একটা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। বিয়ের সময় মানুষ কি খোঁজে? সম্পদ, সৌন্দর্য, বংশ, পরিচিতি এই চারটের কথা সবাই বলে। বাবা বলেন, মা বলেন, পাড়ার মানুষ বলেন, ছেলের বাড়ি দেখো, ঘর দেখো, গাড়ি আছে কিনা দেখো। কিন্তু একটা জিনিসের কথা কেউ বলে না। দ্বীন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নারীকে চারটি কারণে বিয়ে করা হয়। তার সম্পদ তার বংশ তার সৌন্দর্য এবং তার দ্বীনদারি তুমি দ্বীনদারিকে প্রাধান্য দাও তোমার হাত ধুলোই মাখুক বুখারী ও মুসলিম তোমার হাত ধুলোই মাখুক মানে দ্বীন ছাড়া বাকি সব বেছে নিলে তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই কথাটা নবীজি বলেছেন কিন্তু আমরা কতটুকু মানছি আজকের গল্পটা এমন একটা মেয়ের গল্প যেই সত্যটা বুঝেছিল যখন সবাই ভুল করছিল সে একা ঠিক পথে ছিল আর সেই সত্যটা বোঝার জন্য তাকে একটা বড় মূল্য দিতে হয়েছিল। পরিবারের রাগ, সমাজের কথা, বছরের পর বছরের কষ্ট। কিন্তু শেষে আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা সেই মেয়ে কখনো কল্পনাও করেনি। পুরো গল্পটা শুনুন। কারণ এই গল্পে একটাই প্রশ্ন আছে। তুমি কোনটা বেছে নেবে? দুনিয়ার চাকচিক্য নাকি আল্লাহর সন্তুষ্টি? অনেকদিন আগের কথা। হিজাজের এক শহরে এক বনিকের পরিবার ছিল। পরিবারের কর্তা কাজী ইব্রাহিম। সৎ মানুষ। পাড়ায় সম্মান আছে। তার তিন মেয়ের মধ্যে মেজো মেয়ে মরিয়ম। বয়স 20 এর কাছাকাছি। চেহারায় সারল্য। চোখে বুদ্ধির আলো। কথা কম বলেন কিন্তু যা বলেন ভেবে বলেন। মরিয়ম ছোটবেলা থেকে দ্বীনদার। নামাজ কখনো ছাড়েননি। মায়ের কাছে কুরআন শিখেছেন প্রতিবেশীর কাজে সাহায্য করেন একটা ছোট্ট অভ্যাস ছিল তার প্রতিদিন ঘুমানোর আগে জিজ্ঞেস করতেন নিজেকে আজকে কি আল্লাহ আমার উপর সন্তুষ্ট যদি মনে হতো কোথাও ভুল হয়েছে তওবা করে ঘুমাতেন এই অভ্যাসটা মাকে একদিন বলেছিলেন মা হেসে বলেছিলেন তুই এত ভাবিস মরিয়ম বলেছিলেন আম্মু একদিন তো চলে যেতে হবে সেদিন কি নিয়ে যাব মা চুপ হয়ে গিয়েছিলেন পাড়ার মানুষ বলতো, কাজী ইব্রাহিমের মেজো মেয়েটা বড় ভালো। ঘরে থাকলে বরকত থাকে। মরিয়ম এসব কথা শুনে লজ্জা পেতেন, মাথা নিচু করতেন। কারণ তিনি জানতেন, প্রশংসা মানুষকে অহংকারী করে তোলে। আল্লাহর কাছে নিজেকে ছোট রাখাই নিরাপদ। >> [মিউজিক] >> একদিন কাজী ইব্রাহিম মেয়েকে ডাকলেন মরিয়ম তোমার বিয়ের প্রস্তাব এসেছে মরিয়ম মাথায় নিচু করে বসলেন বুকের ভেতরে একটা কম্পন কাজী ইব্রাহিম একটু থামলেন মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন এই মেয়েটার মধ্যে একটা জিনিস আছে যা তিনি সহজে ব্যাখ্যা করতে পারেন না একটা স্থিরতা একটা বিশ্বাস মরিয়ম আসলে প্রস্তাব দুটো এসেছে দুজন প্রায় একই সময় পাঠিয়েছে মরিয়ম মাথা তুললেন বল আব্বা কাজেই ইব্রাহিম বললেন প্রস্তাব দুটো প্রথমজন আবু সুফিয়ান বড় ব্যবসায়ীর ছেলে শহরে তার পরিবারের নাম আছে বিশাল বাড়ি উট ভর্তি কাফেলা বাজারে বড় দোকান দেখতেও ভালো বয়সও ঠিক আবু সুফিয়ান নিজে এসে প্রস্তাব দিয়েছে বলেছে মরিয়মকে রানীর মতো রাখবে যা চাইবে তাই পাবে কাজী ইব্রাহিমের চোখে আসার আলো পাড়ার মানুষ এই বিয়ের কথা শুনলে কি বলবে সেটা ভাবতেই মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি একটা কথা বললেন না মেয়েকে। আবু সুফিয়ান নামাজ পড়ে না। পাঁচ ওয়াক্ত তো দূরের কথা। জুমার নামাজেও তাকে মসজিদে দেখা যায় না। হয়তো বিয়ের পরে ঠিক হয়ে যাবে। কাজী ইব্রাহিম মনে মনে এই আশাটুকু রাখলেন। দ্বিতীয় জন সালেহ। পাড়ার একজন সাধারণ মানুষ। ছোট্ট একটা দোকান আছে। তেমন সম্পদ নেই। কিন্তু পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কখনো ছাড়েন না। মসজিদে সবার আগে আসেন। সবার শেষে যান। মানুষের সাথে সদাচরণ করেন। মিথ্যা বলেন না কখনো। পাড়ার বয়স্ক মানুষেরা তাকে পছন্দ করেন কাজী ইব্রাহিম একটু থামলেন সালেহ ভালো ছেলে কিন্তু সম্পদ নেই তোমাকে কষ্ট করতে হবে মরিয়ম বললেন আব্বা আবু সুফিয়ান নামাজ পড়েন কাজী ইব্রাহিম একটু থামলেন সে পড়বে বিয়ের পরে মানুষ বদলায় মরিয়ম কিছু বললেন না শুধু বললেন আব্বা আমাকে একটু সময় দাও সেই রাতে মরিয়ম দীর্ঘ সময় নামাজ পড়লেন ইস্তেখারা করলেন সিজদায় বললেন ইয়া আল্লাহ তুমি জানো আমার জন্য কোনটা ভালো? আমি দুনিয়া চাই না। তুমি আমাকে সেই মানুষটা দাও যার সাথে আখেরাতে তোমার কাছে যেতে পারবো। পরদিন সকালে মরিয়ম বাবার কাছে গেলেন। আব্বা আমি সালেহকে বেছে নিয়েছি। কাজী ইব্রাহিম অবাক হলেন। কি বললে? সালেহ আমি সালেহকে বিয়ে করতে চাই। ঘরে একটা নিঃশব্দ নেমে এল। কাজী ইব্রাহিম রাগ করলেন না। কিন্তু মা করলেন। মরিয়ম তুই কি বলছিস? আবু সুফিয়ানের মত পাত্র আর পাবি না সে তোকে কিভাবে রাখবে জানিস বড় মারি দাসী থাকবে কোন কষ্ট করতে হবে না সালেহের কাছে কি আছে ছোট্ট একটা দোকান তুই কষ্ট করবি মরিয়ম শান্তভাবে পড়লেন আম্মু আবু সুফিয়ান নামাজ পড়েন না মা একটু থামলেন বিয়ের পরে পড়বে মানুষ বদলায় আম্মু বিয়ে করে মানুষ বদলায় না সে যা তাই থাকে বরং মানুষ বিয়ের পরে আরো প্রকাশিত হয় মা আর কথা বলতে পারলেন না কিন্তু মন বদলালেন না। বড় বোন বলল মরিয়ম পাগল হয়েছিস। আবু সুফিয়ান কত ভালো ঘরের ছেলে। সবাই কি বলবে? পাড়ার মানুষ হাসবে। সবাই কি বলবে এই কথাটা কতজনের জীবন নষ্ট করেছে। কতজন ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু সবাই কি বলবে ভেবে? মরিয়ম বড় বোনের দিকে তাকালেন। আপা কিয়ামতের দিন আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তুমি কেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে? সেদিন কি বলব? পাড়ার মানুষ কি বলবে ভেবেছিলাম? বড় বোন চুপ হয়ে গেলেন পাড়ার মানুষও কথা বলল কাজী ইব্রাহিমের মেয়ে এত ভালো প্রস্তাব ফিরিয়ে দিল গরীব ছেলেকে বিয়ে করবে বুদ্ধি আছে মেয়েটার মরিয়ম সব শুনলেন কারো সাথে তর্ক করলেন না শুধু মায়ের হাত ধরলেন আম্মু আল্লাহর উপর ভরসা রাখো তিনি রিজিক দেন মানুষ দেয় না আর দ্বীনদার মানুষ পেলে আল্লাহ নিজে সব দেন শেষ পর্যন্ত কাজী ইব্রাহিম রাজি হলেন তিনি বুঝলেন মেয়ে ভুল করছে না কিন্তু পরিবারের বাকিরা রাজি হলেন বিয়েতে এলেন কিন্তু মনে মনে বললেন দেখা যাক কতদিন টিকে। বিয়ে হয়ে গেল। কাজী ইব্রাহিমের মেজো মেয়ের ঠিকানা হলো শহরের শেষ প্রান্তের এক জরাজীর্ণ গলি। সালেহের ঘরটা ছিল ঠিক যেমনটা মরিয়ম কল্পনা করেছিলেন। অত্যন্ত সাধারণ। মাটির দেওয়াল, মাথার ওপর খেজুর পাতার ছাউনি। আসবাব বলতে একটা কাঠের চৌকি, কয়েকটা মাটির হাড়ি আর কোনায় রাখা একটা পুরনো জায়নামাজ। বড় বোন মরিয়মকে পৌঁছে দিতে এসে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। দেওয়ালের ছ্যাততে ভাব দেখে তিনি ফিসফিস করে বলেছিলেন, মরিয়ম এখনো সময় আছে। তুই চাইলে আব্বাকে বলতে পারি। এই অভাবের ঘরে তুই কতদিন টিকবি? মরিয়ম শুধু হেসেছিলেন। এক টুকরো শান্ত হাসি। তিনি জানতেন বড় বোন যা দেখছেন তা হলো কেবল দেওয়াল আর ছাদ কিন্তু মরিয়ম যা দেখছেন তা হলো একটা জান্নাতি বাগান গড়ার সুযোগ প্রথম কয়েকটা দিন মরিয়মের জন্য সহজ ছিল না বাবার বাড়িতে দাসী চাকর ছিল নরম বিছানা ছিল আর এখানে তাকে নিজ হাতে কু থেকে পানি তুলতে হয় যাতা দিয়ে আটা পেশাতে হয় হাত দুটো লাল হয়ে যেত পিঠে ব্যথা হতো কিন্তু দিনের শেষে যখন সালে ঘরে ফিরতেন মরিয়মের সব ক্লান্তি মুছে যেত সালেঘর ঘরে ঢুকেই আগে সালাম দিতেন। তারপর মরিয়মের হাতের দিকে তাকিয়ে ব্যথিত হতেন। একদিন সালেহ মরিয়মের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন, মরিয়ম আমি হয়তো তোমাকে রেশমি কাপড় দিতে পারিনি। কিন্তু আমি কথা দিচ্ছি আমার এই রুক্ষ হাতে কোনদিন তোমাকে কষ্ট দেবো না। আল্লাহ আমাকে যতটুকু দিয়েছেন তার সবটুকু দিয়ে আমি তোমাকে আগলে রাখবো। সালেহের এই একটা কথায় মরিয়ম যা অনুভব করলেন তা তিনি গত 20 বছরে কোন ধন সম্পদে পাননি। একেই বলে সম্মান, একেই বলে ভালোবাসা। তাদের সংসারের একটা সুন্দর নিয়ম ছিল। আযান হওয়ার সাথে সাথে সালেহ কাজ ফেলে উঠে পড়তেন। যাবার সময় বলতেন, মরিয়ম চল আল্লাহর দরবারে হাজিরা দিয়ে আসি। সালে যখন জামাতে নামাজ পড়ে ফিরতেন, মরিয়ম তখন ঘরে জায়নামাজে বসে থাকতেন। সালে ঘরে ঢুকে মরিয়মকে কিছু একটা দ্বীনি কথা শোনাতেন। কোনদিন কোন সাহাবীর গল্প, কোনদিন আল্লাহর কোন আয়াতের তাফসীর। রাতের শেষ প্রহরে যখন সারা শহর ঘুমে মগ্ন সালে আলতো করে মরিয়ম কে ডাকতেন মরিয়ম ওঠো দুনিয়ার সব রাজা এখন ঘুমাচ্ছে কিন্তু আমাদের রব এখন প্রথম আসমানে নেমে এসেছেন চলো তার কাছে কিছু চাই হাড় কাঁপানো শীতে দুজন একসাথে অযু করতেন তাহাজ্জুদের জায়নামাজে দাঁড়িয়ে মরিয়ম যখন সালেহের তেলাওয়াত শুনতেন তার মনে হতো এই মাটির ঘরটাই দুনিয়ার সবচেয়ে দামি প্রাসাদ এই ঘরে ফেরেশতারা ডানা মেলে বসে আছে কখনো কখনো ঘরে খাবারের সংকট হতো। কোনদিন হয়তো শুধু শুকনো রুটি আর সামান্য পানি। সালেহ খুব অপরাধ বোধ ভুগতেন। বলতেন আজ তোমাকে ভালো কিছু খাওয়াতে পারলাম না। মরিয়ম সালেহের হাত ধরে বলতেন, শুনুন পেট তো শুকন রুটিতেও ভরে যায়। কিন্তু আত্মা ভরে না যদি সেখানে আল্লাহর শোকর না থাকে। আমাদের রুটিতে বরকত আছে। কারণ এটা আপনার হালাল উপার্জনের। এটাই আমার কাছে অনেক। সালে অবাক হয়ে তার স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকতেন তিনি বুঝলেন আল্লাহ তাকে শুধু একজন স্ত্রী দেননি একজন আখেরাতের সাথী দিয়েছেন। একদিন বিকেলে ঘরের দাওয়ায় বসে সালেহ জিজ্ঞেস করলেন মরিয়ম তুমি কি কখনো আফসোস করো? আবু সুফিয়ানের কথা কি মনে পড়ে? সেদিন শহর দিয়ে তার উটের কাফেলা যাচ্ছিল। মানুষ বলছিল তার সম্পদ নাকি দ্বিগুন হয়েছে। তার কাছে থাকলে হয়তো তুমি আজ দাসীদের হুকুম দিতে পারতে। মরিয়ম দূরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। তারপর ধীর স্থির কন্ঠে বললেন সালেহ সুখ আর শুকুন এক জিনিস না। সুখ আসে বাইরে থেকে, সম্পদ থেকে, পোশাক থেকে, অলংকার থেকে। এটা আজ আছে কাল নেই। কিন্তু সুকুন আসে ভেতর থেকে, আল্লাহর কাছ থেকে। আমার হৃদয়ে যে সুকুন আছে, আবু সুফিয়ানের সাত মহলা প্রাসাদেও হয়তো তা নেই। আমি রাজপ্রাসাদ চাইনি। আমি এমন একটা হৃদয় চেয়েছিলাম যেখানে আমার আল্লাহর বসবাস আর আমি তা আপনার কাছে পেয়েছি| আলহামদুলিল্লাহ সালে আর কিছু বলতে পারলেন না| শুধু তার চোখ দুটো ভিজে এল তিনি বুঝতে পারলেন যার ঘরে এমন একজন নারী থাকে সেই পুরুষ দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী মানুষ তাদের সেই ছোট্ট কুড়েঘর থেকে প্রতিদিন কুরআনের আওয়াজ আসতো পাড়ার মানুষ পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় থমকে দাঁড়াতো তারা দেখতো ঘরটা গরীবের হতে পারে কিন্তু সেই ঘর থেকে প্রশান্তির সুবাস আসছে যা পাশের বড় বড় অট্টালিকা থেকেও পাওয়া যায় না। এদিকে শহর জুড়ে তখন অন্য এক গল্প রচিত হচ্ছিল। মরিয়মের বিয়ের কয়েক মাস পরেই আবু সুফিয়ানের বিয়ে হল। বড় ব্যবসায়ীর রূপবতী কন্যা। যৌতুকে এলো প্রচুর ধনসম্পদ। দাস-দাসী আর উপঠৌকন। সেই বিয়ের আয়োজনে শহর সাতদিন মাতোয়ারা ছিল। রাতে আলোকস্যায় আকাশ লাল হয়ে যেত। আর দিনের বেলা চলতো রাজকীয় ভোজ। পাড়ার মানুষ তখন আড়ালে বলাবলি করতো দেখলে তো এটাকে বলে কপাল। কাজী ইব্রাহিমের মেজো মেয়েটা এই রাজপ্রাসাদ ছেড়ে মাটির ঘরে গিয়ে উঠলো। একেই বলে কপাল পোড়া। কিন্তু সেই আলোক উজ্জ্বল প্রাসাদের ভেতরে কি হচ্ছিল তার খবর কেউ রাখতো না। প্রথম কয়েক মাস সব ঠিকঠাক মনে হলেও ধীরে ধীরে [মিউজিক] ফাটল ধরতে শুরু করল। কারণ সেই ঘরে সবই ছিল কেবল একজনের অভাব ছিল। আল্লাহর। আবু সুফিয়ানের দিনে কোন নামাজ ছিল না। রাতে কোন সিজদা ছিল না। তার কাছে জীবন মানেই ছিল লাভ ক্ষতির হিসেব। সে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে গিয়ে অসততার আশ্রয় নিতে শুরু করল। ওজনে কম দেওয়া, মিথ্যা কসম খেয়ে মাল বিক্রি করা এসব তার কাছে মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়ালো। ঘরে যখন হারামের অনুপ্রবেশ ঘটে, তখন রহমত জানালা দিয়ে বেরিয়ে যায়। আবু সুফিয়ান আর তার স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ছিল কেবল কেনাকাটা আর প্রদর্শনের। ঘরে দামি সব আসবাব ছিল কিন্তু একে অপরের জন্য কোন মায়া ছিল না। আবু সুফিয়ান ঘরে ফিরতো মাঝরাতে। স্ত্রী অপেক্ষায় [মিউজিক] থাকতেন না বরং নিজের গয়না আর আভিজাত্য নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। বিশাল খাট দামি রেশমি বিছানা কিন্তু দুজনের চোখে সুকুন বা প্রশান্তির ঘুম ছিল না। তুচ্ছ বিষয়ে ঝগড়া হতো। চিৎকার চেঁচামেচি হতো। দাস-দাসীরা দেওয়ালের ওপাশ থেকে সেই অশান্তির শব্দ শুনতো। বছর দুয়েক পর তাদের ঘরে সন্তান এলো। কিন্তু সেই সন্তান বাবাকে কাছে পেল না। কারণ বাবা তখন ব্যবসার নেশায় মত্ত। সন্তান তার মায়ের কাছে পেল না কোন নীতি শিক্ষা। কারণ মা ব্যস্ত ছিলেন সামাজিক অনুষ্ঠানে নিজেকে বড় দেখাতে। প্রাসাদের দেওয়ালগুলো যত উঁচু হচ্ছিল ভেতরের মানুষগুলো তত একা হয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ করেই একদিন আবু সুফিয়ানের জীবনে অন্ধকার নেমে এল। তার কাফেলা মরুভূমিতে ডাকাতের কবলে পড়ল। বাজারে তার ঋণের বোঝা বেড়ে গেল। যাদের ঠকিয়ে সে বড় হয়েছিল তারা সবাই একজোট হয়ে মামলা করল। সারা জীবনের অহংকার সেই বিশাল বাড়ি, আসবাব, আভিজাত্য সবই ধীরে ধীরে নিলামে উঠতে শুরু করল। সবচেয়ে বড় আঘাতটা এলো তখন যখন তার দুর্দিনের ছায়ার মত পাশে থাকার মত কেউ ছিল না। যেসব বন্ধুরা তার টাকার লোভে ঘিরে থাকতো তারা চেনা দিল না। আর তার স্ত্রী যার সাথে সম্পর্কের ভিত্তি ছিল কেবল সম্পদ তিনি একদম সাফ জানিয়ে দিলেন এই অভাবের সংসারে আমি থাকতে পারবো না। সংসার ভেঙে গেল। যে অট্টালিকা নিয়ে মানুষের গরিমা ছিল তা আজ এক পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপ। পাড়ার মানুষ এবার বিশ্বয় থমকে দাঁড়ালো। যারা একদিন বলেছিল আবু সুফিয়ান কত ভাগ্যবান তারা আজ নিজেদের ভুল বুঝতে পারল তারা দেখল আল্লাহর ভয় ছাড়া গড়া প্রাসাদ বালির বাঁধের মত ক্ষণস্থায়ী বাইরে থেকে যা ঝকঝক করছিল ভেতরে তা ছিল কেবল অন্ধকার আর হাহাকার মানুষ বুঝতে পারল কাজী ইব্রাহিমের মেয়ে মরিয়ম সেদিন ভুল করেনি বরং সে এক আসন্ন ধ্বংস থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়েছিল বছর কেটে গেল সালেহের এর ছোট্ট দোকান একটু বড় হলো। হালাল উপার্জন, বরকতের রিজিক। ঘর ছোট কিন্তু ভরপুর। সন্তান হলো। ছেলে বড় হচ্ছে। বাবা তাকে মসজিদে নিয়ে যান। মা তাকে কুরআন শেখান। সেই ছেলে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে। এই দৃশ্য দেখলে মরিয়মের চোখে পানি আসে। একটা পরিবার আল্লাহকে ঘিরে গড়ে উঠছে। এর চেয়ে বড় নেয়ামত আর কি হতে পারে? মরিয়মের মায়ের একদিন শরীর অসুস্থ হলো। মরিয়ম ছুটে গেলেন। মা শুয়ে আছেন। চেহারায় বয়সের ছাপ। কিন্তু চোখে একটা শান্তি। মরিয়মকে দেখে হাত বাড়ালেন। মরিয়ম মরিয়ম মায়ের হাত ধরলেন। পাশে বসলেন। মা অনেকক্ষণ চুপ রইলেন। যেন কিছু বলতে চাইছেন কিন্তু শব্দ খুঁজে পাচ্ছেন না। তারপর বললেন, মা তুই ঠিক ছিলি। মরিয়ম কিছু বললেন না। শুধু মায়ের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। মা আস্তে আস্তে বললেন, আবু সুফিয়ানের সংসার ভেঙেছে সম্পদ নেই ঘরে শান্তি নেই আর তোর ঘরে গেলে মনে হয় এই ঘরে আল্লাহর রহমত আছে তোর ছেলেকে দেখলে মন ভরে যায় মরিয়মের চোখে পানি এল আম্মু এটা আমার কৃতিত্ব না সালেহ আল্লাহকে ভালোবাসে আল্লাহ তার সংসারে রহমত দিয়েছেন। মা মরিয়মের মাথায় হাত রাখলেন। তুই সেই মানুষটাকে চিনেছিলিস। যখন সবাই ভুল করছিল তুই ঠিক পথে ছিলিস। সেটাই তোর বুদ্ধিমত্তা। একটু থামলেন মা। তারপর বললেন, মাফ করিস আমাকে। আমি বুঝিনি সেদিন। মরিয়ম মায়ের হাত দুটো নিজের বুকে চেপে ধরলেন। আম্মু তুমি মা। তোমার কাছে মাফ চাওয়ার কিছু নেই। তুমি মঙ্গল চেয়েছিলে। শুধু বুঝতে পারোনি। সেদিন বড় বনও এসেছিলেন। তিনি চুপ করে দাঁড়িয়েছিলেন কিছু বলেননি। কিন্তু যাওয়ার সময় মরিয়মকে জড়িয়ে ধরলেন। এই জড়িয়ে ধরাতেই সব বলা হয়ে গেল। ক্ষমা, স্বীকৃতি, ভালোবাসা কোন কথার দরকার ছিল না। প্রিয় ভাই ও বোনেরা, মরিয়মের গল্প শেষ হলো। কিন্তু একটু থামুন। মরিয়ম কি সহজ পথ বেছে নিয়েছিলেন? না পরিবারের রাগ সহ্য করেছেন সমাজের কথা সহ্য করেছেন কষ্টের সংসার করেছেন বছরের পর বছর মানুষ আড়ালে বলেছে ওই মেয়েটা ভুল করেছে কিন্তু মরিয়ম একটা জিনিস জানতেন যখন তুমি আল্লাহর জন্য কিছু ছাড়ো আল্লাহ তার বদলে তোমাকে এমন কিছু দেন যা তুমি কখনো কল্পনাও করোনি আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার জন্য পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিজিক দেন যা সে কল্পনাও করেনি সূরা তালাক আয়াত দুই তিন মরিয়মের রিজিক ছিল শুকুন ছিল একটা ঘর যেখানে আল্লাহকে মনে রাখা হয় ছিল একজন স্বামী যে তাকে আখিরাতের পথে নিয়ে যায় ছিল একটা সন্তান যে বাবার পাশে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ে এটা কি সম্পদের চেয়ে কম না এটা অনেক বেশি এখন একটু নিজের দিকে তাকান আপনি বা আপনার পরিবার যদি এখন বিয়ের কথা ভাবছেন তাহলে একটাই কথা পাত্র বা পাত্রীর দিন দেখুন সম্পদ আসে আর যায় সৌন্দর্য ফিকে হয়। বংশের গর্ব একদিন শেষ হয়। কিন্তু একজন দ্বীনদার মানুষ সে বিপদে আল্লাহর কাছে ফেরে। সে সুখে আল্লাহর শুকরিয়া করে। সে সন্তানকে আল্লাহকে ভালোবাসতে শেখায়। সে মৃত্যুর সময় কালিমা মনে রাখে। এই মানুষটাই আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর যদি আপনি এমন একটা পরিস্থিতিতে আছেন যেখানে দ্বীনের জন্য কিছু ছাড়তে হচ্ছে। পরিবার বুঝছে না, মানুষ কথা বলছে, একা লাগছে। তাহলে মরিয়মের কথা মনে করুন। সে একা ছিল কিন্তু আল্লাহ তার সাথে ছিলেন। আর আল্লাহ যার সাথে থাকেন সে কখনো একা না। যে আল্লাহর উপর ভরসা রাখে আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। সূরা তালাক আয়াত তিন। যথেষ্ট। মানুষের স্বীকৃতি না হলেও সমাজের প্রশংসা না হলেও পরিবার না বুঝলেও আল্লাহ যথেষ্ট। একটা কথা দিয়ে শেষ করি। মরিয়মের মা শেষে বলেছিলেন, তুই ঠিক ছিলি। কিন্তু সেই স্বীকৃতি পেতে বছর লেগেছিল। কষ্ট লেগেছিল, ধৈর্য লেগেছিল। আল্লাহর পথে ধৈর্য ধরলে একদিন না একদিন পৃথিবীও স্বীকার করে। আর আখিরাতে আল্লাহ তো অবশ্যই পুরস্কার দেবেন। আজকে রাতে একটাই কাজ করুন। সিজদায় যান। আল্লাহকে বলুন, ইয়া আল্লাহ আমার জীবনের প্রতিটা সিদ্ধান্তে তোমার সন্তুষ্টিকে সবার আগে রাখার তৌফিক দাও। দুনিয়ার চাকচিক্য যেন আমার চোখ ঢেকে না দেয়। আল্লাহ শুনছেন তিনি সবসময় শুনছেন। প্রিয় দর্শক আজকের গল্পটা যদি আপনার বুকে একটুও নাড়া দিয়ে থাকে তাহলে এই ভিডিওটা এমন কাউকে পাঠান যিনি এখন বিয়ের সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন অথবা যার পরিবার দ্বীনের চেয়ে সম্পদকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ভিডিওটিতে একটা লাইক দিন। চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন। বেল আইকনটা প্রেস করুন। আর কমেন্টে আপনার মূল্যবান মতামত জানাতে ভুলবেন না আল্লাহ হাফেজ
Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.
Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact