খন্দকের যুদ্ধের প্রস্তুতির সময় চারদিকে ছিল এক কঠিন মুহূর্ত। শত্রুদের আক্রমণ ঠেকাতে মদিনার প্রবেশপথে মুসলমানেরা তখন খন্দক খননে ব্যস্ত। প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের নির্দেশে সাহাবীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বিরামহীন পরিশ্রম করেছিলেন। কারো মুখে অভিযোগ নেই সবার চোখে শুধু দায়িত্ব আর ঈমানের দৃঢ়তা। এভাবেই কাজ চলছিল। কিন্তু হঠাৎ একটি জায়গায় এসে কোদাল থেমে গেল। সামনে উঠে এলো একটি বিশাল শক্ত পাথর। সাহাবীরা বারবার চেষ্টা করলেন, জোরে আঘাত করলেন কিন্তু পাথরটি যেন নড়তেও চায় না। যতই চেষ্টা করা হয় ততই তারা বুঝতে পারলেন এটা তাদের সাধ্যের বাইরে। অবশেষে তারা নবীজির কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর নবী, আমরা একটি শক্ত পাথরের মুখোমুখি [মিউজিক] হয়েছি যা কিছুতেই ভাঙতে পারছি না। নবীজি শান্ত কন্ঠে বললেন, চলো আমি নিজেই গিয়ে দেখি। তখন পরিস্থিতি ছিল খুবই কঠিন। কয়েকদিন ধরে অনেকে না খেয়ে কাজ [মিউজিক] করছিলেন। ক্ষুধা আর ক্লান্তি সবকিছু সহ্য করেও তারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরিশ্রম করে যাচ্ছিলেন। নবীজি নিজেও সেই কষ্টের অংশীদার ছিলেন। তিনি হাতে একটি কোদাল নিয়ে পাথরের কাছে দাঁড়ালেন। অতঃপর আল্লাহর নাম নিয়ে পাথরের উপর আঘাত করলেন। এক আঘাতেই সেই শক্ত পাথর আলোর ঝলকানি দিয়ে ভেঙে যেতে লাগল। আরেকটি আঘাতে তা টুকরো টুকরো হয়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে সাহাবীরা বিষয়ে অভিভূত হয়ে গেলেন। তাদের মধ্যে একজন সাহাবী ছিলেন জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু। তিনি গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন নবীজি নিজেও ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছেন এমনকি তিনি পেটে পাথর বেঁধে কাজ করছেন। এই দৃশ্য তার অন্তরকে নাড়িয়ে দিল। ভালোবাসা আর কষ্ট মিশ্রিত অনুভূতিতে তার মন অস্থির হয়ে উঠলো। তিনি মনে মনে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন আজ আমি যেভাবেই হোক আমার প্রিয় নবীকে আমার বাড়িতে নিয়ে গিয়ে খাবার খাওয়াবো। অতঃপর জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু দ্রুত নিজের ঘরের দিকে রওনা হলেন। তার মনে তখন একটাই চিন্তা প্রিয় নবীজির জন্য কিছু করা। ঘরে ঢুকেই তিনি তার স্ত্রীকে বললেন, বলতো ঘরে কি কোন খাবার আছে? [গান গাওয়া][মিউজিক] আজকে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের ক্ষুধার কষ্ট দেখেছি। আমি এই দৃশ্য সহ্য করতে পারতেছি না। আমি চাই অন্তত একবেলা তাকে নিজের ঘরে খাবার খাওয়াতে। [মিউজিক] তার স্ত্রী একটু চিন্তিত মুখে একটি পাত্র থেকে অল্প কিছু জব বের করে বললেন, ঘরে তো এই সামান্য জব ছাড়া আর কিছুই নেই। সাহাবী জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেমে থাকলেন না। তিনি দৃঢ় কন্ঠে বললেন, ঠিক আছে তুমি এগুলো পিশে আটা বানাও এবং রুটি তৈরি শুরু করো। তারপর কিছুক্ষণ চিন্তা করে মনে মনে বললেন, শুধু রুটি হলে কেমন হয়? যদি আর কিছু ব্যবস্থা করা যেত তাহলে আল্লাহর নবী আরো খুশি হতেন। হঠাৎ তার মনে পড়ল তাদের [মিউজিক] কাছে একটি মোটা সোটা তাজা ছাগল আছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন এই ছাগলটাই জবাই করব এবং এর গোস্ত রান্না করে নবীজিকে মেহমানদারী করাবো। সেই সময় জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দুইজন পুত্র ছিল। বড় পুত্রের নাম আব্দুর রহমান ইবনে জাবের যার বয়স ছিল আট নয় বছর। তিনি তার বড় ছেলে আব্দুর রহমান ইবনে জাবেরকে নিয়ে ছাগলটি জবাই করলেন এবং বাড়ির লোকজনকে রান্নার প্রস্তুতি নিতে বললেন। তারপর তিনি সময় নষ্ট না করে আবার দ্রুত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামের কাছে ফিরে গেলেন। নবীজির সামনে উপস্থিত হয়ে তিনি বিনয়ের সাথে সালাম দিলেন এবং নরম কন্ঠে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমি একজন সাধারণ মানুষ। আমার কাছে তেমন কিছু নেই। কিন্তু আমার বহুদিনের একটি ইচ্ছা আপনাকে আমার ঘরে দাওয়াত দেওয়া। যদি আপনি আমার এই দাওয়াত কবুল করেন তবে আমার মনের এই আশা পূর্ণ হবে। নবীজি জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর কথা শুনে মুচকি হেসে চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাহাবীদের দিকে তাকালেন। অতঃপর তাদের ডেকে বললেন, "হে আমার সাহাবীরা, জাবের আমাদের তার ঘরে খাবারের দাওয়াত দিয়েছে। আমি তার দাওয়াত গ্রহণ করেছি। যোহরের নামাজের পর আমরা সবাই তার বাড়িতে যাব। [মিউজিক] এই কথা শুনে সাহাবীদের মুখে আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠলো। দীর্ঘদিনের কষ্ট আর ক্ষুধার মাঝেও এই দাওয়াত যেন এক প্রশান্তির খবর হয়ে আসলো। এদিকে জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু আনন্দে আত্মহারা। তিনি দ্রুত ঘরের দিকে রওনা হলেন। কিছুদূর যেতেই হঠাৎ তার মনে এক গভীর চিন্তার সঞ্চার হলো। তিনি চিন্তা করে দেখলেন এখানে তো কত শত সাহাবী আছেন। আমার ঘরে তো এত খাবার নেই। আমি কিভাবে সবাইকে খাওয়াবো? মুহূর্তেই তার আনন্দ দুশ্চিন্তায় রূপ নিল। দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে তিনি আবার ফিরে এলেন নবীজির কাছে এসে বিনয়ের সাথে বললেন হে আল্লাহর নবী আমি তো ভেবেছিলাম আপনি কয়েকজন সাহাবী নিয়ে আসবেন| কিন্তু আপনি তো সবাইকে দাওয়াত দিয়েছেন আমি তো নিতান্তই গরীব কিভাবে তাদের মেহমানদারী করব নবীজি তার কথা শুনে মৃদু হাসি দিয়ে বললেন হেজাবের বরকতের মালিক তো আল্লাহ তুমি কোন চিন্তা করিও না বাড়ি ফিরে যাও এবং খাবারের প্রস্তুতি নাও অতঃপর নবীজি জানতে চাইলেন তুমি কি কি খাবারের ব্যবস্থা করেছ সাহাবী জাবের বিনয়ের সাথে উত্তর দিলেন, ঘরে সামান্য জব আছে আর একটি খাসি জবেহ করেছি। এগুলো দিয়েই কিছু করার চেষ্টা করছি। নবীজি তখন তাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিলেন। তিনি বললেন, একটি কথা মনে রেখো গোস্ত যখন রান্না করবে তখন হাড়ির ঢাকনা শক্ত করে বন্ধ রাখবে। আর আটা মাখানোর পরে তা কিছুক্ষণ একটি পাত্রে ঢেকে রাখবে। নবীজি আরো নির্দেশ দিলেন যে খাবার যেন আগেভাগে অস্থিরভাবে পরিবেশন না করা হয় এবং আমি না আসা পর্যন্ত কোন পাত্রের ঢাকনা খুলবে না। এই নির্দেশনা শুনে জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু স্বস্তি পেলেন। এবং তিনি খুশি মনে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। এদিকে ঘরের ভেতরে ভিন্ন একটি দৃশ্য। জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর ছোট ছেলে ঘরে ঘুমিয়েছিল। তার নাম মোহাম্মদ ইবনে জাবের। হঠাৎ সে ঘুম থেকে জেগে চোখ মুছতে মুছতে [মিউজিক] চারদিকে তাকালো। অতঃপর তার মনে পড়লো তার প্রিয় সঙ্গী সেই ছাগলটির কথা যার সঙ্গে সে সবসময় খেলত মোহাম্মদ ইবনে জাবের তাড়াহুড়া করে ঘরের ভেতরে ও বাইরে খুঁজতে লাগলো [মিউজিক] কিন্তু কোথাও ছাগলটিকে পেল না তার ছোট্ট মনে অস্থিরতা জন্ম নিল অতঃপর সে তার বড় ভাই আব্দুর রহমান ইবনে জাবেরের কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল ভাই আমাদের ছাগলটি কোথায় আমি তো তাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না আব্দুর রহমান শান্তভাবে উত্তর দিল তুমি তো তখন ঘুমাচ্ছিলে তাই জানো আব্বাজান আজকে সেটাকে জবাই করে দিয়েছেন। এই কথা শুনে ছোট ভাই থমকে গেল। অবাক চোখে সে বলল, কোথায় জবাই করেছে আমাকে দেখাও। [মিউজিক] অতঃপর আব্দুর রহমান তাকে নিয়ে গেল বাড়ির পিছনের সেই জায়গায় যেখানে ছাগলটিকে জবাই করা হয়েছিল। সেখানে পৌঁছে ছোট ভাই কৌতুহল ভরে বলল, আমাকে দেখাও তো কিভাবে জবাই করেছিলে। অবুঝ আব্দুর রহমান যার বয়স তখন মাত্র আট-য় বছর। খেলার ছেলে বলল, দেখতে চাইলে তুমি এখানে মাটিতে [মিউজিক] শুয়ে পড়ো। ছোট ভাই যার বয়স তিন চার বছরের বেশি নয় নিষ্পাপ মনে কোন কিছু না ভেবেই মাটিতে শুয়ে পড়ল সে বুঝতেই পারল না যে সামনে কি ভয়ানক ঘটনা অপেক্ষা করছে খেলার চলেই আব্দুর রহমান একটি ছুরি হাতে নিল আর সেই অবুঝ মুহূর্তেই সে তার ছোট্ট ভাইয়ের গলায় [মিউজিক] ছুরি চালিয়ে দিল মুহূর্তের মধ্যে ছোট ভাইয়ের গলা কেটে গেল রক্ত ফোয়ারার মতো বের হতে লাগল ছোট্ট দেহটি কাঁপতে কাঁপতে ছটফট করতে লাগল এই ভয়ানক দৃশ্য দেখে আব্দুর রহমান একেবারে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। তার ছোট্ট মনে আতঙ্ক যেন ঝড়ের মত আঘাত করল। ঠিক সেই সময় জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু রাস্তা দিয়ে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলেন। দূর থেকে পিতার আগমনের সব দোকানে আসতেই আব্দুর রহমান আরো আতঙ্কিত হয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল। কি করবে বুঝতে না পেরে সেখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে গিয়ে একটি খেজুর গাছে উঠে লুকিয়ে পড়ল। এবং গাছের উপর চুপচাপ বসে রইল যেন কেউ তাকে দেখতে না পায়। [মিউজিক] এদিকে জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ঘরে ফিরে তিনি তার স্ত্রীকে নবীর দাওয়াত কবুলের সংবাদ শোনালেন। তার স্ত্রীও আনন্দিত হয়ে রান্নাবান্না করার প্রস্তুতিতে লেগে পড়লেন। কিছুক্ষণ পরে হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু পুত্রদের খোঁজে বাড়ির পিছনে সেই জায়গায় পৌঁছাতে হঠাৎ তার চোখ পড়লো মাটিতে পড়ে থাকা ছোট্ট [মিউজিক] সন্তানের দিকে। দৃশ্যটি দেখে তিনি যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন তার নিষ্পাপ ছেলে মাটিতে ছটফট করছে। তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে গেলেন সন্তানের কাছে। বুকে তুলে নিলেন তাকে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ হয়ে গেছে। তার ছোট্ট সন্তান শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। তার ক্ষুদ্র দেহটি নিথর ঠান্ডা হয়ে গেছে। এই দৃশ্য সহ্য করা একজন বাবার পক্ষে কতটা কঠিন তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর অন্তর যেন টুকরো টুকরো হয়ে গেল। তিনি তার প্রিয় সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুশিক্ত কন্ঠে কাঁদতে লাগলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেকে সামলে নিলেন। ঈমানের শক্তিতে নিজের ভেঙে পড়া মনকে সান্ত্বনা দিলেন। অতঃপর ধীরে ধীরে সন্তানের নিথর দেহ কোলে তুলে নিয়ে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন। বাড়িতে পৌঁছে জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু কাঁপা কাপা কন্ঠে তার স্ত্রীকে ডেকে বললেন, তাড়াতাড়ি একটি কম্বল নিয়ে আসো। বাচ্চাটিকে শুইয়ে দেই। রান্নাঘর থেকে তরিঘড়ি করে বেরিয়ে এসে উৎকন্ঠিত হয়ে তার স্ত্রী বললেন, কি হয়েছে তুমি কাঁদছো কেন? আমাদের আদরের সন্তানের কি হয়েছে? জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। কান্না ভেজা চোখে তিনি বললেন, "হে আমার বিবি, আমাদের প্রিয় সন্তান আর এই দুনিয়াতে নেই। সে আমাদেরকে ছেড়ে চিরতরে চলে গেছে। এই কথা শুনে তার স্ত্রী যেন ভেঙে পড়লেন। বুক ফাটা কান্নায় তিনি বলে উঠলেন, এটা হতে পারে না। আমি বিশ্বাস করতে পারছি না আমার আদরের সন্তান আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু নিজেকে শক্ত করলেন। তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বললেন, ধৈর্য ধরো নিজেকে সামলাও এখন কেঁদো না। একটুও কেঁদো না। আজ আমাদের শোক প্রকাশ করার দিন নয়। আজ দুঃখ দেখলে নবীজি দুঃখিত হবেন। অতএব ধৈর্য ধরো কষ্ট করে হলেও মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলো। এই কথা শুনে তার স্ত্রী বিষয়ে তাকিয়ে রইলেন। জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু আবার বললেন, আজ আমাদের প্রিয় নবীজি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম আমাদের ঘরে আসছেন। তিনি আমাদের দাওয়াত গ্রহণ করেছেন। আর [মিউজিক] ঠিক আজকেই আমাদের এই কঠিন পরীক্ষা এলো। আমাদের সন্তান আমাদের ছেড়ে চলে গেল। হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর কন্ঠ ভারী হয়ে এলো। তবুও তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রেখে বললেন, আমরা এটা মেনে নিতে পারছি না। কিন্তু মনে করো এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় আমাদের ধৈর্য ধরতেই হবে। >> [নাক ডাকা] >> তিনি আরো বললেন যদি আমরা এখন ভেঙে পড়ি কান্নায় [মিউজিক] ভেসে যাই তাহলে এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবো না। আজ নবীজি আমাদের ঘরে আসবেন যদি তিনি আমাদের এই অবস্থা দেখেন হয়তো তিনি খাবার গ্রহণ করবেন না। অতঃপর গভীর আবেগ ভরা কন্ঠে বললেন আমরা আমাদের সন্তান হারিয়ে দুঃখ পেতে পারি এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের প্রিয় নবীজির মনে কষ্ট দিতে পারি না। অতঃপর তিনি স্ত্রীর হাত [মিউজিক] ধরে বললেন, নিজেকে সামলাও, ধৈর্য ধরো আর দ্রুত খাবারের প্রস্তুতি সম্পন্ন করো। তারপর তারা দুজনে ছোট্ট ছেলেকে কম্বলে মুড়িয়ে রান্নাঘরের পেছনে [মিউজিক] রেখে আসলেন। এবং স্ত্রী রান্নার কাজে মন দিলেন। অতঃপর হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বের হলেন বড় পুত্র আব্দুর রহমানের খোঁজে। [মিউজিক] বাড়ির পেছনে গিয়ে ছেলের নাম ধরে জোরে ডাক দিলেন। গাছের উপর আত্মগোপন করা বড় ছেলে সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করছিল আর বয়ে কাঁপছিল। পিতার ডাক শুনে ভাবল, এখন পালাতে না পারলে পিতার হাতে ধরা পড়তে হবে। ধরা পড়লে আর রক্ষা থাকবে না। আব্দুর রহমান পালানোর উদ্দেশ্যে গাছ থেকে তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে পা দুটো পিছলিয়ে নিচে পড়ে যায় এবং নিচে থাকা পাথরের সাথে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে সেও মৃত্যুর কোলে ডলে পড়ে। জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু পিছনে কিছু একটা পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতেই পিছনে তাকিয়ে দেখলেন তার বড় পুত্র আব্দুর রহমান ছটফট করছে। তিনি দৌড়ে গিয়ে সন্তানকে কোলে তুলতেই তিনি দেখলেন আব্দুর রহমানের দেহে প্রাণের স্পন্দন নেই। সেও দুনিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছে। জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর বুঝতে বাকি রইল না প্রকৃত ঘটনা কি ঘটেছিল। অল্প কিছু সময়ের ব্যবধানে তার আদরের দুই সন্তান পৃথিবী থেকে চলে গেল। তিনি সন্তানের লাশ বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। [মিউজিক] হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু নিজেকে সামলে নিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন। বাড়ির ভেতরে পৌঁছে কান্নাজড়িত কন্ঠে স্ত্রীকে বললেন, বিবিগো আরো একটি কম্বল নিয়ে আসো। আমাদের বড় ছেলে আর এই দুনিয়াতে নেই। বড় ছেলের এই অবস্থা দেখে জননী পুনরায় আর্তনাত করে উঠলেন। স্বামী তাকে পুনরায় সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, ধৈর্য ধরো আজ আমাদের দুঃখ প্রকাশের দিন নয়। আজ আমাদের পরম আনন্দের দিন। দয়াল নবীজি অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের ঘরে তাশরীফ রাখবেন। অতঃপর দুজনে মিলে বড় ছেলের লাশ কম্বলে মুড়িয়ে রান্নাঘরের পিছনে ছোট ছেলের লাশের পাশে রাখলেন। এরপর স্বামী স্ত্রী দুজনে তাদের চোখের পানি মুছে মুখে হাসি ফুটিয়ে তুললেন। হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু তার স্ত্রীকে বললেন, তুমি রান্নার কাজে মন দাও। যোহরের আজান হয়ে গেছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই নবীজি আমাদের বাড়িতে চলে আসবেন। অতঃপর জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যোহরের নামাজ আদায় করে বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেন। অন্তরে এক অদ্ভুত আনন্দ এবং অপেক্ষার অনুভূতি। প্রিয় নবীজির আগমনের প্রতীক্ষায় তিনি পথের দিকে তাকিয়ে রইলেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই নবীজিকে উটের পিঠে করে আসতে দেখা গেল এবং পেছনে সাহাবীদের লম্বা কাতার দেখা যাচ্ছিল। হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু আনন্দে আত্মহারা হয়ে দৌড়ে নবীজির সামনে চলে এলেন। তিনি তার প্রিয় নবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লামকে বিনয়ের সাথে সালাম দিলেন এবং বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ আমাদের বাড়িতে আপনাকে স্বাগতম। অতঃপর তিনি নবীজির উটের কাছে গিয়ে তাকে বাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে আনলেন এবং তার স্ত্রীকে ডেকে বললেন, আল্লাহর রাসূল আমাদের বাড়িতে এসেছেন তাড়াতাড়ি খাবারের ব্যবস্থা করো। নবীজি জাবেরের ঘরের সামনে উট থামিয়ে তার ডান পা মোবারক মাটিতে রাখলেন। বাম পা মোবারক এখনো নামাতে বাকি। এই সময় হযরত জিব্রাইল আলাইহিস সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ নিয়ে এসে নবীকে সালাম জানালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ এনেছি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন, আজকে যখন আপনি জাবেরের বাড়িতে খাবার খেতে বসবেন, তখন যেন আপনি জাবেরের দুই পুত্রকে নিয়ে তাদের সাথে বসে খাবার খাবেন। এই কথা বলে ফেরেশতা জিবরাঈল আলাইহিস সালাম চলে গেলেন। অতঃপর নবীজি সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে জাবেরের ঘরে [মিউজিক] তাশরীফ রাখলেন। জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বাড়িতে বসার জন্য ব্যবস্থা করলেন। তাদের সামনে দস্তরখান বিছিয়ে দিলেন। কিছু সাহাবীকে বাড়ির ভেতরে বসালেন এবং বাকি সাহাবীদের উঠোনে বসালেন। জাবেরের স্ত্রী রুটির পাত্র এবং গোশতের পাত্র নিয়ে নবীর সামনে রাখলেন। অতঃপর জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বিনীতভাবে বললেন হে আল্লাহর নবী আপনার নির্দেশ অনুযায়ী গোশত রান্না করা হয়েছে। আপনি অনুগ্রহ করে দেখে বলুন সবকিছু ঠিক হয়েছে কিনা। অতঃপর নবীজি খাবারের বরকতের জন্য দোয়া করলেন। দোয়া শেষে নবীজি বললেন হে জাবের তুমি এই পাত্র দুটি ঘরের ভেতরে নিয়ে যাও। আর সেখান থেকেই সবার মাঝে পরিবেশন করো। আর মনে রেখো প্রতিবার গোস্ত ও রুটি নেওয়ার পরে পাত্রগুলো ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখবে। অতঃপর নবীজির নির্দেশ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে খাবারগুলো পরিবেশন করার জন্য মেহমানদের সামনে হাজির [মিউজিক] করলেন। তারপর জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু নবীজিকে আরজ করলেন ইয়া রাসুলুল্লাহ দয়া করে খানা শুরু করুন। নবীজি বললেন, হে জাবের তোমার ছেলেরা কোথায়? তাদেরকে ডাকো। আমরা সবাই তাদের সাথে বসে খাবার খাবো। হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু বললেন, হে আল্লাহর নবী, আপনি দয়া করে খেয়ে নিন। ছেলেদেরকে আমি পরে ডাকবো। আল্লাহর রাসূল পুনরায় বললেন, তোমার ছেলেদের ডেকে নিয়ে এসো। আমি তাদেরকে সাথে নিয়ে খানা খাবো। জাবের কিছুক্ষণ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে নীরব থাকলেন। কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। [মিউজিক] তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম বললেন, জাবের তুমি বুঝতেছো না। [মিউজিক] তোমার বাচ্চাদের সাথে খাবার খাওয়া আমার ইচ্ছা। স্বয়ং আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা। এখন তুমি দেরি করো না। তাড়াতাড়ি তোমার বাচ্চাদের আমার কাছে নিয়ে এসো। এমন পরিস্থিতিতে এখন সে কি করবেন [মিউজিক] কিছুই যেন বুঝতে পারছিল না। কিভাবে সে তার সন্তানদেরকে নবীজির কাছে নিয়ে আসবেন। তার দুই সন্তান তো অনেক আগেই ইন্তেকাল করেছেন তাদের লাশ রান্নাঘরের পেছনে রাখা। এই কথা ভেবে হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এবং তার স্ত্রী পুনরায় হাত জোড় করে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ আপনি খানা খেয়ে নিন। আমরা তাদের পরে ডেকে দিচ্ছি। তখন নবীজি বললেন হে জাবের কিছুক্ষণ পূর্বে জিব্রাইল আলাইহিস সালাম আমাকে আল্লাহর নির্দেশ জানিয়ে গিয়েছেন আমি যেন তোমার ছেলেদেরকে সঙ্গে নিয়ে খানা খাই। নবীজির এই কথা শুনে হযরত জাবের এবং তার স্ত্রী আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলেন না। তারা চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে সমস্ত ঘটনা খুলে বললেন, অতঃপর [নাক ডাকা] চোখ মুছতে মুছতে বললেন, তারা আমাদের ছেড়ে এই পৃথিবী থেকে চলে গেছে। তাদের লাশ রান্না ঘরের পিছনে রাখা। [মিউজিক] তাদেরকে আমি কিভাবে ডাকবো? হে আল্লাহর নবী আপনি খানা শুরু করুন। এই কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম কিছু সময় চুপ করে রইলেন। তারপর [নাক ডাকা] তিনি জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন, হে জাবের তুমি খুব নেককার এবং মহব্বতকারী একজন পিতা। আমি আগে জানতাম না তোমার সন্তানেরা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। তবুও তুমি আমাকে খাবারের জন্য ডেকেছো। তুমি আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছো। তুমি [মিউজিক] সত্যিই আমাকে খুব ভালোবাসো। তোমার ঈমান ও ধৈর্যে আল্লাহ খুশি হয়েছেন। অতঃপর নবীজি জাবেরকে বললেন তোমার ছেলেদের কাছে গিয়ে বল আল্লাহর নবী তাদের ডাকছেন। হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু নবীজির নির্দেশ মোতাবেক ছেলেদের লাশের সামনে গিয়ে দুই ছেলের নাম ধরে ডেকে বললেন আল্লাহর নবী তোমাদেরকে ডাকছেন তোমরা উঠো। সঙ্গে সঙ্গেই তারা দুজন আল্লাহু আকবার বলে দাঁড়িয়ে গেল। দুই পুত্রের রুহ তাদের শরীরে ফিরে এলো এবং তারা জীবিত হয়ে গেল। এই দৃশ্য দেখে জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু এবং তার স্ত্রী বিস্ময় হতবাক হয়ে গেলেন এবং তারা আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানালেন। [মিউজিক] অতঃপর তারা দুই ভাই নবীজির কাছে দৌড়ে চলে গেল। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহার দুই পুত্রকে স্নেহ ভরে তার দুই পাশে বসালেন। এরপর তিনি সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, "হে সাহাবীগণ, আজ তোমরা তৃপ্তি সহকারে খাবার খাও, যত খুশি গোস্ত খাও, যত খুশি রুটি খাও। তবে হাড়গুলো চিবিয়ে খাবে না বরং চুষে রেখে দিও। এই কথা বলে নবীজি মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর দুই সন্তানকে সাথে নিয়ে খাবার খাওয়া শুরু করলেন। [মিউজিক] হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে একের পর এক সাহাবীদের সামনে গোস্ত এবং রুটি পরিবেশন [মিউজিক] করতে লাগলেন এবং প্রত্যেকে তৃপ্তি সহকারে খাবার খেতে লাগলেন। অতঃপর যখন সকল সাহাবী পেট ভরে তৃপ্তি সহকারে খাওয়া শেষ করলেন। তখন নবীজি হযরত জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুকে বললেন, হে জাবের এখন তুমি রুটি এবং গোশতের পাত্রগুলোর ঢাকনা খোলো। জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে পাত্রগুলোর ঢাকনা খুললেন। ঢাকনা খুলতেই তিনি বিষয়ে হতবাক হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন এক টুকরো গোশতও কমেনি এবং রুটিগুলো আগের মতোই পরিপূর্ণভাবে রয়েছে। এই দৃশ্য দেখে তার অন্তর কেঁপে উঠলো। তিনি বুঝতে পারলেন এটা আল্লাহর অসীম বরকত। এরপর নবীজি বললেন, হে জাবের গোস্ত খাওয়ার হারগুলো আমার সামনে নিয়ে আসো। জাবের রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু সবগুলো হার সংগ্রহ করে নবীজির সামনে এনে রাখলেন। নবীজি সেগুলোর দিকে তাকিয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। দোয়া শেষে ঘটলো এক অলৌকিক ঘটনা। সেই হারগুলোর মধ্য থেকে জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর ছোট্ট ছেলের সেই প্রিয় ছাগলটি জীবিত হয়ে উঠে দাঁড়ালো এবং দৌড়ে চলে গেল। জাবের রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু এই দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে গেলেন। তিনি অনুভব করলেন আল্লাহর কুদরত সীমাহীন। তিনি চাইলে সবকিছুই সম্ভব। পরদিন আবার খন্দকের কাজে সবাই ফিরে গেলেন। কিন্তু আজ তাদের মধ্যে ছিল অন্যরকম শক্তি। সাহাবীরা একে অপরকে বলছিলেন, আমরা নিজের চোখে দেখেছি মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সাথে আছেন। ক্ষুধা কষ্ট আর ভয় সবকিছু যেন হালকা হয়ে গেল। কারণ তাদের ঈমান আরো দৃঢ় হয়ে গেছে। খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানরা কাফেরদের 10000 সৈন্যের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে মাত্র 3000 সৈন্য নিয়ে অবস্থান নেন। সংখ্যা ও শক্তির দিক থেকে পার্থক্য ছিল বিশাল। তবুও ঈমানের দৃঢ়তায় মুসলমানরা অটল ছিলেন। চারদিক থেকে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও তারা আল্লাহর উপর পূর্ণ ভর্সা রাখেন। আর আল্লাহর গায়েবী সাহায্যের মাধ্যমে শত্রুদের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি হয় এবং তাদের পরিকল্পনা ভেঙে যায়। অবশেষে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। ফলে মুসলমানরা আল্লাহর রহমত ও সাহায্যের মাধ্যমে বিজয় লাভ করেন।
Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.
Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact