ে মারহাবের দিকে সিংহের মত ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মারহাব বাঁচার জন্য শেষ চেষ্টা হিসেবে তার তলোয়ার তুলল। কিন্তু হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এর ঈমানী ক্ষিপ্রতার সামনে তা ছিল একেবারেই তুচ্ছ। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এক প্রচন্ড হুংকার দিয়ে জুলফিকার উঁচিয়ে ধরে মারহাবের মাথার উপর সজোরে আঘাত করলেন খটাস করে এক বিকাট শব্দ হলো আর সেই অহংকারী দানব মারহাব মাটিতে লুটিয়ে পড়ল চিরতরের জন্য মারহাবের এই ভয়ঙ্কর পতন দেখে খাইবারের ইহুদিদের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো তাদের সেরা যোদ্ধা তাদের সবচেয়ে বড় অহংকার চোখের পলকে ধুলোয়ে মিশে গেছে তারা ভয়ে চিৎকার কার করতে করতে দুর্গের ভেতরে পালাতে শুরু করল। হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং মুসলিম বাহিনী তাদের পিছু নিল। কিন্তু ইহুদিরা দুর্গের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করার চেষ্টা করল। তখন হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু সেই উপরে পেলা বিশাল লোহার দরজাটি দিয়ে দুর্গের প্রবেশপথে একটি সেতুর মত তৈরি করে দিলেন যাতে মুসলিম সৈন্যরা সহজেই পার হয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে খাইবারের আকাশ বাতাস মুখরীত হয়ে উঠলো। মুসলিম বাহিনী বন্যার জলের মত দুর্গের ভেতরে প্রবেশ করল। ইহুদিদের সমস্ত অহংকার, তাদের দুর্ভেদ্য দুর্গের গর্ব, তাদের ষড়যন্ত্র সবকিছু মাটির সাথে মিশে গেল। তারা মাথা নত করে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হলো। যুদ্ধ শেষে যখন চারপাশ শান্ত হলো তখন সাহাবীরা সেই লোহার দরজাটির কাছে গেলেন যেটি হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু একা হাতে তুলেছিলেন। হযরত আবু রাফে রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং অন্যান্য সাহাবীরা আশ্চর্য হয়ে বর্ণনা করেন আমরা প্রথমে সাত আট জন মিলে সেই দরজাটি মাটি থেকে তোলার বা উল্টানোর চেষ্টা করলাম কিন্তু আমরা সেটা এক ইঞ্চিও নড়াতে পারলাম না। পরে আমরা প্রায় 40 জন শক্তিশালী লোক মিলে অনেক কষ্টে সেই দরজাটি মাটি থেকে সরাতে পেরেছিলাম। একবার গভীরভাবে নিজের মনকে প্রশ্ন করুন তো, যে দরজা 40 জন শক্তিশালী মানুষ মিলে তুলতে হিমসিম খাচ্ছিল, সেই কয়েকশো মন ওজনের দরজা হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু কিভাবে এক হাতে তুলেছিলেন? এটা কি তার নিজের গায়ের জোর ছিল? না। এটা ছিল তার ঈমানের জোর। এটা ছিল স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে আসা এক গায়েবী সাহায্য।

Need a transcript for another video?

Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.

Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact

খাইবার যুদ্ধে কী ঘটেছিল? যে মোজেজা দেখে শত্রুরাও কেঁপে উঠ...