"মা" জীবনের সবটুকু দিয়ে হলেও তার সন্তানকে রক্ষা করেন | একটি শিক্ষণীয় কাহিনী | Islamic Voice Bangla

Islamic Voice Bangla2,620 words

Full Transcript

আসসালামু আলাইকুম গভীর রাত চারদিক

নিস্তব্ধ উপত্যাকার প্রতিটি ঘর যখন ঘুমের সাগরে নিমজ্জিত তখন এক কুটিরের ভেতর জেগে

আছে এক মায়ের বিনিদ্র চোখ তার নাম আমিনা তার কোলের উপর শুয়ে আছে তার 10 বছরের

সন্তান ইব্রাহিম মাটির প্রদীপের কাঁপা কাঁপা আলোয়ে তার ফ্যাকাসে ঘরমাক্ত মুখটা

দেখা যাচ্ছে ছোট্ট শরীরটা জ্বরের তীব্রতায় ধনুকের মত বেকে যাচ্ছে থেকে

থেকে ঘুমের এর ঘোরেই যন্ত্রণাকাতর এক অস্ফুট আর্তনাদ তার কচি ঠোঁট থেকে বেরিয়ে

আসছে। আমিনা এক দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। তার নিজের ভেতরটা এক শূন্য

পাথরচাপা কষ্ট আর অসহায়ত্বে জমে গেছে। আজ রাত নিয়ে পাঁচ দিন হলো ইব্রাহিমের এই

অবস্থা। জ্বরের ঘোরে সে কখনো হাসছে, কখনো কাঁদছে, কখনো বা তার প্রয়াত বাবাকে

ডাকছে। প্রতিবার বাবা ডাক শুনে আমিনার বুকটা দুমড়ে মুছড়ে যাচ্ছে। গ্রামের

কবিরাজ তার জ্ঞানের সবটুকু নিংড়ে দিয়েছেন, কিন্তু ইব্রাহিমের জ্বর এক চুলও

কমেনি। বরং সময় গড়ানোর সাথে সাথে তার ছোট্ট শরীরটা আরো নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। এই

মুহূর্তে এই গভীর রাতে আমিনার মনে হচ্ছে সে এক অথৈ সাগরের মাঝে খরকুটহীন ভেসে থাকা

এক যাত্রী। হঠাৎ বাইরে এক দমকা শীতল বাতাস এসে প্রদীপটাকে এক ফুৎকারে নিভিয়ে দিল।

ঘরটা ডুবে গেল এক নিকশ কালো অন্ধকারে। এই অন্ধকার যেন কোন সাধারণ অন্ধকার নয়। এ

যেন আমিনার বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত ভয়, শঙ্কা আর হতাশার এক মূর্তিমান রূপ।

সে ভয়ে চিৎকার করে উঠতে গিয়েও পারল না। শুধু ইব্রাহিমকে আরও নিবিড়ভাবে আরো শক্ত

করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। যেন এই সর্বগ্রাসী অন্ধকার তার কলিজার টুকরাকে

কেড়ে নিতে এসেছে। তার অবচেতন মন তাকে টেনে নিয়ে গেল কয়েক মাস আগের এমনি এক

কালরাত্রিতে। সেদিনও আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছিল, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল আর বাতাস

দানবের মত গর্জন করছিল। তার স্বামী ইব্রাহিমের বাবা কাছের এক জনপদ থেকে ফেরার

পথে সেই যে হারিয়ে গেলেন আর ফেরেননি। পরদিন সকালে উপত্যকার পাশের খরশ্রোতা নদীর

ধারে পাওয়া গিয়েছিল তার প্রাণহীন দেহ। সেই রাতটা আমিনার জীবন থেকে সমস্ত রং

সমস্ত আলো কেড়ে নিয়েছিল। আজ আবার এই অন্ধকার রাতে তার জীবনের একমাত্র অবলম্বন

তার বেঁচে থাকার একমাত্র কারণ ইব্রাহিমের জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। আমিনার মনে হলো

নিয়তি যেন এক নিষ্ঠুর খেলা করছে তার সাথে। সে বলল হে আল্লাহ হে আমার রব আমার

সব কেড়ে নিয়েছো। আমার শেষ সম্বলটুকু তুমি আমার কাছ থেকে নিও না। আমি আর কোন

পরীক্ষা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নই। আমার সব শক্তি শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমিনা

জানতো না সর্বশক্তিমান তার প্রিয় বান্দাদের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মাধ্যমেই

পরিশুদ্ধ করেন। এই রাত, এই কান্না, এই অসহায়ত্ব এসবই ছিল এক মহাকাব্যিক সফরের

ভূমিকা মাত্র। এক মায়ের ভালোবাসা আর ঈমানের শক্তি দিয়ে নিয়তির সাথে এক কঠোর

যুদ্ধের পূর্বাভাস ছিল এই রাত। রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে যখন ভোরের প্রথম আলো

পূর্ব আকাশে উঁকি দিল তখন আমিনার ভেতরের মা সত্তাটি জেগে উঠলো। কান্নায় ভেঙে পড়া

হতাশায় ডুবে থাকা এক নারী রূপান্তরিত হলো এক ইস্পাত কঠিন যোদ্ধায়। সে শুনেছে এই

উবদ্ধকা ছাড়িয়ে রুক্ষ প্রান্তর আর দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে এক জনপদে বাস করেন

এক জ্ঞানী হাকিম। তার জ্ঞানের খ্যাতি কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে আছে চারপাশে।

মানুষ বলে তার হাতে আল্লাহ শেফা দান করেন। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পথ যেন মৃত্যুর

পরোয়ানা নিয়ে আহ্বান জানায়। মাঝখানে রয়েছে দুই দিনের পথের এক বিশাল শুষ্ক

প্রান্তর মউতকা ময়দান বা মৃত্যুর মাঠ নামেই যা পরিচিত। দিনের বেলা সূর্যের

লেলিহান শিখা যেখানে বালিকে গনগনে আগুনে পরিণত করে আর রাতে সেই বালি বরফের মত শীতল

হয়ে যায়। পথে নেই কোন পানির চিহ্ন, নেই কোন আশ্রয়। তবুও মায়ের মন কোন যুক্তি,

কোন ভয় মানে না। সে তার দুর্বল জ্বরে প্রায় অচেতন ছেলেকে একটি পুরনো মোটা

চাদরে সাবধানে জড়িয়ে পিঠের সাথে শক্ত করে বেঁধে নিল। তার মনে হল সে শুধু তার

সন্তানকে নয় তার নিজের হৃদপিণ্ড টাকেই যেন পিঠে বেঁধে নিচ্ছে। ঘরের কোণে মাটির

কলসিতে রাখা শেষ সম্বল পাঁচটি শুকনো রুটি আর একটি চামড়ার মস্কে যতটুকু পানি ছিল

তাই সাথে নিল। প্রতিবেশীর কাছ থেকে বিদায় নিতে গেলে তারা সবাই আতকে উঠল। একজন

বয়স্ক চাচা পথ আগলে দাঁড়িয়ে বললেন, আমিনা মাথা খারাপ হয়েছে তোর এই কচি

বাচ্চাকে নিয়ে তুই মৃত্যুর মাঠে পা বাড়াবি। এটা আত্মহত্যার শামিল। আল্লাহর

উপর ভরসা রাখ। এখানেই থাক। আমরা সবাই মিলে দেখবো কি করা যায়। আমিনা চাচার দিকে

তাকালো এবং বলল চাচা আমি আল্লাহর উপর ভরসা রেখেই বেরচ্ছি। তিনিই তো পবিত্র কালামে

বলেছেন নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। আর তিনিই তো চেষ্টা করার নির্দেশ

দিয়েছেন। আমি মা হয়ে আমার সন্তানের জীবনের শেষ চেষ্টা না করে কিভাবে বসে

থাকবো? যদি আমার মৃত্যুও হয় আমার কোন আফসোস থাকবে না যে আমি চেষ্টা করিনি তার

কন্ঠের দৃঢ়তা আর চোখের আগুন দেখে উপস্থিত কেউ আর দ্বিতীয় কথা বলতে পারল না আমিনা

সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আল্লাহর নাম শ্রবণ করে এক অজানার পথে পা বাড়ালো তার

প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল একেকটি দোয়া একেকটি মোনাজাত প্রথম কয়েক ঘন্টা সে উপত্যকার

পরিচিত সবুজ পথ ধরে এগিয়ে চলল কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই সবুজ মিলিয়ে গিয়ে

শুরু হল সেই রুক্ষ ধুষর প্রান্তর যতদূর চোখ যায় শুধু বালি পাথর আর কাঁটাযুক্ত

ঝোপ সূর্যের তেজ ক্রমশ বাড়তে লাগলো পিঠে বাঁধা ইব্রাহিমের শরীরের উত্তাপ আর

বালিরের সূর্যের তাপ দুইয়ে মিলে আমিনার শরীর থেকে সমস্ত শক্তি যেন শুষে নিতে

লাগলো তার পা দুটো যেন সীষার মতো ভারী হয়ে আসছিল কিন্তু আমিনা থামেনি সে

ইব্রাহিমের কানের কাছে মুখ নিয়ে তাকে ইসলামের ইতিহাসের সেই সব মহান নারীদের

কাহিনী শোনাতে লাগল হাজেরা আলাইহিস সালামের সাফা মারুয়া পাহাড়ে দৌড়ানোর

কথা আসিয়া আলাইহিস সালামের ফেরাউনের বিরুদ্ধে ধৈর্যের কথা। যদিও ইব্রাহিম তখন

প্রায় অচেতন কিন্তু আমিনার বিশ্বাস ছিল এই কথাগুলো তার সন্তানের কানের ভেতর দিয়ে

আত্মাকে স্পর্শ করবে। তাকে লড়াই করার শক্তি যোগাবে। বিকেলের দিকে হঠাৎ করেই

আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে গেল। আমিনা ভাবলো এটা হয়তো আল্লাহর রহমত। বৃষ্টি নামলে

হয়তো কিছুটা স্বস্তি মিলবে। কিন্তু তার ভাবনাকে চুরমার করে দিয়ে শুরু হলো এক

ভয়ঙ্কর ধূলোঝড়। আকাশ জমিন একাকার করে বালি আর কাঁকড়ের এক দেয়াল যেন তাদের

দিকে ধেয়ে এলো। আমিনা দ্রুত ইব্রাহিমকে ধুলো থেকে বাঁচানোর জন্য নিজের সমস্ত শরীর

দিয়ে তাকে আড়াল করে বালির উপর উপর হয়ে শুয়ে পড়ল। তার পিঠের উপর দিয়ে বয়ে গেল

সেই ভয়ঙ্কর ঝড়ের তান্ডব। বালি আর ধারালো কাঁকর তার পিঠে চাবুকের মত আঘাত করতে

লাগল। কিন্তু সে দাঁতে দাঁত চেপে পড়ে রইল। ঝড়টি ছিল স্বল্পস্থায়ী কিন্তু তার

রেখে যাওয়া ক্ষত ছিল মারাত্মক। ঝড় থামার পর আমিনা যখন উঠে দাঁড়াতে গেল তখন তার

হৃদপিণ্ডটা থেমে যাওয়ার উপক্রম হলো। সে দেখল তার সাথে থাকা চামড়ার মশকটি ঝড়ের

ঝাঁপটায় একটি পাথরের উপর পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। শেষ সম্বল জীবনের ভর্ষা

এক ফোঁটা পানিও আর অবশিষ্ট নেই। এই নির্জন উত্তপ্ত প্রান্তরের মাঝে পানি ছাড়া সে আর

তার মুমূর্ষ সন্তান কিভাবে বাঁচবে? আমিনার মাথাটা ঘুরে উঠলো। তার চোখের সামনে পুরো

পৃথিবীটা যেন অন্ধকার হয়ে গেল। তার মনে হলো সব আশা সব লড়াই বুঝি এখানেই শেষ।

পানির মশকটি ছিড়ে যাওয়ার পর আমিনা কিছুক্ষণের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। তার

গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। ঠোঁট ফেটে রক্ত ঝরতে লাগলো। আর ইব্রাহিমের নিঃশ্বাসও যেন

আরো ক্ষীণ হয়ে আসছে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না বালির উপর আছড়ে পড়ে দু

হাতে নিজের চুল ছিঁড়তে ছিড়তে সে চিৎকার করে কেঁদে উঠল তার কান্না কোন সাধারণ

কান্না ছিল না তা ছিল এক মায়ের সব হারানোর ভয় এক বান্দার তার রবের কাছে চরম

অসহায়তার আর্তনাদ কিন্তু কান্নার মাঝেই হঠাৎ তার মনে পড়লো ইব্রাহিম আলাইহিস

সালামের কথা তার স্ত্রী হাজেরা আলাইহিস সালাম যখন শিশুপুত্র ইসমাইল আলাইহিস

সালামকে নিয়ে এমনি এক নির্জন প্রান্তরে পানির জন্য ছটপট করছিলেন তখন তিনিও তো

হতাশ হননি। তিনি সাফা ও মারুয়া পাহাড়ের মাঝে ছুটে ছিলেন। আমিনার মনে হলো আল্লাহ

যদি সেদিন হাজেরা আলাইহিস সালামের জন্য জমজম কূপ সৃষ্টি করতে পারেন তবে তিনি কি

আমার জন্য কিছু করতে পারেন না? আমি কেন হতাশ হচ্ছি। আল্লাহ আমার পরীক্ষা নিচ্ছেন?

তিনি দেখতে চাইছেন আমার বিশ্বাস কতটা গভীর? এই চিন্তা মাথায় আসতেই সে কান্না

থামিয়ে দিল। চোখের পানি মুছে ছেড়া আঁচল দিয়ে ইব্রাহিমের মুখটা মুছে দিয়ে আমিনা

আবার উঠে দাঁড়ালো। সে জানেনা কোথায় যাচ্ছে কোন দিকে পানির দেখা মিলবে। কিন্তু

সে আবার হাঁটতে শুরু করল। তার একমাত্র লক্ষ্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত চেষ্টা করে

যাওয়া। সে আল্লাহর অসীম ক্ষমতার কথা ভাবতে লাগলো। আর মনে মনে দোয়া করতে

লাগলো। হে আর রাজ্জাক হে আল মগ্নি তুমি তো পাথরের ভেতর থাকা ক্ষুদ্র পোকাকেও খাবার

পৌঁছে দাও আমরা তো তোমারই নগণ্য বান্দা আমাদের জন্য তোমার রহমতের দরজা খুলে দাও

হে পরম করুণাময় সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে প্রান্তরের বালি ধীরে ধীরে

ঠান্ডা হতে শুরু করেছে আমিনা ক্ষুধায় তৃষ্ণায় এবং ক্লান্তিতে এমন এক অবস্থায়

পৌঁছেছে যে তার মতিভ্রম হতে শুরু করেছে তার মনে হচ্ছে সে যেন দূরে পানির স্রোত

দেখতে পাচ্ছে। কিন্তু কাছে গেলেই তা মিলিয়ে যাচ্ছে। একসময় সে আর হাঁটতে না

পেরে জ্ঞান হারানোর ঠিক আগের মুহূর্তে পৌঁছে গেল। ঠিক তখনই যখন সব আশা প্রায়

নিভে যাচ্ছে তখন এক অলৌকিক ঘটনা ঘটলো। সে দেখল তার থেকে কিছুটা দূরে একটি উট একাকি

দাঁড়িয়ে আছে এবং অদ্ভুতভাবে মাটিতে কি যেন শুকছে। এই জনমানবহীন প্রান্তরে একা

একটি উট তার কাছে বিষয়টি অবিশ্বাস্য লাগলো। কিন্তু তার মনে একটি আশার আলো

জ্বলে উঠলো। সে তার জীবনের শেষ শক্তিটুকু একত্রিত করে হামাগুড়ি দিয়ে উটটির দিকে

এগিয়ে যেতে লাগলো। কাছে গিয়ে সে যা দেখল তাতে তার নিজের চোখ কেউ বিশ্বাস করতে

পারছিল না। উটটি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার ঠিক পাশেই বালির ভেতর থেকে চুইয়ে চুইয়ে

পানি বের হচ্ছে এবং একটি ছোট গর্তে জমা হচ্ছে। পানিটুকু এতই স্বচ্ছ যে নিচের বালি

পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। আমিনা বুঝতে পারলো না এই উট বা এই পানির উৎস এখানে কিভাবে

সম্ভব হলো কিন্তু সে এক মুহূর্ত দেরি না করে সে সেজদায় পড়ে গেল তারপর সে উঠে

দাঁড়িয়ে প্রথমে তার আঁচল ভিজিয়ে ইব্রাহিমের ঠোঁট ও মুখ মুছিয়ে দিল তারপর

হাতে করে কয়েক ফোঁটা পানি তার মুখে দিল অনেকক্ষণ পর ইব্রাহিমের ছোট্ট শরীরটা একটু

নড়েচড়ে উঠল তারপর আমিনা নিজেও প্রাণ ভরে পানি পান করল এই পানি তার কাছে তখন

পৃথিবীর সবকিছুর চেয়ে মূল্যবান মনে হচ্ছিল। এই গায়েবী সাহায্য আমিনার ঈমানকে

এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিল। সে বুঝতে পারল আল্লাহ তাকে এক মুহূর্তের জন্য একা

ছাড়েননি। তিনি তার বান্দার প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি দোয়া লক্ষ্য রাখেন এবং

ঠিক সময়ে তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। নতুন শক্তি, নতুন আশা আর পাহাড়ের মত অটল

বিশ্বাস নিয়ে সে আবার হাঁটতে শুরু করল। তার মনে হলো সেই হাকিমের জনপদ আর বেশি

দূরে নয়। আল্লাহ যখন সাথে আছেন তখন কোন পথই আর দুর্গম নয়। পরদিন দুপুরের দিকে

যখন সূর্য ঠিক মাথার উপর তখন আমিনা দূর থেকে গাছপালার চিহ্ন দেখতে পেল। তার বুঝতে

বাকি রইল না যে সে অবশেষে সেই কাঙ্খিত জনপদের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে। আরো প্রায়

এক ঘন্টা হাঁটার পর সে জনপদের প্রথম কুটিরের দেখা পেল। হাকিমের বাড়ির খোঁজ

নিতে তার কোন বেগ পেতে হলো না। কারণ এই জনপদের প্রতিটি মানুষ এমনকি শিশুরাও তাকে

এক নামে চেনে হাকিম বাবা। হাকিমের বাড়িটি ছিল জনপদের এক প্রান্তে একটি বিশাল বট

গাছের নিচে। কোন জাগজমক নেই মাটির দেয়াল আর খরের চালের একটি সাদা মাটা কুটির।

কিন্তু কুটিরের চারপাশে এক অদ্ভুত শান্ত পবিত্র পরিবেশ বিরাজ করছে। আমিনা যখন তার

কুটিরের আঙ্গিনায় পা রাখল তখন সে ক্লান্তিতে আর নিজের ভার বহন করতে না পেরে

প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কুটিরের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন এক নূরানী চেহারার

বৃদ্ধ। তিনিই হলেন সেই জ্ঞানী হাকিম। তিনি আমিনার বিধ্বস্ত চেহারা, রক্তমাখা খালি পা

আর পিঠে বাঁধা মুমূর্ষ সন্তানের অবস্থা দেখেই অনেক কিছু অনুমান করে নিলেন। তিনি

কোন প্রশ্ন না করে হাত বাড়িয়ে আমিনার হাত ধরে বললেন, ভেতরে সোমা তোমার সফর শেষ

হয়েছে। আমিনা হাউমাউ করে কেঁদে হাকিমের পায়ের কাছে বসে পড়ল। হাকিম আমিনাকে পরম

স্নেহে তুলে বসালেন এবং একজন দাসীকে ইশারা করলেন পানি আনার জন্য। আমিনা ধাতস্থ হবার

পর হাকিম তাকে তার সব কথা বলতে বললেন। আমিনা কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল, ঝড়ের সেই

ভয়ঙ্কর রাত থেকে শুরু করে কবিরাজের হতাশা, মৃত্যুর প্রান্তর পাড়ি দেওয়ার

সিদ্ধান্ত, ধুলোঝড়, পানির মশক ছিড়ে যাওয়া এবং সবশেষে সেই অলৌকিক উট ও পানির

উৎসের কথা। সব শুনে হাকিম কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে গভীর ধ্যানে মগ্ন রইলেন। তার

কপাল সামান্য কুচকে উঠল। তারপর চোখ খুলে তিনি বললেন মা তুমি যে পথ পাড়ি দিয়ে

এসেছো তা কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় এটি কেবল এক মায়ের পক্ষেই সম্ভব যার

হৃদয়ে রয়েছে ভালোবাসার উত্তাল সাগর আর আল্লাহর উপর রয়েছে পাহাড়ের মত অটল

বিশ্বাস তোমার সন্তানের অর্ধেক চিকিৎসা তো তোমার এই ঈমানী সফরেই হয়ে গেছে হাকিম

সাবধানে ইব্রাহিমকে আমিনার ওল থেকে নামিয়ে একটি নরম বিছানায় শোয়ালেন। তিনি

দীর্ঘক্ষণ ধরে তার পরীক্ষা করলেন। তার বুকে কান লাগিয়ে হৃস্পন্ধন শুনলেন। তারপর

বললেন এর রোগ শরীরে যতটা না তার চেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে আত্মায়। ভয় আতঙ্ক আর

শোক তার কচি আত্মাকে দুর্বল করে দিয়েছে। একে সারিয়ে তুলতে হলে ঔষধের পাশাপাশি

রুহানি শক্তিরও প্রয়োজন। হাকিম নিজে গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করলেন এবং প্রায় এক ঘন্টা

পর কিছু দুর্লভ শিকড় লতাপাতা কয়েকটি অজানা ফুল আর একটি ছোট পাত্রে বিশেষ এক

ধরনের কালো পাহাড়ি মধু নিয়ে ফিরলেন। তিনি দীর্ঘক্ষণ ধরে সেগুলো পিশে ছেঁকে

একটি ঘন কালো তরল ঔষধ তৈরি করলেন। ঔষধটি আমিনার হাতে দিয়ে তিনি বললেন এই ঔষধ দিনে

তিনবার এক চামচ করে তাকে খাওয়াবে। কিন্তু মনে রাখবে ঔষধ একটি উসিলা মাত্র। আসল শেফা

দানকারী হলেন আল্লাহ। আজ রাত থেকে তুমি তাহাজ্জুদের নামাজ পড়বে এবং ইয়া শাফি”

এই নামটি অনবরত জপবে। তোমার দোয়া, তোমার চোখের পানি হবে তোমার সন্তানের জন্য

সবচেয়ে শক্তিশালী ঔষধ। তোমার ধৈর্য আর ঈমানি তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনতে

পারে। হাকিম আমিনা ও ইব্রাহিমের জন্য তার কুটিরের পাশেই একটি পরিচ্ছন্ন ছোট ঘরে

থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন এবং তাদের সব ধরনের খাবারের দায়িত্ব নিলেন। আমিনার মনে

হলো সে যেন এক দীর্ঘ ঝড়ের পর এক নিরাপদ আশ্রয় এসে পৌঁছেছে। সেই রাত থেকেই আমিনার

এক নতুন সংগ্রাম শুরু হলো। এ সংগ্রাম তরবারির নয়। এ সংগ্রাম হলো ধৈর্যের। এ

লড়াই অস্ত্রের নয়। এ লড়াই হলো দোয়ার। সে হাকিমের কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে

লাগল। সে নিয়মিত ইব্রাহিমকে ঔষধ খাওয়াতো আর বাকি সময়টা জায়নামাজে কাটিয়ে দিত।

রাতের গভীরে যখন পুরো পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়তো, তখন আমিনা উঠে দাঁড়াত তাহাজ্জুদের

নামাজে। তার দু-চোখ দিয়ে আর হতাশার কান্না ঝরতো না, ঝরত শুধু আল্লাহর প্রতি

কৃতজ্ঞতা, ভর্ষা আর ভালোবাসার অশ্রু। সে অনুভব করতে পারছিল তার প্রতিটি সেজদা

প্রতিটি জিকির যেন আসমান ভেদ করে সরাসরি আল্লাহর আরশে পৌঁছে যাচ্ছে। প্রথম দিন

গেল, দ্বিতীয় দিন গেল। ইব্রাহিমের অবস্থার বাহ্যিক কোন উন্নতি দেখা গেল না।

কিন্তু আমিনা এবার দুর্বল না হয়ে সে হাকিমের কথা মনে করল। তোমার বিশ্বাসী

তোমার ছেলেকে বাঁচাবে। আমিনা আরো বেশি করে আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হয়ে গেল। তৃতীয়

দিন ভোরে যখন শুভে সাদিকের আলো সবে ফুটে উঠছে তখন আমিনা ইব্রাহিমের কপালে হাত রেখে

চমকে উঠলো। শরীরটা আর আগের মতো গনগনে গরম ছিল না। জ্বর উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে।

আমিনার বুকে আসার একটি ঢেউ খেলে গেল। কিছুক্ষণ পর ইব্রাহিম বহুদিন পর তার ছোট্ট

চোখ দুটি পুরোপুরি মেলে তাকালো এবং বলল মা আমার খুব খিদে পেয়েছে। এই কয়েকটি শব্দ

আমিনার কানে পৌঁছানো মাত্রই তার বুকের ভেতর থেকে এক অনাবিল আনন্দের ঝর্ণা যেন

শতধারায় উৎসারিত হলো। তার মনে হলো সে যেন পৃথিবীর সব সুখ সব সম্পদ একসাথে পেয়ে

গেছে। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ইব্রাহিমকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে

কেঁদে ফেলল। কিন্তু এ কান্না ছিল কষ্টের নয়। এ কান্না ছিল পরম প্রাপ্তির। এ

কান্না ছিল এক দীর্ঘ কঠিন যুদ্ধে বিজয়ের। পরবর্তী কয়েকদিনে হাকিমের ঔষধ, পথ্য আর

সর্বোপরি মায়ের সেবা ও দোয়ার বরকতে ইব্রাহিম অবিশ্বাস্য দ্রুততায় সুস্থ হয়ে

উঠতে লাগলো। সে আবার তার মিষ্টি হাসি দিয়ে মায়ের কোল আলো করে তুলল। হাকিমের

কুটিরের শান্ত আঙিনা তার দুরন্ত পনা আর কলরবে মুখরিত হয়ে উঠল। যাওয়ার দিন আমিনা

হাকিমের জন্য নিজের হাতে বোনা একটি চাদর উপহার হিসেবে দিয়ে গেল। এবং তার পায়ে

হাত দিয়ে সালাম করতে চাইল। কিন্তু হাকিম তাকে শক্ত করে থামিয়ে দিয়ে তার মাথায়

হাত রেখে বললেন মা এই সম্মান আমার নয় এই সম্মান তোমার। তুমি আজ প্রমাণ করে দিলে

মায়ের ভালোবাসা আর আল্লাহর উপর অবিচল বিশ্বাস থাকলে মানুষ কিভাবে নিয়তির

লিখনকেও বদলে দেওয়ার স্পর্ধা করতে পারে। যাও তোমার সন্তানকে নিয়ে ঘরে ফিরে যাও।

আল্লাহ তোমাদের দুজনকেই তার রহমতের ছায়ায় রাখুন। আমিনা তার সুস্থ সবল

হাস্যোজ্জল সন্তানকে নিয়ে বাড়ির পথে রওনা দিল। যে প্রান্তর আসতে তার কাছে

মৃত্যুর বিভীষিকা বলে মনে হয়েছিল ফেরার পথে সেই প্রান্তরই তার কাছে এক সুন্দর

স্মৃতিময় পথ বলে মনে হলো। তার মনে হলো আকাশ-বাতাস বালিপাথর সবাই যেন তার এই

বিজয়ে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। বাড়ি ফিরে আমিনা আর ইব্রাহিম এক নতুন জীবন শুরু

করল। তাদের মাটির ঘরটা আগের মতোই সাদা মাটা ছিল। কিন্তু তাদের হৃদয় ছিল ঈমানের

আলোয় আলোকিত আর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। তারা শিখে গিয়েছিল জীবনের

সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ধৈর্য, ঈমান আর মায়ের নিঃস্বার্থ শর্তহীন ভালোবাসা। যার

কাছে পৃথিবীর সবকিছুই তুচ্ছ। আসসালামু আলাইকুম। আমাদের ইসলামিক ভয়েস বাংলা

চ্যানেলের ভিডিওগুলো যদি আপনার ভালো লাগে তবে অবশ্যই ভিডিওটিকে লাইক কমেন্ট এবং

শেয়ার করবেন আর নতুন নতুন ইসলামিক গল্প দাওয়া নবীদের জীবনী ও শিক্ষামূলক ভিডিও

পেতে আমাদের চ্যানেলটিকে সাবস্ক্রাইব করতে ভুলবেন না আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেদায়েত

দান করুন এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা দান করুন আমিন ও

Need a transcript for another video?

Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.

Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact

Recent Transcripts

Browse transcripts generated by our community

Поход по Карпатам.. и неожиданно оказались в Румынии🇷🇴🇪🇺

Поход по Карпатам.. и неожиданно оказались в Румынии🇷🇴🇪🇺

Александр Крапива2,903 words
এক কাঠুরে ও তার অবাধ্য স্ত্রীর কাহিনী || শিক্ষণীয় একটি গল্প || Islamic Voice Bangla

এক কাঠুরে ও তার অবাধ্য স্ত্রীর কাহিনী || শিক্ষণীয় একটি গল্প || Islamic Voice Bangla

Islamic Voice Bangla3,063 words
Caitlin Clark & Sophie Cunningham DESTROY EYE POKER Jacy Sheldon & Marina Mabrey! Indiana Fever WIN!

Caitlin Clark & Sophie Cunningham DESTROY EYE POKER Jacy Sheldon & Marina Mabrey! Indiana Fever WIN!

Basketball Top Stories3,631 words
Прийняли погранці дроном з теплаком. Запілінгували по телефону.

Прийняли погранці дроном з теплаком. Запілінгували по телефону.

UFM16,150 words
41 - XVIII. yy. Siyasi Tarihi 1. Bölüm - Ahmet Uğur KARAKUZA

41 - XVIII. yy. Siyasi Tarihi 1. Bölüm - Ahmet Uğur KARAKUZA

Yediiklim Yayincilik4,668 words
When a girl loves you #love

When a girl loves you #love

LDR Clique184 words
Créer un Avatar Parfait avec ChatGPT en 5 minutes

Créer un Avatar Parfait avec ChatGPT en 5 minutes

The Valere1,320 words
L'erreur No. 1 en Testing ecom (x2 de CVR)

L'erreur No. 1 en Testing ecom (x2 de CVR)

The Valere1,056 words
Gagner 10'000€ avec l'Affiliation en 60 Jours (GUIDE COMPLET)

Gagner 10'000€ avec l'Affiliation en 60 Jours (GUIDE COMPLET)

The Valere5,056 words
GUIDE COMPLET : Gagner 10'000€ par mois (ou plus) avec la Création de Contenu

GUIDE COMPLET : Gagner 10'000€ par mois (ou plus) avec la Création de Contenu

The Valere2,720 words
Mes 3 PIRES Erreurs Business

Mes 3 PIRES Erreurs Business

The Valere1,977 words
De 0 à 10 000€/jour en e-commerce : Je montre TOUT de A à Z

De 0 à 10 000€/jour en e-commerce : Je montre TOUT de A à Z

The Valere9,470 words
3 Astuces pour SCALER à + 1000 € / jour sur FB ads

3 Astuces pour SCALER à + 1000 € / jour sur FB ads

The Valere825 words
GUIDE COMPLET : Devenir Millionaire en partant de 0 (no bullsh*t)

GUIDE COMPLET : Devenir Millionaire en partant de 0 (no bullsh*t)

The Valere8,594 words
Les 4 KPIs pour augmenter ton MRR

Les 4 KPIs pour augmenter ton MRR

The Valere1,561 words
Mon Process entant que CEO

Mon Process entant que CEO

The Valere1,078 words
Tu Stagnes Parce Que Tu Connais MAL Ton Avatar (On Corrige Ça Maintenant)

Tu Stagnes Parce Que Tu Connais MAL Ton Avatar (On Corrige Ça Maintenant)

The Valere4,237 words
Ce SCRIPT m'a rapporté 15,000,000 €

Ce SCRIPT m'a rapporté 15,000,000 €

The Valere325 words
Les 5 SECRETS qui m'ont rendu MILLIONAIRE à 19 ans !

Les 5 SECRETS qui m'ont rendu MILLIONAIRE à 19 ans !

The Valere13,808 words
Scaler son Q4 : Fait ÇA MAINTENANT (ou tu vas perdre de l'argent)

Scaler son Q4 : Fait ÇA MAINTENANT (ou tu vas perdre de l'argent)

The Valere1,167 words