আল্লাহ সর্বপ্রথম কি সৃষ্টি করেছিলেন? আর কোথায় বা তিনি তার আরশকে স্থাপন করেছিলেন? আসুন আজ আমরা পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে সৃষ্টির সেই প্রথম অধ্যায়ে ফিরে যাই। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ সর্বপ্রথম যা সৃষ্টি করেছেন তা হলো কলম। এই কলম কোন সাধারণ কলম নয়। এর দৈর্ঘ্য আসমান ও জমিনের মধ্যবর্তী দূরত্বের সমান। কলমকে সৃষ্টি করার পর আল্লাহ তাকে আদেশ করলেন লেখো। কলম আল্লাহর আরশের সামনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করল হে আমার রব আমি কি লিখব? আল্লাহ বললেন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই। এই কালিমাটি লেখো। তখন কলম আল্লাহর একত্ববাদের এই মহান বাণীটি লিখতে শুরু করল। বর্ণনায় এসেছে কলম 1000 বছর ধরে শুধু এই কালিমাটিই লিখতে থাকলো। 1000 বছর পর আল্লাহ আবার কলমকে বললেন লেখো। কলম আবার জিজ্ঞেস করলো হে আমার রব আমি আর কি লিখব? আল্লাহ বললেন লেখো মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। এই নামটি লেখো। কলম যখন এই নামটি লিখলো, তখন সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "হে আমার রব, এই মুহাম্মাদ কে? যার নাম আপনি আপনার নামের সাথে যুক্ত করেছেন?" আল্লাহ উত্তর দিলেন, "হে কলম, আদব রক্ষা করো।" ইনি হলেন আমার হাবিব| যদি আমি তাকে সৃষ্টি না করতাম| তবে আমি তোমাকে সৃষ্টি করতাম না| আমি আসমান জমিন আরশ কুরসি কিছুই সৃষ্টি করতাম না| এই কথোপকথনের পর আল্লাহ কলমকে আবার নির্দেশ দিলেন লেখো কলম জিজ্ঞেস করল হে আল্লাহ আমি এখন কি লিখবো আল্লাহ বললেন লেখো কেয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে সবকিছু লিখে রাখো সেই মুহূর্তে আল্লাহর হুকুমে কলম লাওহে মাহফ মাহফুজ নামক এক সংরক্ষিত ফলকে মহাবিশ্বের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি অনুপরমাণুর ভাগ্য প্রতিটি সৃষ্টির নিয়তি কে কখন জন্মাবে কে কখন মারা যাবে কার রিজিক কতটুকু হবে কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে সবকিছু লিখে ফেলল এই লাওহে মাহফুজ হলো আল্লাহর জ্ঞানের এক ভান্ডার যা কারো পক্ষে পরিবর্তন করা সম্ভব নয় এই প্রাথমিক সৃষ্টিগুলোর পর এবং আসমান জমিন সৃষ্টির আগেই আল্লাহ আল্লাহ তার ইবাদত এবং এই বিশাল মহাবিশ্ব পরিচালনার জন্য এক বিশেষ আলোর তরি সৃষ্টিকে তৈরি করলেন। ফেরেশতাদের। নবীজি বলেছেন, ফেরেশতাদেরকে নূর বা আলো থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের কোন কামনাবাসনা নেই। তাদের কোন শক্ান্তি নেই। তাদের একমাত্র কাজ হল অবিরাম আল্লাহর প্রশংসা করা এবং তার দেয়া আদেশ পালন করা। তাদের সংখ্যা কত তা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কেউই জানে না। তাদের মধ্যে আল্লাহ বিভিন্ন দায়িত্ব বন্টন করে দিলেন। আল্লাহ সর্বপ্রথম আটজন বিশেষ এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ফেরেশতা সৃষ্টি করেন যারা তার মহান আরশকে বহন করার দায়িত্বে নিযুক্ত। তাদের এক কানের লতি থেকে কাঁধ পর্যন্ত দূরত্ব হল 700 বছরের পথে। এরপর আল্লাহ সৃষ্টি করেন তার প্রধান চার ফেরেশতাকে যারা মহাবিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলো পালন করেন। জিব্রাইল আলাইহিস সালাম সকল ফেরেশতাদের নেতা যার দায়িত্ব হলো নবীদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেয়া। মিকাইল আলাইহিস সালাম যার দায়িত্বে রয়েছে বৃষ্টি বর্ষণ এবং সকল সৃষ্টির জন্য রিজিক নিশ্চিত করা। ইসরাফিল আলাইহিস সালাম যিনি কেয়ামতের দিন শিঙ্গায় ফুঁ দেয়ার জন্য আল্লাহর আদেশের অপেক্ষায় আছেন এবং আজরাইল আলাইহিস সালাম অর্থাৎ মৃত্যুর ফেরেশতা যার দায়িত্বে রয়েছে সকল প্রাণীর রুহ কবজ করা এবং আরো অগণিত ফেরেশতা যারা আসমান জমিন পাহাড় পর্বত এবং মানুষের প্রতিটি কাজ পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত ফেরেশতাদের সৃষ্টি এবং তাদের মধ্যে দায়িত্ব বন্টন করার পর আল্লাহ এই বিশাল মহাবিশ্বের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তিনি ছয় দিনে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেন রবিবার এবং সোমবার এই দুই দিনে আল্লাহ পৃথিবী সৃষ্টি করেন তখন পৃথিবী ছিল আজকের মতো স্থির নয় এটি পানির উপর থরথর করে কাঁপছিল এবং টলমল করছিল পৃথিবীর এই অবস্থা দেখে ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে আরজ করলেন হে আল্লাহ এই টলমল করা পৃথিবীর উপর আপনার বান্দারা কিভাবে বসবাস করবে তখন আল্লাহ পৃথিবীকে স্থির করার জন্য মঙ্গলবার দিন পৃথিবীতে বিশাল বিশাল পাহাড় পর্বত স্থাপন করলেন। এই পাহাড়গুলো পেরেকের মত কাজ করে পৃথিবীকে মাটির গভীরে গেঁথে ফেলে এবং এর কাপড়ই বন্ধ করে। পাহাড় সৃষ্টির পর বুধবার দিন আল্লাহ পৃথিবীতে গাছপালা, নদীনালা এবং সকল প্রকার উদ্ভিদ ও প্রাণীর জন্য রিজিকের ব্যবস্থা করেন। এরপর বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার এই শেষ দুই দিনে আল্লাহ আসমানের দিকে মনোনিবেশ করেন যা ছিল ধোয়ার মত। তিনি সেই ধোঁয়া থেকে দুই দিনের সাতটি আসমান তৈরি করেন এবং পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের আকাশকে চন্দ্র সূর্য এবং কোটি কোটি নক্ষত্র দিয়ে সাজিয়ে দেন। এভাবেই তৈরি হলো আমাদের এই বিশাল মহাবিশ্ব। এক নিখুত এবং সুশৃঙ্খর জগৎ যা পরিচালনার জন্য রয়েছেন অগণিত ফেরেশতা। আসমান ও জমিন সৃষ্টির পর এবং মানুষ সৃষ্টির বহু আগে আল্লাহ পৃথিবীতে বসবাসের জন্য এক নতুন এবং বিশ্বয়কর সৃষ্টিকে তৈরি করলেন। তারা হল জিন, জিনরা ছিল এক অদৃশ্য জাতি। তারা মানুষের মতো পানাহার করত। তাদের মধ্যে বিয়ে-শাদী হতো, সন্তান-সন্ততি জন্ম নিত এবং তাদেরও মৃত্যু হতো। আল্লাহ জীনদেরকেও ভালোমন্দ বোঝার এবং যেকোন একটি পথ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। তাদেরকে পৃথিবীতে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। হাজার হাজার বছর ধরে জিনরা পৃথিবীতে বসবাস করতে লাগলো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে তারা তাদের মূল উদ্দেশ্য ভুলে গেল। তারা আল্লাহর হুকুম অমান্য করতে শুরু করল এবং একে অপরের উপর জুলুম অত্যাচার করতে লাগল। তাদের মধ্যে হিংসা, অহংকার এবং ক্ষমতার লোভ এতটাই বেড়ে গেল যে তারা একে অপরের সাথে ভয়ঙ্কর যুদ্ধে এবং রক্তারক্তিতে লিপ্ত হলো। তাদের পাপে পৃথিবী এক ভয়ঙ্কর অশান্তির জায়গায় পরিণত হল। তাদের এই সীমালঙ্ঘন দেখে আল্লাহ অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হলেন। তিনি আসমান থেকে ফেরেশতাদের এক বিশাল বাহিনী পাঠালেন সেই দুষ্ট জ্বীনদেরকে দমন করার জন্য। ফেরেশতারা পৃথিবীতে নেমে এসে সেই পাপাচারী জীনদের সাথে যুদ্ধ করলেন। তারা বেশিরভাগ জীনকে হত্যা করলেন এবং বাকিদের তাড়িয়ে সমুদ্রের গভীরে এবং দূর-দূরান্তে দ্বীপগুলোতে পাঠিয়ে দিলেন। সেই যুদ্ধের সময় ফেরেশতারা দেখলেন জীনদের মধ্যে এক ছোট্ট শিশু রয়েছে যা অন্যদের চেয়ে ভিন্ন ছিল। তার নাম ছিল আজাজিন। সে ছিল অত্যন্ত সুন্দর এবং তার মধ্যে জ্ঞানের এক বিশেষ প্রতিভা ছিল। ফেরেশতারা তাকে দয়া করে হত্যা না করে আল্লাহর হুকুমে তাকে সাথে করে আসমানে নিয়ে গেলেন। আসমানে ফেরেশতাদের সাথে থেকে আজাজিল আল্লাহর ইবাদতে নিজেকে এমনভাবে ডুবিয়ে দিল যে তার জ্ঞান এবং মর্যাদা দিনে দিনে বাড়তেই থাকলো। সে হাজার হাজার বছর ধরে এত ইবাদত করল যে তার ইবাদতের খ্যাতির সকল ফেরেশতাদের ছাড়িয়ে গেল। আল্লাহ তার ইবাদতে খুশি হয়ে তাকে সম্মানিত করলেন। তাকে প্রথম আসমানের নেতা বানিয়ে দেয়া হলো। এরপর দ্বিতীয়, তৃতীয়, এভাবে সে সকল আসমানের ফেরেশতাদের নেতা এবং শিক্ষকের মর্যাদা লাভ করল। তার নতুন নাম হল ইবলিশ। সে এতটাই সম্মানিত ছিল যে আল্লাহর আরশের চারপাশে যে মহান ফেরেশতারা থাকেন তাদের সাথেও তার ওঠাবসা ছিল। কিন্তু তার অন্তরের গভীরে তার সেই আগুনের তৈরি অহংকার তখনো লুকিয়ে ছিল। পৃথিবীকে জীনদের বিপর্যয় থেকে মুক্ত করার পর আল্লাহ ফেরেশতাদের একত্রিত করলেন এবং তার সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি দিলেন। তিনি বললেন, আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা বানাতে চলেছি। এই ঘোষণা শোনার সাথে সাথেই ফেরেশতাদের মনে জীনদের সেই ভয়ঙ্কর রক্তারক্তি স্মৃতি ভেসে উঠলো। তারা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করলেন, হে আমাদের রব, আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে বানাবেন? যে সেখানে কি আবার অশান্তি সৃষ্টি করবে? আর একে অপরের সাথে রক্তপাত করবে? অথচ আমরা তো সবসময় আপনার প্রশংসা এবং পবিত্রতা বর্ণনা করছি। আল্লাহ উত্তর দিলেন নিশ্চয় আমি যা জানি তোমরা তা জানো না। এই একটি বাক্যই। আল্লাহ বুঝিয়ে দিলেন যে তিনি এমন এক জাতিকে সৃষ্টি করতে চলেছেন যার মর্যাদা এবং উদ্দেশ্য হবে ফেরেশতাদের ধারণারও বাইরে। তারপর শুরু হলো মানবজাতির প্রথম সদস্যকে তৈরি করার সেই ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। আল্লাহ প্রথমে হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালামকে পৃথিবীতে পাঠালেন মাটি সংগ্রহ করার জন্য। হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম যখন পৃথিবীতে এসে মাটি তুলতে গেলেন তখন জমিন আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে বলল, হে জিব্রাইল, আমি আল্লাহর নামে তোমার কাছে আশ্রয় চাই। তুমি আমার শরীর থেকে মাটি নিও না যা দিয়ে এমন এক জাতি তৈরি হবে যা হয়তো পৃথিবীতে গিয়ে আল্লাহর অবাধ্য হবে এবং জাহান্নামের আগুনে জ্বলবে। জমিনের এই হাকতি শুনে হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালামের মনে মায়া হলো এবং তিনিও খালি হাতে আল্লাহর কাছে ফিরে গেলেন। এরপর আল্লাহ হযরত মিকাইল আলাইহিস সালামকে পাঠালেন। তিনিও যখন পৃথিবীতে এসে মাটি তুলতে গেলেন তখন জমিন তার কাছেও একই রকম ফরিয়াদ করল। তার মনেও দয়া হলো এবং তিনিও খালি হাতে ফিরে গেলেন। অবশেষে আল্লাহ পাঠালেন মৃত্যুর ফেরেশতা হযরত আজরাইল আলাইহিস সালামকে যার অন্তর ছিল আল্লাহর আদেশের প্রতি অত্যন্ত কঠোর তিনি যখন পৃথিবীতে এসে মাটি তুলতে গেলেন তখন জমিন তার কাছে আল্লাহর নামে ফরিয়াদ করল কিন্তু আজরাইল আলাইহিস সালাম উত্তর দিলেন আমিও আল্লাহর নামে আশ্রয় চাই তার হুকুম অমান্য করে খালি হাতে ফিরে যাওয়া থেকে আমি আল্লাহর আদেশ পালন করতে এসেছি এই বলে তিনি জমিনের কোন আকুতি না শুনে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন বিভিন্ন ধরনের মাটি সংগ্রহ করলেন। কোথাও থেকে কালো মাটি, কোথাও থেকে সাদা, কোথাও থেকে লাল, কোথাও থেকে নরম মাটি, আবার কোথাও থেকে শক্ত মাটি। এই বিভিন্ন রঙের মাটির কারণেই পৃথিবীতে মানুষের গায়ের রং এবং স্বভাব চরিত্র ভিন্ন ভিন্ন হয়। এরপর সেই মাটিগুলোকে জান্নাতের পানিতে মেশানো হলো। দীর্ঘ সময় ধরে সেই মাটির মিশ্রণটিকে একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় রাখা হলো। যতক্ষণ না তা শুকিয়ে কাঁদার মত হল। এরপর শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। স্বয়ং আল্লাহ তার দুই পবিত্র হাত দিয়ে সেই মাটি দিয়ে হযরত আদম আলাইহিস সালামের এক সুন্দর মানবাকৃতির মূর্তি তৈরি করলেন। দীর্ঘ 40 বছর ধরে সেই নিষ্প্রাণ মাটির মূর্তিটি জান্নাতের এক জায়গায় পড়ে রইল। সেই সময়ে ফেরেশতারা সেই মূর্তির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অবাক হয়ে দেখতেন এবং আল্লাহর সৃষ্টির প্রশংসা করতেন। কিন্তু একজন ছিল যে এই মাটির মূর্তিকে দেখে হিংসা এবং অহংকারে জলে পুড়ে যাচ্ছিল। সে ছিল ইবলিশ। সে মূর্তির কাছে এসে লাথি মারতো এবং এর ভেতরে ঢুকে দেখতো যে এটি ভেতর থেকে ফাঁপা। সে তখন থেকেই বুঝতে পেরেছিল যে এই সৃষ্টি হয়তো দুর্বল প্রকৃতির হবে। তার অন্তরে তখন থেকেই আদম আলাইহিস সালামের প্রতি এক তীব্র ঘৃণা আর অহংকার জন্ম নিয়েছিল। সে মনে মনে ভাবছিল আমি আগুনের তৈরি। আর এ হলো মাটির তৈরি। আমি এর চেয়ে সেরা। অবশেষে সেই 40 বছর পর আল্লাহ সেই নিষ্প্রাণ মাটির মূর্তি দিতে তার পক্ষ থেকে রুহ বা আত্মা ফুঁকে দিলেন। রুহ যখন হযরত আদম আলাইহিস সালামের মাথার দিক থেকে প্রবেশ করতে শুরু করল তখন তিনি হাঁচি দিলেন এবং আল্লাহর শেখানো বাক্য বললেন আলহামদুলিল্লাহ। উত্তরে আল্লাহ বললেন ইয়ারহামুকাল্লাহ। আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন। এটাই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম কথোপকথন। রুহ যখন তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল তখন নিষ্প্রাণ মাটির মূর্তিটি হয়ে উঠলো এক জীবন্ত রক্তমাংশের মানুষ। আমাদের আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাম। আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামকে সকল বস্তুর নাম এবং জ্ঞান শিখিয়ে দিলেন যা তিনি ফেরেশতাদেরও শেখাননি। এরপর তিনি ফেরেশতাদের সামনে সেই বস্তুগুলো পেশ করে বললেন, যদি তোমরা তোমাদের কথায় সত্যবাদী হও, তবে আমাকে এই বস্তুগুলোর নাম বলো। ফেরেশতারা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন, হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র। আপনি আমাদের যা শিখিয়েছেন তার বাইরে আমাদের কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনি সর্বজ্ঞানী, সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজ্ঞাময়। তখন আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামকে বললেন, হে আদম, তুমি তাদের এই বস্তুগুলোর নাম বলে দাও। আদম আলাইহিস সালাম যখন সকল বস্তুর নাম সঠিকভাবে বলে দিলেন তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেন আমি কি তোমাদের বলিনি যে আমি আসমান ও জমিনের সকল অদৃশ্যের খবর জানি এবং তোমরা যা প্রকাশ করো ও যা গোপন করো তার সবকিছুই আমি জানি এভাবেই আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে আদম আলাইহিস সালামের শ্রেষ্ঠত্বকে প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর তিনি তার আরশের সামনে উপস্থিত সকল ফেরেশতা এবং জ্বীনদের নেতা ইবলিশকে একত্রিত করলেন এবং এক চূড়ান্ত নির্দেশ দিলেন তোমরা আদমকে সেজদা করো। আল্লাহর নির্দেশ পাওয়া মাত্রই সকল ফেরেশতা বিন্দু পরিমাণ দ্বিধা না করে সাথে সাথে সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন। একজন ছাড়া সে ছিল ইবলিশ। আল্লাহ যিনি সবকিছুই জানেন তিনি ইবলিশকে তার ভুলের গভীরতা বোঝানোর জন্য জিজ্ঞেস করলেন হে ইবলিশ আমি যখন তোমাকে নির্দেশ দিলাম তখন কোন জিনিস তোমাকে সেজদা করতে বাধা দিল তখন ইবলিশ তার অন্তরের সমস্ত ঘৃণা আর অহংকারকে প্রকাশ করে উত্তর দিল আমি তার চেয়ে সেরা আমি আগুনের তৈরি সৃষ্টি হয়ে কেন মাটির তৈরি সৃষ্টিকে সেজদা করব এই একটা বাক্যই ছিল তার ধ্বংসের কারণ তার অহংকার তাকে আল্লাহ আল্লাহর হুকুম অমান্য করতে বাধ্য করল। আল্লাহর ক্রোধ জ্বলে উঠলো। তিনি বললেন, বেরিয়ে যা এখান থেকে। তুই হলি বিতাড়িত এবং অভিশপ্ত। তোর উপর আমার লানাত থাকবে কেয়ামত পর্যন্ত। হাজার হাজার বছর ধরে আল্লাহর ইবাদত করে যে ইবলিশ সর্বোচ্চ মর্যাদা পেয়েছিল সে এক মুহূর্তে অহংকারের কারণে চিরদিনের জন্য অভিশপ্ত হয়ে গেল। তখন তার অন্তরে অনুশোচনার বদলে জন্ম নিল মানবজাতির প্রতি তীব্র প্রতিশোধের আগুন। সে আল্লাহর কাছে একটি সুযোগ চাইল। সে বলল, হে আমার রব, তাহলে আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকার সুযোগ দিন। আল্লাহ বললেন, তোকে সেই সুযোগ দেওয়া হল। সুযোগ পাওয়ার পর সে আল্লাহকে চ্যালেঞ্জ করে তার চূড়ান্ত এবং ভয়ঙ্কর শপথটি ঘোষণা করল। সে বলল, আমি শপথ করছি। যে আদমের কারণে আমি আজ পথভ্রষ্ট এবং অভিশপ্ত হলাম। আমি শপথ করছি। আমি এই মানুষগুলোকে বিভ্রান্ত করার জন্য তাদের সোজা পথের উপর ফাঁদ পেতে বসে থাকবো। আমি তাদের কাছে আসবো। তাদের সামনে থেকে, তাদের পেছন থেকে, তাদের ডান দিক থেকে এবং তাদের বাম দিক থেকে। আমি তাদের মনের লোভ, হিংসা, অহংকার আর অশ্লীলতার বীজ বুনে দেব। আমি দুনিয়াকে তাদের চোখে এত সুন্দর আর আকর্ষণীয় করে তুলে ধরবো যে তারা আখেরাতকে ভুলে যাবে। আর আপনি তাদের বেশিরভাগকেই আপনার শুকরিয়া আদায়কারী বা কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে পাবেন না। মহান আল্লাহ যিনি সবকিছুই জানেন তিনি তার এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলেন। তিনি উত্তর দিলেন বেরিয়ে যা এখান থেকে। তোর এবং তোর অনুসারীদের। অর্থাৎ যেই তোর পথ অনুসরণ করবে তাদের সবাইকে দিয়ে আমি অবশ্যই জাহান্নাম পূর্ণ করবো। কিন্তু মনে রাখিস আমার খাঁটি বান্দাদের উপর তোর কোন ক্ষমতা থাকবে না। এভাবেই শুরু হলো মানবজাতি এবং শয়তানের মধ্যকার চিরস্থায়ী এক লড়াইয়ের। যে লড়াই আজও আমাদের প্রত্যেকের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে চলছে। আল্লাহ হযরত আদম আলাইহিস সালামকে জান্নাতে থাকার অনুমতি দিলেন। জান্নাত হলো এমন এক শান্তির জায়গা যার সৌন্দর্য এবং নিয়ামত মানুষ কখনো কল্পনাও করতে পারবে না। কিন্তু সেই বিশাল জান্নাতে এত নিয়ামতের মাঝেও আদম আলাইহিস সালাম একাকিত্ব অনুভব করছিলেন। তার মনে হচ্ছিল যেন তার একজন সঙ্গীর প্রয়োজন যার সাথে তিনি কথা বলতে পারেন যার কাছে তিনি শান্তি খুঁজে পেতে পারেন। এই তার একাকিত্ব দূর করার জন্য আল্লাহ এক আশ্চর্য এবং সুন্দর ঘটনা ঘটালেন। যখন আদম আলাইহিস সালাম ঘুমিয়েছিলেন তখন আল্লাহ তার বাম পাজরের একটি বাঁকা হাড় থেকে তার সঙ্গিনী হযরত হাওয়া আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করলেন। ঘুম থেকে উঠে আদম আলাইহিস সালাম তার পাশে অপূর্ব সুন্দর একজন নারীকে বসে থাকতে দেখে অবাক হলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? তিনি অত্যন্ত মিষ্টি সুরে উত্তর দিলেন, আমি একজন নারী। আদম আলাইহিস সালাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে? তিনি উত্তর দিলেন, যাতে আপনি আমার কাছে শান্তি খুঁজে পান। এভাবেই শুরু হলো পৃথিবীর প্রথম মানব মানবীর ভালোবাসার গল্প। তারা দুজনে জান্নাতে পরম শান্তিতে বসবাস করতে লাগলেন। সেখানে কোন চিন্তা ছিল না, কোন দুঃখ ছিল না, কোন ক্ষুধা বা ক্লান্তি ছিল না। তারা যা চাইতেন তাই পেতেন। জান্নাতের পাখিরা তাদের জন্য গান গাইতো। নহরগুলো তাদের জন্য বয়ে যেত। আল্লাহ তাদের দুজনকে বললেন, তোমরা দুজনে এই জান্নাতে যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াও। যা ইচ্ছা খাও। কিন্তু ওই যে একটি গাছ দেখছো ওই গাছটির কাছেও যেও না এবং এর ফল খেও না। যদি তোমরা তা করো তাহলে তোমরা নিজেদের উপর অত্যাচারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। জান্নাতের অফুরন্ত সুখের মাঝেও তাদের জন্য ছিল একমাত্র নিষেধাজ্ঞা। একমাত্র পরীক্ষা। আর সেই পরীক্ষাকে কেন্দ্র করেই জান্নাতের বাইরে লুকিয়ে থাকা তাদের চির শত্রু ইবলিশ তার সেই ভয়ঙ্কর শপথ পূরণ করার জন্য তার প্রথম এবং সবচেয়ে মারাত্মক চালটি চালার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিভাবে ইবলিশ জান্নাতে প্রবেশ করল? কিভাবে সে আদম ও হাওয়াকে সেই নিষিদ্ধ ফল খাওয়ার জন্য প্ররোচিত করল। আর সেই একটা ভুলের কারণেই বা তাদের পরিণতি কি হয়েছিল? এবং কিভাবে পৃথিবীতে মানবজাতির সূচনা হলো এই অবিশ্বাস্য এবং শিক্ষণীয় কাহিনী আমরা জানবো পরের পর্বে। এই মহাকাব্যিক সিরিজ যদি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে অবশ্যই ভিডিওটিতে একটি লাইক দিন এবং কমেন্ট করে জানান কোন অংশটি আপনার হৃদয়কে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে। পরের পর্বটি কিন্তু এর থেকেও অনেক বেশি আকর্ষণীয় হতে চলেছে। তাই সেই পর্বটি সবার আগে দেখার জন্য এখনই চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে বেল আইকনটি অন করে দিন। আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে একদম ভুলবেন না যাতে তারাও এই জ্ঞান লাভ করতে
Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.
Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact