আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ।
প্রিয় দর্শক আজ শুরু করছি এক এমন নারীর জীবন কাহিনী যার জীবন ছিল পর্দার আড়ালে
থেকেও সূর্যের চেয়ে প্রখর। এ কাহিনী কেবল এক নারীর নয় বরং ধৈর্য, বিশ্বাস আর
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। আসুন আমরা প্রবেশ করি তার
জীবনের গভীরে। যেখানে প্রতিটি নিঃশ্বাস ছিল আল্লাহর জন্য নিবেদিত এবং প্রতিটি
পদক্ষেপে ছিল ঈমানের অটুট শক্তি। বহুকাল আগের কথা এক সমৃদ্ধ জনপদে ভোরের আজান ভেসে
আসতো দূর মসজিদ থেকে। আর সেই সুরের সাথে ঘুম ভাঙতো এক তরুণীর। নাম তার ফাতেমা। তার
দিন শুরু হতো ফজরের নামাজের মধ্য দিয়ে। সে ছিল তার বাবা-মায়ের একমাত্র আদরের
সন্তান। তার বাবা ছিলেন একজন জ্ঞানী আলেম। যিনি নিজের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে
ফাতেমাকে এমনভাবে গড়ে তুলেছিলেন, যেন সে হয় দ্বীনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। ফাতেমার
জগৎ ছিল তার ঘর আর তার বাবার বিশাল গ্রন্থাগার। সেখানে সারি সারি বইয়ের মাঝে
সে খুঁজে পেত তার প্রশান্তি। সে শুধু জ্ঞান অর্জন করতো না বরং সেই জ্ঞান
অনুযায়ী নিজের জীবনে ধারণ করার চেষ্টা করত। একদিন তার বাবা তাকে ডেকে বললেন মা
ফাতেমা তুমি এখন বড় হয়েছো তোমার জন্য একটি বিয়ের প্রস্তাব এসেছে একজন সৎ ও
ধার্মিক যুবক সে দূরের এক জনপদে ব্যবসা করে কিন্তু তার ঈমান ও আমল অত্যন্ত
প্রশংসনীয় বাবার কথা শুনে ফাতেমার হৃদয়ে এক অজানা ভয়ে কাজ করতে লাগলো সে তার
বাবাকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করত এবং জানতো তার বাবা তার জন্য যা কিছুই করবেন তাতেই
তার কল্যাণ থাকবে ফাতেমা নিচু স্বরে সম্মতি জানিয়ে বলল
আব্বু আপনার সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত আমি আল্লাহর উপর ভরসা রাখি বিয়ের দিনটি
ছিল অনারম্বর কিন্তু পবিত্রতায় পরিপূর্ণ ফাতেমা তার স্বামীর হাত ধরে এক নতুন
জীবনের পথে পা বাড়ালো তার স্বামী আহমদ ছিল সত্যিই এক অসাধারণ মানুষ তার চেহারায়
ছিল সততার ছাপ আর কথায় ছিল বিনয় ফাতেমা প্রথম দেখাতেই তার প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা
অনুভব করল। কিন্তু নতুন জীবন কখনোই ফুলের বিছানা হয় না। বিয়ের কিছুদিন পরেই
ফাতেমা বুঝতে পারল তার শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ তার বেড়ে ওঠার পরিবেশের মতো নয়।
তার শাশুড়ি ছিলেন একজন মেজাজী মহিলা। যার কাছে দুনিয়াবী জৌলুস ও মানুষের প্রশংসাই
ছিল সবকিছু। ফাতেমার সাদাসিধে জীবনযাপন ও কঠোর পর্দাপ্রথা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন
না। প্রায়ই তাকে কটু কথা শুনতে হতো। তার শাশুড়ি বলতো সারাদিন এমন মুখ ঢেকে থাকার
কি দরকার ঘরে তো কোন পরপুরুষ নেই কিন্তু ফাতেমা শান্তভাবে জবাব দিল আম্মা পর্দা
শুধু পুরুষের সামনে নয় এটা আমার পরিচয় আমার লজ্জা এবং আল্লাহর প্রতি আমার
আনুগত্যের চিহ্ন এই উত্তর তার শাশুড়িকে আরো ক্ষুব্ধ করে তুলল দিন দিন তার উপর
মানসিক চাপ বাড়তে লাগলো কিন্তু ফাতেমা কখনো তার স্বামীকে এই বিষয়ে কিছু বলতো না
সে চাইতো না তাদের সুন্দর সম্পর্কে কোন তিক্ততা আসুক প্রতি রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে
পড়তো ফাতেমা জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে তার কষ্টের কথা তার ধৈর্যের
পরীক্ষার কথা বলতো সে বিশ্বাস করত আল্লাহ তাকে দেখছেন এবং তিনি উত্তম পরিকল্পনাকারী
একদিন আহমদ ব্যবসার কাজে কয়েক মাসের জন্য দূরের এক সফরে গেল এই সুযোগে ফাতেমার উপর
তার শাশুড়ির অত্যাচার আরো বেড়ে গেল ছোট ছোট বিষয়ে তাকে দোষারোপ করা হতো তার
পর্দা নিয়ে উপহাস করা হতো। ফাতেমার জীবন যেন এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি এসে
দাঁড়ালো। চারদিকে কেবলই অন্ধকার। কিন্তু তার হৃদয়ের গভীরে ঈমানের যে প্রদীপটি
জ্বলছিল, সেটি তখনো নেভেনি। সে জানতো এই রাত যত গভীরই হোক না কেন। একসময় ভোরের
আলো ফুটবেই। সে কেবলই ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করতে লাগল সেই মাহেন্দ্রক্ষণের
জন্য। ফাতিমার জীবন এক নিঃসঙ্গ প্রহরীর মত কাটতে লাগলো। স্বামী আহমদ দূরে আর
শ্বশুরবাড়িতে সে যেন এক অনাহুত অতিথি। তার শাশুড়ির বাক্যবান প্রতিদিন আরো
ধারালো হতে লাগল। তিনি ফাতিমার প্রতিটি কাজে ক্ষুদ ধরতেন। তার নামাজ, তার ইবাদত
এমনকি তার নীরবতাও যেন তার শাশুড়ির চোখে ছিল এক অসহনীয় বাড়াবাড়ি। ফাতিমার
শাশুড়ি বলতো, এত ইবাদত করে কি হবে? ঘরের কাজে মন নেই। সারাক্ষণ শুধু বই নিয়ে বসে
থাকা আর জায়নামাজে পড়ে থাকা আমাদের বংশে এমন অলস বউ কেউ দেখেনি। ফাতিমার চোখ
পানিতে ভরে উঠলো। কিন্তু সে কোন উত্তর দিল না। সে তার বাবার শেখানো কথাগুলো মনে করল।
ধৈর্য হলো ঈমানের অর্ধেক। যখন কেউ তোমার সাথে কঠোর আচরণ করে তখন তুমি তার জন্য
আল্লাহর কাছে হেদায়েত প্রার্থনা করবে। তার ঘরটিই ছিল তার একমাত্র আশ্রয়। যেখানে
সে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারতো। শ্বশুরবাড়িতে ফাতিমার একমাত্র সঙ্গী ছিল
তার ননদ আয়েশা। আয়েশা ছিল চঞ্চল ও আধুনিক মনস্ক। প্রথমদিকে সেও ফাতিমার কঠোর
পর্দাকে বাড়াবাড়ি মনে করত। কিন্তু ধীরে ধীরে ফাতিমার শান্ত স্বভাব তার জ্ঞান এবং
তার অটল ঈমান আয়েশার মনে গভীর ছাপ ফেলতে শুরু করল। আয়েশা দেখতো শত অপমান ও
লাঞ্ছনার পরেও তার ভাবীর মুখে কোন অভিযোগ নেই। আছে কেবল এক স্বর্গীয় প্রশান্তি।
একদিন রাতে আয়েশা ফাতিমার ঘরে এসে দেখল সে জায়নামাজে বসে অঝরে কাঁদছে। আয়েশা তার
পাশে বসে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলো। ফাতিমা চোখ মুছে তার দিকে তাকিয়ে হাসল।
আয়েশা মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করল, ভাবী আম্মা তোমাকে এত কষ্ট দেয় তবু তুমি কিভাবে এত
শান্ত থাকো? আমার হলে তো আমি কবেই প্রতিবাদ করতাম। ফাতিমা তার হাত ধরে কোমল
স্বরে বলল, আয়েশা এই দুনিয়া তো একটি পরীক্ষা ক্ষেত্র। আল্লাহ আমাদের বিভিন্ন
পরিস্থিতিতে ফেলে পরীক্ষা করেন। তিনি দেখতে চান আমরা সুখে দুঃখে কতটা তার উপর
ভরসা রাখি। আমি যদি আজ ধৈর্য হারাই তাহলে তো আমি এই পরীক্ষায় হেরে যাব। আমি
বিশ্বাস করি আমার এই কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ আমার জন্য উত্তম কিছু রেখেছেন।
ফাতিমার কথাগুলো আয়েশার হৃদয়ে গিয়ে লাগলো। সে আগে কখনো এভাবে উপলব্ধি করেনি।
সেদিন থেকে আয়েশা তার ভাবীকে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে শুরু করল। সে ফাতিমার কাছ
থেকে দ্বীনের কথা জানতে চাইল। ফাতিমাও পরম মমতায় তাকে শেখাতে লাগলো। এভাবেই দুই
ভিন্ন মেরুর দুটি মানুষ ঈমানের আলোতে একে অপরের কাছাকাছি চলে এলো। এদিকে আহমদের
অনুপস্থিতিতে বাড়ির অর্থনৈতিক অবস্থাও খারাপ হতে শুরু করল। তার শাশুড়ি প্রায়ই
ফাতিমাকে অলক্ষণে বলে গালি দিতেন। তোমার পায়ে এই বাড়িতে অমঙ্গল প্রবেশ করেছে।
ছেলেটা আমার দূরে পড়ে আছে। আর এদিকে সংসারে অভাব লেগেই আছে। একদিন ঘটলো এক
অপ্রত্যাশিত ঘটনা। এলাকার এক অসৎ প্রভাবশালী ব্যক্তি ফাতিমার শ্বশুরকে একটি
লোভনীয় প্রস্তাব দিল। সে একটি ব্যবসায়িক কাজে তার সাহায্য চাইল। যার মধ্যে ছিল
কিছু অবৈধ লেনদেন। বিনিময়ে সে অনেক অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিল। ফাতিমার শ্বশুর
অর্থের লোভে প্রায় রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। বিষয়টি জানতে পেরে ফাতিমার বুক কেঁপে
উঠল। সে জানতো হারাম উপার্জন একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু ফাতিমা
তার শ্বশুরকে সরাসরি কিছু বলার সাহস পেল না। সেদিন রাতে সে তাহাজ্জুদের নামাজে
দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে আকুল হয়ে দোয়া করল। হে আল্লাহ আপনি আমার শ্বশুরকে সঠিক
পথ দেখান। তাকে হারাম থেকে রক্ষা করুন। আমাদের পরিবারকে আপনার রহমতের ছায়ায়
আশ্রয় দিন। পরদিন সকালে সে তার ননদ আয়েশার মাধ্যমে তার শ্বশুরের কাছে একটি
বার্তা পাঠালো। সে কোন উপদেশ দেয়নি। শুধু একটি হাদিস শুনিয়েছিল। যে দেহ হারাম
খাদ্য দ্বারা গঠিত| তার জন্য জান্নাত হারাম| কথাটি শোনার পর ফাতিমার শ্বশুরের
হৃদয়ে এক তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হলো| তিনি সারাদিন বিষয়টি নিয়ে ভাবলেন। নিজের
সামান্য লোভের জন্য তিনি তার পরকালকে ধ্বংস করতে পারেন না। সন্ধ্যায় তিনি সেই
প্রভাবশালী ব্যক্তিকে অর্থ ফিরিয়ে দিলেন এবং তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। এই
ঘটনার পর থেকে তার শ্বশুরের মনেও ফাতিমার জন্য এক ধরনের শ্রদ্ধা জন্মলো। তিনি বুঝতে
পারলেন তার এই পর্দানিশীন পুত্রবধু কেবল ধার্মিকই নয় সে তাদের পরিবারের জন্য একজন
সত্যিকারের রক্ষাকবচ। কিন্তু তার শাশুড়ির মন গলতে এখনো অনেক বাকি। তিনি এই প্রভাবকে
সহজভাবে মেনে নিতে পারলেন না। তার মনের ভেতর জ্বলতে থাকা বিদ্বেষের আগুন যেন আরো
তীব্র হয়ে উঠল। যা একটি নতুন ঝড়ের পূর্বাভাস দিচ্ছিল। শ্বশুরের চোখে সম্মান
পেলেও শাশুড়ির চোখে ফাতিমা আগের মতোই অপ্রিয় রয়ে গেল। বরং তার প্রতি শ্বশুরের
দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন শাশুড়ির মনে নতুন করে ঈর্শার জন্ম দিল। তিনি ভাবতে লাগলেন
এই মেয়ে জাদু করে তার স্বামী ও মেয়েকে বশ করে ফেলেছে। কয়েক সপ্তাহ পর আহমদ তার
সফর শেষ করে বাড়ি ফিরে এলো। দীর্ঘ সময় পর স্বামীকে কাছে পেয়ে ফাতিমার দুঃখী মন
আনন্দে ভরে উঠল। আহমদও তার স্ত্রীকে কাছে পেয়ে সব ক্লান্তি ভুলে গেল। কিন্তু এই
সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। আহমদের মা তার ছেলের কান ভাঙ্গাতে শুরু করলেন। বাবা তুই
তো সারাদিন বাইরে থাকিস। ঘরের খবর কি রাখিস? তোর বউ তো এখনই বাড়ির কর্তৃ হয়ে
উঠেছে। তোর বাবা আর বোনকে এমন জাদু করেছে যে তারা তার কথাই শোনে। সারাদিন শুধু বই
নিয়ে পড়ে থাকে। সংসারের কোন কাজে মন নেই। আর আমি কিছু বললেই মুখে মুখে তর্ক
করে। আহমদ তার মাকে খুব ভালোবাসতো। মায়ের মুখে স্ত্রীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ শুনে
তার মন বিশিয়ে উঠলো। সে ফাতিমাকে সরাসরি কিছু না বললেও তার আচরণে এক ধরনের শীতলতা
ও দূরত্ব চলে এলো। ফাতিমা বিষয়টি বুঝতে পারল। যে স্বামীর ভালোবাসাই ছিল তার
একমাত্র সম্বল। সেখানেও সন্দেহের কালো মেঘ জমতে শুরু করেছে। ফাতিমার জন্য এটি ছিল
সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। সে শত চেষ্টা করেও আহমদের মন থেকে তার মায়ের রোপণ করা ভুল
ধারণা দূর করতে পারছিল না। আহমদ এখন প্রায়ই ছোট ছোট বিষয়ে তার সাথে রুঢ়
আচরণ করত। ফাতিমার পর্দা নিয়েও সে প্রশ্ন তুলতে শুরু করল। যা ফাতিমার হৃদয়কে ভেঙে
চুরমার করে দিচ্ছিল। একদিন আহমদ বিরক্ত হয়ে বলল, সারাক্ষণ এমন মুখ ঢেকে থাকার কি
দরকার? আমার মা যা বলেন তাতে তো কোন ভুল নেই। একটু স্বাভাবিকভাবে চলার চেষ্টা করো।
ফাতিমার চোখ দিয়ে অস্ত্র গড়িয়ে পড়ল। সে কান্না ভেজা কন্ঠে বলল, আপনিও? আপনিও
আমাকে ভুল বুঝছেন। এই পর্দা তো আমার ঈমানের অংশ। আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য
এটা করি। আপনি কিভাবে আমাকে এটা ছাড়তে বলতে পারেন? তাদের এই কথোপকথন আড়াল থেকে
শুনছিল ননদ আয়েশা। তার মন দুঃখে ভরে গেল। সে বুঝতে পারছিল যে তার মা কিভাবে ভাইয়ের
জীবনটাকেও বিশিয়ে তুলছে। এর কিছুদিন পর ঘটলো সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা। যা ফাতিমার জীবনকে
একেবারে খাঁদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করালো। একদিন তার শাশুড়ি তার একটি দামি সোনার
হার খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তিনি কোন কিছু চিন্তা না করেই সরাসরি ফাতিমাকে চোর বলে
অপবাদ দিলেন। ওই হার তুই ছাড়া আর কেউ নেয়নি। আমি জানি তুই তোর বাপের বাড়ির
জন্য টাকা জমাতে আমার জিনিসপত্র সরাচ্ছিস। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। এই বলে তিনি
চিৎকার করে সারা বাড়ি মাথায় তুললেন। আহমদ বাইরে থেকে এসে এই দৃশ্য দেখল।
মায়ের কান্না আর অভিযোগ শুনে তার বুদ্ধি লোভ পেল। সে ফাতিমার কোন কথা শোনার আগেই
তার ওপর প্রচন্ড রেগে গেল। আমার মায়ের জিনিস তুমি চুরি করেছ? আমি তোমাকে বিশ্বাস
করেছিলাম আর তুমি এই প্রতিদান দিলে। ফাতিমা কাঁদতে কাঁদতে বলল, আল্লাহর কসম
আমি কিছুই জানিনা। আমি আপনার মায়ের হার দেখিনি। কিন্তু কেউ তার কথা বিশ্বাস করল
না। তার শাশুনি তাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার জন্য জেদ ধরলেন। প্রচন্ড মানসিক
চাপে এবং অপমানে ফাতিমা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। যখন তার জ্ঞান ফিরল সে
নিজেকে তার ঘরে বিছানায় আবিষ্কার করল। পাশে বসা ছিল আয়েশা। তার চোখে জল। আয়েশা
তাকে জানালো যে ডাক্তার এসে বলে গেছেন আপনি সন্তান সম্ভবা। এই খবরটি শোনার পর
ফাতিমার মনে হলো এই ঘোর অন্ধকারের মাঝেও আল্লাহ তাকে এক আশার আলো দেখিয়েছেন। তার
গর্ভে বেড়ে উঠছে তার আর আহমদের ভালোবাসার চিহ্ন। সে ভাবল, হয়তো এই সন্তানের আগমনেই
সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তার শাশুড়ির মন তাতেও গল না। তিনি বলতে লাগলেন, এটাও
নিশ্চয়ই কোন নতুন চাল। চুরির অপবাদ থেকে বাঁচতে এখন নাটক করছে। অপমান আর কষ্টের
বোঝা মাথায় নিয়ে ফাতিমা তার গর্ভের সন্তানকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার শক্তি
খুঁজতে লাগলো। সে জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানালো। হে আমার রব, আপনি তো
সবই দেখছেন। আপনিই আমার একমাত্র ভরসা। আমাকে এই কঠিন পরীক্ষা থেকে উদ্ধার করুন।
আমার নির্দোষিতা প্রমাণ করার মালিক তো কেবল আপনিই। সেদিন রাতে যখন পুরো বাড়ি
শান্ত, আয়েশা তার মায়ের ঘরের পুরনো সিন্দুক পরিষ্কার করতে গিয়ে কাপড়ের ভাজে
সেই সোনার হাতটি খুঁজে পেল। তার মা ভুলে সেখানেই রেখে দিয়েছিলেন। সত্য উন্মোচিত
হলো। কিন্তু যে ক্ষত ফাতিমার হৃদয়ে তৈরি হয়েছিল তা কি এত সহজে শুকানোর ছিল?
আয়েশার হাতে সেই সোনার হাতটি দেখে পুরো পরিবার স্তব্ধ হয়ে গেল। ফাতিমার শাশুড়ির
মুখ লজ্জায় ও ভয়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি নিজের ভুলের গভীরতা উপলব্ধি করতে
পারলেন। যে পুত্রবধুকে তিনি চোর বলে অপবাদ দিয়েছেন, যার উপর এত অত্যাচার করেছেন, সে
ছিল সম্পূর্ণ নির্দোষ। আমদও নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনায় দগ্ধ হতে
লাগলো। সে বুঝতে পারল মায়ের কথায় প্রভাবিত হয়ে সে তার বিশ্বাসী স্ত্রীর
উপর কি ভীষণ অন্যায় করেছে। আমদ ছুটে গেল ফাতিমার ঘরে। ফাতিমা তখন বিছানায় শুয়ে
নীরবে চোখের জল ফেলছিল। তার চেহারায় ছিল গভীর কষ্ট আর অপমানের ছাপ। আহোদ তার সামনে
দাঁড়িয়ে অপরাধীর মত মাথা নিচু করে বলল, ফাতিমা আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি অন্ধ
হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তোমার বিশ্বাস রাখতে পারিনি। আমি তোমার স্বামী হিসেবে ব্যর্থ।
ফাতিমা কোন উত্তর দিল না। তার নীরবতা আমদের বুকের ভেতর তীরের মত বিধচ্ছিল। সে
ফাতিমার হাত ভরে কাঁদতে কাঁদতে বলল। আমি জানি আমি ক্ষমার যোগ্য নই। কিন্তু আমাদের
সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে অন্তত আমাকে একটি সুযোগ দাও। আমি ওয়াদা করছি আর কখনো
তোমার সাথে এমন অন্যায় হবে না। ফাতিমা তার স্বামীর চোখের জল দেখে আর স্থির থাকতে
পারল না। সে মৃদুস্বরে বলল আমি আপনার উপর কোন রাগ বা অভিমান রাখিনি। আমি তো আগেই
আল্লাহকে বলেছিলাম তিনি যেন আমার নির্দোষিতা প্রমাণ করেন। তিনি আমার দোয়া
কবুল করেছেন। ফাতিমার এই উদারতা আহমদকে আরো লজ্জিত করল। সে মনে মনে আল্লাহর কাছে
শুকরিয়া আদায় করল এমন একজন জীবনসঙ্গিনী পাওয়ার জন্য। কিছুক্ষণ পর ফাতিমার
শাশুড়িও সেই ঘরে প্রবেশ করলেন। তার চোখ মুখে ছিল তীব্র অনুশোচনা। তিনি ফাতিমার
সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, মা আমি তোমার উপর অনেক বড় জুলুম করেছি। আমার
পাপের কোন ক্ষমা নেই। তুমি যদি পারো আমাকে ক্ষমা করে দিও। ফাতিমা তার শাশুড়ির হাত
ধরে বলল, আম্মা আপনি আমার মায়ের মতো। সন্তানের উপর মায়ের অধিকার থাকে। আপনি যা
করেছেন আমি তা ভুলে গেছি। আপনি আমার জন্য শুধু দোয়া করবেন যেন আমি একজন ভালো মা
হতে পারি। এই ঘটনায় পুরো পরিবারের চিত্রটাই পাল্টে গেল। ফাতিমার শাশুড়ি তার
প্রতি আগের সব বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে তাকে নিজের মেয়ের মত ভালোবাসতে শুরু করলেন।
তিনি এখন ফাতিমার পর্দা বা ইবাদত নিয়ে কোন কথা বলেন না। বরং তার ধার্মিকতার জন্য
তাকে সম্মান করেন। আয়েশা তার ভাবীর আরো নিকটবর্তী হয়ে উঠলো এবং তার কাছ থেকে
দ্বীনের জ্ঞান অর্জনে আরো মনোযোগী হল। বাড়িতে এক নতুন শান্তির পরিবেশ তৈরি হলো।
আহমদ এখন তার স্ত্রীর প্রতি অনেক বেশি যত্নশীল। সে ফাতিমার প্রতিটি প্রয়োজন ও
অনুভূতির খেয়াল রাখে। তাদের দুজনের সম্পর্ক আগের চেয়েও অনেক বেশি মধুর ও
মজবুত হল। ফাতিমা তার গর্ভের সন্তানকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। সে
প্রায়ই জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করত। কারণ তিনি ঝড়ের পর
আকাশকে যেমন নির্মল করে দেন তেমনি তার জীবনকেও সব সংকট থেকে মুক্ত করে দিয়েছেন।
দিনগুলো আনন্দের সাথে কাটতে লাগলো। ফাতিমার গর্ভের সন্তান ধীরে ধীরে বড় হতে
লাগলো। পুরো পরিবার অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো নতুন অতিথির জন্য। ফাতিমার
শাশুড়ি নিজ হাতে তার জন্য পুষ্টিকর খাবার তৈরি করতেন, আর তার স্বাস্থ্যের খেয়াল
রাখতেন। কিন্তু ভাগ্য হয়তো ফাতিমার জন্য আরো বড় কোন পরীক্ষা সাজিয়ে রেখেছিল।
একদিন যখন ফাতিমার প্রসবের সভায় প্রায় ঘনিয়ে এসেছে। তখন আহমদ ব্যবসার কাজে আবার
দূরের এক সফরে যেতে বাধ্য হলো। যাওয়ার আগে সে তার মা ও বোনকে বারবার অনুরোধ করে
গেল। তারা যেন ফাতিমার কোন অযত্ন না করে। আহমদ চলে যাওয়ার কয়েকদিন পর এক গভীর
রাতে ফাতিমার প্রসব বেদনা শুরু হলো। বাইরে তখন মুসলধারে বৃষ্টি আর প্রচন্ড ঝড়।
বিদ্যুৎ চমকানোর শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠছিল। সেই দুর্যোগপূর্ণ রাতে যখন যোগাযোগ
ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন ফাতিমা এক কঠিন সংকটের মুখোমুখি হলো। তার শারীরিক অবস্থা
দ্রুত খারাপ হতে লাগলো। স্থানীয় দায়ী তাকে দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ল এবং বলল,
তাকে দ্রুত কোন ভালো চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। যা সেই ঝড়ের রাতে ছিল প্রায়
অসম্ভব। সপরিবারের সবাই যখন দিশেহারা তখন ফাতিমা তার সমস্ত বিশ্বাস ও শক্তি একত্রিত
করে আল্লাহর উপর ভরসা করল। সে জানতো জীবন ও মৃত্যুর মালিক একমাত্র আল্লাহ। এই
ভয়ঙ্কর রাতে যখন সাহায্যের সব দরজা বন্ধ তখন কেবল তিনিই পারেন তাকে এবং তার
সন্তানকে রক্ষা করতে। সেই ঝড়ের রাতটি যেন ফাতিমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ ও ভয়ঙ্কর
রাত হয়ে দেখা দিল। প্রসব বেদনা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠল। আর তার শরীর ক্রমশ
নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল। স্থানীয় দায়ী অসহায়ভাবে জানিয়ে দিল তার পক্ষে আর কিছু
করা সম্ভব নয়। ফাতিমার শাশুড়ি ও ননদ আয়েশা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তাদের চোখের
সামনে তাদের প্রিয় মানুষটি মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ তারা কিছুই করতে পারছে
না। ফাতিমার শ্বশুর সেই দুর্যোগের মধ্যেই একজন ভালো চিকিৎসকের খোঁজে বেরিয়ে
পড়লেন। কিন্তু পথঘাট বৃষ্টির পানিতে ডুবে যাওয়ায় তার চেষ্টাও ব্যর্থ হলো। চারদিকে
কেবলই হতাশা আর অন্ধকার। এমন কঠিন মুহূর্তেও ফাতিমার মুখ ছিল আশ্চর্যজনকভাবে
শান্ত। তার ঠোঁটে ছিল আল্লাহর জিকির। সে তার শাশুড়িকে কাছে ডেকে বলল, আম্মা
কাঁদবেন না। আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমার স্বামীকে বলবেন আমি তার উপর
সন্তুষ্ট ছিলাম। আর আমার সন্তানকে দ্বীনের শিক্ষায় বড় করবেন। তাকে বলবেন তার মা
তাকে অনেক ভালোবাসতো। এই কথাগুলো শুনে তার শাশুড়ির বুক ফেটে গেল। তিনি চিৎকার করে
আল্লাহর কাছে দোয়া করতে লাগলেন। হে আল্লাহ তুমি আমার এই মাসুম মেয়েটাকে
রক্ষা করো। তার জীবনের বিনিময়ে আমার জীবন নিয়ে নাও। তবু তাকে বাঁচিয়ে দাও। ফাতিমা
তখন তার শেষ শক্তি দিয়ে কালেমা পাঠ করতে লাগলো। তার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে
আসছিল। সে অনুভব করছিল তার আত্মা যেন দেহ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে যখন
সবাই সব আশা ছেড়ে দিয়েছে তখন ঘটলো এক অলৌকিক ঘটনা। ঝড় কিছুটা কমে আসার সাথে
সাথে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো। আয়েশা দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখলো এক নূরানী
চেহারার বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি শান্তভাবে বললেন, আমি শুনেছি এই বাড়িতে
একজন প্রসুতি মা কষ্টে আছেন। আমি একজন দায়ী। আল্লাহ আমাকে পাঠিয়েছেন তার সাহায্য
করার জন্য। পরিবারের সবাই অবাক হয়ে গেল। এই ঝড়ের রাতে এই অচেনা জায়গা থেকে কিভাবে
এই বৃদ্ধা এলেন তা কেউ বুঝতে পারলো না। কিন্তু তখন এত কিছু ভাবার সময় ছিল না।
তারা দ্রুত তাকে ফাতিমার ঘরে নিয়ে গেল। বৃদ্ধা ঘরে প্রবেশ করে ফাতিমার পাশে
বসলেন। ফাতিমার যন্ত্রণা কাতর মুখে ধীরে ধীরে প্রশান্তি ফিরে এলো। কিছুক্ষণ পর সেই
বৃদ্ধার সাহায্যেই ফাতিমা এক ফুটফুটে পুত্র সন্তানের জন্ম দিল। শিশুর কান্নার
শব্দে পুরো বাড়িতে যেন আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। ফাতিমা চোখ খুলে তার সন্তানকে
দেখল এবং পরম মমতায় তাকে বুকে জড়িয়ে নিল। তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল
কৃতজ্ঞতার অশ্রু। পরিবারের সবাই যখন শিশুটিকে নিয়ে আনন্দে আত্মহারা তখন তারা
সেই বৃদ্ধাকে ধন্যবাদ জানানোর জন্য তার খোঁজ করল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো
ঘরের কোথাও তাকে পাওয়া গেল না। তিনি যেভাবে রহস্যময় ভাবে এসেছিলেন সেভাবেই
নীরবে চলে গেছেন। ফাতিমার শ্বশুর বললেন, "ইনি কোন সাধারণ মানুষ নন। ইনি নিশ্চয়ই
আল্লাহর পাঠানো কোন ফেরেশতা বা রহমতের দূত। আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করেছেন এবং
তার রহমত দিয়ে আমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করেছেন। এই ঘটনার পর ফাতিমার প্রতি তার
শ্বশুরবাড়ির সবার ভক্তি ও ভালোবাসা বহু গুণে বেড়ে গেল। তারা বুঝতে পারল ফাতিমা
শুধু একজন সাধারণ নারী নয় সে আল্লাহর এক বিশেষ বান্দী যার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত
হয়। কয়েকদিন পর আহমদ বাড়ি ফিরে এল। সফরের সময় পথের দুরবস্থার কারণে সে
বাড়ির কোন খবর পায়নি। বাড়িতে পা দিয়েই নবজাতকের কান্না শুনে সে অবাক হয়ে গেল।
যখন সে পুরো ঘটনা শুনল সে আল্লাহর কাছে সিজদায় পড়ে গেল এবং তার স্ত্রী ও
সন্তানের জীবন বাঁচানোর জন্য অশেষ শুকরিয়া আদায় করল। সে তার সন্তানের নাম
রাখলো আব্দুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর বান্দা। ফাতিমার জীবন আরো এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ
করল। তার কোল জুড়ে এসেছে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ উপহার। তার সংসার এখন শান্তিতে পরিপূর্ণ।
তার শাশুড়ি এখন তাকে ছাড়া কিছুই বোঝেন না। ননদ আয়েশা তার ভাবীর কাছ থেকে
দ্বীনের আলোয় আলোকিত হয়ে নিজের জীবনকেও বদলে ফেলেছে। ফাতিমার স্বামী আহমদ তাকে
ভালোবাসে তার ঈমান ও ধৈর্যের জন্য। ফাতিমা তার ছোট্ট আব্দুল্লাহকে বুকে নিয়ে ভাবতো,
আল্লাহ তাকে কত কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। কিন্তু প্রতিটি পরীক্ষার পরই তিনি তাকে
দিয়েছেন উত্তম পুরস্কার। তার জীবন কাহিনী যেন এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে রইল। যারা
আল্লাহর উপর অটল বিশ্বাস রাখে এবং ধৈর্যের সাথে সব বিপদ মোকাবেলা করে আল্লাহ তাদের
কক্ষনো নিরাশ করেন না। আসসালামু আলাইকুম। আমাদের ইসলামিক ভয়েস বাংলা চ্যানেলের
ভিডিওগুলো যদি আপনার ভালো লাগে তবে অবশ্যই ভিডিওটিকে লাইক কমেন্ট এবং শেয়ার করবেন।
আর নতুন নতুন ইসলামিক গল্প, দাওয়া, নবীদের জীবনী ও শিক্ষামূলক ভিডিও পেতে
আমাদের চ্যানেলটিকে সাবস্ক্রাইব করতে ভুলবেন না। আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত
দান করুন এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা দান করুন। আমিন
Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.
Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact