বহু যুগের ও বহু দিনের কথা এক সুদূর ঘন আরণ্যের কিনারায় একটি পর্ণ কুঠিরে এক ঈমানদার কাঠুরে তার পরিবার নিয়ে বাস করত। তার সংসারে তার প্রথম স্ত্রীর রেখে যাওয়া দুই নিষ্পাপ সন্তান। ছেলে আব্দুল্লাহ ও মেয়ে হাবিবা ছিল তার চোখের মনি। আব্দুল্লাহ ছিল বড় আর হাবিবা ছিল ছোট। কিন্তু দুর্ভাগ্যবসত তাদের সেই স্নেহময়ী জননী কিছুকাল আগে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। সেই একাকিত্ব ঘোচাতে কাঠুরে আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো। কিন্তু তার দ্বিতীয় স্ত্রী এই ছোট্ট আব্দুল্লাহ ও হাবিবার সৎ মা তার আচরণের মতোই বিষাক্ত ছিল। সে বাচ্চাদের দেখলেই বিরক্ত হতো এবং মনে মনে ষড়যন্ত্র আঁড়তো যে কিভাবে এই নিষ্পাপ আত্মা গুলোকে জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া যায়। কথায় কথায় সে তাদের শাস্তি দিত, কঠোর পরিশ্রম করাতো এবং পেট ভরে খেতে দিত না। এই আরণ্যের নিরীহ কাঠুরে দিনে দিনে দরিদ্র থেকে দরিদ্রতর হচ্ছিল। সে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে বনের কাঠ সংগ্রহ করত। এবং সন্ধ্যা হতেই সেই কাঠ শহরে বিক্রি করে আসতো। তার এই অক্লান্ত চেষ্টা শুধু কোনমতে তাদের খাদ্যের সংস্থান করতে পারতো। ঠিক সেই সময়ে পরীক্ষার মত এক মহা দুর্ভিক্ষ নেমে আসলো পুরো জনপদে। মানুষ পশুপাখি সবাই ক্ষুধার জ্বালায় কাতর হয়ে পড়ল। এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে তাদের দৈনিক খাবারের যোগান দেওয়াও অসম্ভব হয়ে উঠল। এক রাতে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কাঠুরে তার কুটিরের নিঃশব্দ অন্ধকারে বসে গভীরভাবে ভাবছিল। তার নিজের জন্য তার এক বিন্দু চিন্তা ছিল না। তার সমস্ত চিন্তা ছিল তার কোমলমতী ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যৎ নিয়ে। সে দীর্ঘ আহাজারি করে তার স্ত্রীকে বলল, প্রিয়তমা এখন আমাদের বাঁচার পথ কি? এই দুর্ভিক্ষের সময়ে আমরা আমাদের এই ছোট্ট সন্তানদের কিভাবে প্রতিপালন করব? আমাদের ভান্ডার তো প্রায় শূন্য। এই কথা শোনার পর সেই নিষ্ঠুর সৎ মা যে কিনা সবসময় তাদের পথ থেকে সরাতে চাইতো, সে সুযোগ লুফে নিল, সে তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, কাল আমরা একটি মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে অনেক দূরে এই গভীর অরণ্যে তাদের নিয়ে যাব। সেখানে আমরা কিছু কাঠে আগুন ধরিয়ে দেব। যাতে হিংস্র জীবজন্তুরা তাদের কাছে না আসতে পারে। তারপর তাদের একেকটি গুটির টুকরা দিয়ে আমরা কাজের বাহানায় ফিরে আসবো। এরপর আমরা বাড়ি চলে আসবো যদি তারা ফিরে আসার পথ খুঁজেও তবে কখনো খুঁজে পাবে না কাঠুরে এই ঘৃন্ন পরিকল্পনা শুনে প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গেল সে কিছুক্ষণ ভাবলো এবং তারপর দৃঢ় কন্ঠে বলল না আমি এই জঘন্য কাজ করতে পারবো না একজন বাবা তার নিজের সন্তানদের কিভাবে একলা ফেলে আসতে পারে এই ভয়ঙ্কর জঙ্গলে যেখানে হিংস্র পশুরা তাদের খন্ড খন্ড করে ফেলবে এর চেয়ে ভালো তো একসাথে না খেয়ে মরা তখন তোমার শুধু আমাদের কবর বানানোর কষ্টটুকু করতে হবে। কিন্তু তার স্ত্রী উত্তেজিত হয়ে এবং ক্রোধে ফুসে উঠে জিদ ধরল। সেই জিদের কাছে কাঠুরে হার মানলো এবং বিরক্তিভাবে সম্মতি দিল। তবে সে আক্ষেপ করে তার স্ত্রীকে বলল, কিন্তু আমার পিতা হৃদয় সবসময় তর্পাতে থাকবে। আমার নিষ্পাপ সন্তানদের স্মৃতিতে। সেই রাতেই ক্ষুধার কারণে আব্দুল্লাহ আর হাবিবার চোখে ঘুম ছিল না। তারা আড়াল থেকে তাদের বাবা-মায়ের সমস্ত কথোপকথন শুনে ফেলল। এরপর ছোট্ট হাবিবা ভীষণভাবে কাঁদতে শুরু করল। সে তার বড় ভাই আব্দুল্লাহকে বলল, ভাই, আমরা মনে হয় আমাদের বাবা-মায়ের কাছে বোঝা হয়ে গেছি। আর তারা আমাদের থেকে মুক্তি চাইছে। আব্দুল্লাহ তার বোনকে আশ্বস্ত করল এবং বলল হাবিবা বোন আমার। তুমি ভয় পেও না। আমি এর জন্য আল্লাহর ইচ্ছায় নিশ্চয়ই কোন সমাধান খুঁজে বের করব। যখন বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়ল, তখন আব্দুল্লাহ বিছানা থেকে উঠলো। সে নিজের গায়ে একটি চাদর জড়িয়ে নিল এবং ধীরে ধীরে দরজা খুলে বাইরে চলে গেল। চাঁদের আলোয় বাড়ির সামনে পড়ে থাকা নুড়ি পাথরগুলো রুপার টুকরোর মত ঝলমল করছিল। আব্দুল্লাহ অনেকগুলো নুড়ি পাথর সংগ্রহ করে তার পকেটগুলো ভরে নিল এবং তারপর ঘরে ফিরে আসলো। ঘরে এসে সে তার বোন হাবিবার কাছে এসে বলল,প্রিয় বোন তুমি শান্তিতে ঘুমিয়ে যাও। আল্লাহ অবশ্যই ভালো কিছু করবেন। এই বলে সে নিজেও শুয়ে পড়ল এবং শান্তিতে ঘুমিয়ে গেল। পরের দিন সকালের সূর্য ওঠার আগেই কাঠুরের সেই নিষ্ঠুর স্ত্রী এই দুই শিশুর কাছে আসলো এবং তাদের জাগিয়ে বলল ওঠো বাচ্চারা তৈরি হয়ে নাও আজ আমরা আরণ্যে যাব কাঠ কাটতে সে আব্দুল্লাহ এবং হাবিবাকে এক টুকরো করে রুটি দিল এবং সতর্ক করে বলল এটা তোমাদের দুপুরের আহারের জন্য এখনই খেয়ে ফেলো না নয়তো দুপুরে তোমাদের কাছে খাওয়ার জন্য কিছু অবশিষ্ট থাকবে না আব্দুল্লাহ ও হাবিবা নীরবে রুটির সেই টুকর গুলো গ্রহণ করল এবং তারপর তারা জঙ্গলের দিকে যাত্রা করল। কিছুদূর এগিয়ে যাওয়ার পর আব্দুল্লাহ হঠাৎ থেমে গেল এবং ঘুরে তাদের ঘরের দিকে তাকাতে লাগলো। এই কাজটি সে বারবার করতে থাকলো। কাঠুরে তার পুত্রকে এমনটি করতে দেখে প্রশ্ন করল। আব্দুল্লাহ বাবা কি করছো? তুমি বারবার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছো কেন? সাবধানে হাঁটো বাবা। আব্দুল্লাহ উত্তর দিল, আমি আমাদের পোষা বিড়াল ছানাটিকে দেখছি। যেটা আমাদের বাড়ির চালে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এটা শুনে সেই সৎ মা তাচ্ছিল্যের সুরে সঙ্গে সঙ্গে বলল, আরে তুমি তো একেবারে বোকা। ওটা তোমার বিড়ালছানা নয়। ওটা তো সূর্যের আলো যা বাড়ির চালার উপরে এসে পড়ছে। কিন্তু আব্দুল্লাহ আসলে বিড়ালছানাটিকে দেখছিল না। সে তো তার পকেট থেকে নুড়ি পাথরগুলো বের করে রাস্তায় ফেলছিল এবং ফিরে আসার পথ মনে রাখার চেষ্টা করছিল। যখন তারা আরণ্যের একদম মাঝখানে গিয়ে পৌঁছালো তখন কাঠুরে বলল হে আমার প্রিয় সন্তানেরা এখন তোমরা কাঠ যোগাড় করো আমি এখানে আগুন জ্বালিয়ে দেবো এরপর আব্দুল্লাহ আর হাবিবা অনেক কাঠ একত্র করে একটি বিশাল স্তুপ তৈরি করল তারপর কাঠুরে সেই কাঠগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিল যখন আগুন তীব্রভাবে জ্বলতে লাগলো তখন কাঠুরের স্ত্রী বলল বাচ্চারা এখন তোমরা এই আগুনটার কাছেই বসো আমরা এখন কাঠ আটকাটতে আরো গভীরে যাচ্ছি। কাজ শেষ হলেই আমরা ফিরে আসবো এবং তোমাদের সাথে করে ঘরে নিয়ে যাব। আব্দুল্লাহ আর হাবিবা সেই জ্বলন্ত আগুনের পাশে বসল। দুপুরের রুটি খেয়ে তারা একটু স্বস্তি পেল। তারা ক্রমাগত কুড়াল দিয়ে কাঠ কাটার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিল। এবং সেই আওয়াজ শুনে তারা খুব খুশি ছিল ও আশ্বস্ত ছিল যে তাদের বাবা তাদের পাশেই আছে। কিন্তু বাস্তবে সেই আওয়াজ কুড়ালের ছিল না বরং বাতাসের তোড়ে গাছের ডালপালাগুলো পরস্পর আঘাত করছিল। তারা অনেকক্ষণ ধরে তাদের বাবার অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেল এবং অবশেষেই সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ল। যখন তাদের ঘুম ভাঙলো তখন চারপাশে হালকা অন্ধকার নেমে এসেছে। হাবিবা ফুপিয়ে কেঁদে উঠে বলল যে এখন আমরা আর কখনো বাড়িতে ফিরে যেতে পারবো না। আব্দুল্লাহ তার বোনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল যে, হাবিবা বোন আমার আরও একটু অপেক্ষা করো। চাঁদ উঠুক তারপর আমরা চাঁদের আলোয় সেই পথ ধরে ফিরে যাব। যখন পূর্ণিমা চাঁদ উঠে আসলো তখন আব্দুল্লাহ তার বোনের হাত ধরল এবং সেই নুড়ি পাথরগুলোর দিকে তাকিয়ে চলতে থাকলো যেগুলো সে আসার সময় রাস্তায় ফেলে এসেছিল এবং যা চাঁদের আলোয় ঝলমল করছিল তারা ধীরে ধীরে সারারাত হেঁটে চলল আর যখন সকালের সূর্য উঠল তখন তারা নিজেদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো কাঠুরের স্ত্রী দরজা খুলল যখন তাদের সেই নিষ্ঠুর সৎমা তাদের দেখল তখন সে হতভম্ব হয়ে গেল তারপর সে ক্রোধের ভান করে বলল, তোমরা দুজন কি দায়িত্বজ্ঞানহীন ছেলেমেয়ে। তোমরা এতক্ষণ ধরে জঙ্গলেই ঘুমোচ্ছিলে। আমরা তো ভেবেছিলাম যে তোমরা আর কোনদিন ফিরবে না। কিন্তু কাঠুরে যখন তার প্রিয় সন্তানদের জীবিত দেখল, তখন তার মুখে আনন্দের বন্যা বইতে লাগলো। সে তার নিষ্পাপ সন্তানদের জঙ্গলে ফেলে আসার জন্য খুবই হতাশ ও দুঃখিত ছিল। সময় এভাবেই কেটে গেল এবং কিছুকাল পর আরো একবার দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। বাচ্চারা আরেকবার তাদের সৎ মায়ের কথা শুনে ফেলল যে বলছিল যে আমাদের খাদ্য সব ফুরিয়ে গেছে এখন আমাদের কাছে শুধুমাত্র অর্ধেক রুটি রয়েছে এইবার আমরা শিশুদের অনেক দূরে এবং আরো ঘন জঙ্গলে ছেড়ে আসবো যাতে তারা কোনভাবেই ফিরে আসতে না পারে এটা শুনে কাথুরে খুব মন খারাপ করল কিন্তু তার অন্য কোন উপায় ছিল না যখন গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল তখন আব্দুল্লাহ আবার উঠল যে কোথাও থেকে সাদা নুড়ি পাথর খুঁজে আনবে। এই সাদা নুড়ি পাথরগুলোই ছিল যা আগেরবার তাদের ঘরে ফিরিয়ে এনেছিল। কিন্তু সে দেখতে পেল যে দরজায় তালা লাগানো আছে এবং বাইরে যাওয়ার কোন পথ নেই। এটা দেখে সে পেরেশান হয়ে গেল। তবুও সে তার ছোট্ট বোনকে আশ্বস্ত বলল এবং বলল, হাবিবা, বোন আমার কেঁদো না। আল্লাহ অবশ্যই আমাদের সাহায্য করবেন এবং তিনি আবার আমাদের রক্ষা করবেন। পরের দিন সকাল হতেই কাঠুরের স্ত্রী দুজন শিশুকে জাগিয়ে দিল। এবং আবার তাদের দুটি রুটির টুকরো দিল। কিন্তু এই রুটির টুকরোগুলো আগের বারের মতো বড় ছিল না। এগুলো খুবই ছোট ছিল। এরপর যখন তারা জঙ্গলের দিকে রওনা হলো তখন আব্দুল্লাহ পকেটে হাত ঢুকিয়ে রুটিটিকে গুঁড়ো করে নিল এবং অল্প অল্প দূরত্বে থেমে থেমে সে সেই গুড়ো গুলো রাস্তায় ফেলতে লাগলো। আব্দুল্লাহ তুমি বারবার কেন থেমে যাচ্ছ? তার বাবা প্রশ্ন করল। আমি একটি কবুতরকে দেখছি যা আমাদের ছাদের উপর বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আব্দুল্লাহ উত্তর দিল। তার সৎ মা বলল, ওটা তোমার কবুতর নয়। ওগুলো তো সূর্যরশি যা চিমনির উপর ঝলমল করছে। কিন্তু আব্দুল্লাহ তো রুটির ছোট ছোট গুঁড়ো গুলো রাস্তায় ফেলতে ফেলতে চলতে লাগলো। এইবার তারা জঙ্গলে এত দূরে এবং এমন জায়গায় এসেছিল যেখানে কাঠুরেও কখনো আসেনি। তারা আরো একবার কাঠ যোগাড় করে আগুন জ্বালালো। এবং তাদের সৎ মা বলল, বাচ্চারা এখন তোমরা এই আগুনটার কাছে বসো। যদি তোমরা ক্লান্ত হয়ে যাও তো এখানেই ঘুমিয়ে পড়ো। আমরা কাঠ কাটতে জঙ্গলে যাচ্ছি। আমরা সন্ধ্যায় ফিরে আসবো এবং তোমাদেরও সাথে করে নিয়ে যাব। দুপুর হতেই আব্দুল্লাহ তার রুটির দুটি টুকরো করল। একটি নিজে খেল এবং অন্যটি তার বোনকে দিল। আব্দুল্লাহ তার রুটির টুকরোগুলো তো আগেই ভেঙে রাস্তায় ফেলে দিয়ে এসেছিল যাতে বাড়ির পথ খুঁজে বের করতে পারে। এরপর দুই ভাইবোন ঘুমিয়ে পড়ল। রাত হয়ে গেল। কিন্তু তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য কেউ ফিরে আসলো না। যখন রাতের অন্ধকার পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়ল, তখন আব্দুল্লাহ তার বোনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, হাবিবা বোন আমার চাঁদ উঠুক অপেক্ষা করো। যখন চাঁদ উঠবে তখন আমি সেই রুটির টুকরোগুলো দেখতে পাবো। যখন চাঁদ উঠলো তখন তারা রুটির কোন টুকরো দেখতে পেল না। আসলে সেই রুটির টুকরোগুলো পাখিরা তুলে নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আব্দুল্লাহ তার বোনকে তবুও বলল হাবিবা বোন আমার চিন্তা করো না আমরা রাস্তা খুঁজে নেব। এরপর তারা পুরো রাত এবং পরের পুরো দিন জঙ্গলে উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরতে লাগলো। কিন্তু তারা কোথাও থেকে জঙ্গল থেকে বেরনোর রাস্তা পেল না। ক্ষুধা পিপাসায় তাদের খুব করুণ অবস্থা হয়েছিল। তারা কয়েকটি বুনোকুল ছাড়া কিছুই খায়নি। সেই বুনো কুলগুলো তারা একটি কুল গাছের নিচ থেকে পেয়েছিল। ক্লান্ত হয়ে তারা একটি ঝোপের মধ্যে বসে পড়ল এবং বসতেই ঘুমিয়ে গেল। পরের দিন তাদের অবস্থা খুব খারাপ ছিল। তারা ভাবতে লাগলো যে আজও যদি তারা খাবার জন্য কিছু না পায় তবে তারা ক্ষুধায় মারা যাবে। দুপুরের দিকে তাদের একটি পাখি দেখা গেল। যেটা গাছের ডালে বসে খুব মিষ্টি সুরে গান গাইছিল। তার রং ছিল একেবারে সাদা। সে খুব মিষ্টি স্বরে গান গাইছিল। এত মিষ্টি সুর যে আব্দুল্লাহ ও হাবিবা থেমে তার আওয়াজ শুনতে লাগলো। তারপর সেই পাখিটির ডানা ঝাপটে উড়তে লাগলো। এবং দুই ভাই-বোন তার পিছু পিছু চলতে লাগলো। এমন মনে হচ্ছিল যেন সে তাদের নিজের পিছনে পিছনে চলতে বলছে। তারপর তারা চলতে চলতে একটি ছোট্ট বাড়ির কাছে পৌঁছালো। যখন তারা কাছে পৌঁছালো। তখন তারা দেখে অবাক হয়ে গেল যে সেই বাড়িটি রুটি দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। কারণ তার ছাদও রুটি দিয়ে বানানো ছিল। আব্দুল্লাহ এটা দেখে আনন্দে লাফিয়ে উঠল এবং বলতে লাগল এখন আমরা আমাদের বাকি জীবন এখানেই কাটিয়ে দেব এবং এখন আমরা শ্রম ছাড়াই আমাদের পেট ভরাতে পারব। এই বলে আব্দুল্লাহ একটুখানি ছাদ ভেঙে নিল। যাতে দেখতে পারে যে সেটা সত্যিই রুটি নাকি অন্য কিছু। আর হাবিবা জানালার কাছে গিয়ে একটুখানি জানালা ভেঙে নিজের মুখে পুড়ে নিল। এরপর তার একটি থরথর করে কাঁপা আওয়াজ শুনতে পেল। কেউ বলছিল খায় এই কোন শয়তান আমার ছোট এই ঘর এর জবাবে শিশুরা বলল জান্নাত এইতো বাচ্চাদের গরীবদের মজুরদের। এই বলে তারা রুটি খাওয়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এরপর দরজা খুলল এবং একটি খুবই বুড়ো এবং দুর্বল মহিলা যার কোমর ঝুঁকে গিয়েছিল সে নিজের লাঠি ঠুকতে ঠুকতে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসলো। বাচ্চারা তাকে দেখে এত ভয় পেয়ে গেল যে তাদের হাত থেকে রুটি খসে পড়ল এবং জমিতে পড়ে গেল এটা দেখে সেই বুড়ি মহিলা বলল আরে প্রিয় শিশুরা ভয় পেয়ো না ভেতরে চলে এসো আমি তোমাদের অনেক রকমের জিনিস খাওয়ার জন্য দেব সে খুব আদর করে বাচ্চাদের ভেতরে নিয়ে গেল এবং সে অনেক ধরনের খাবার শিশুদের সামনে এনে রাখল যা আব্দুল্লাহ এবং হাবিবা দুই ভাইবোন খুব মজা করে খেল এরপর বুড়ি মহিলা তাদের শোয়ার জন্য দুটি দুটি ছোট ও সুন্দর পালঙ্ক দিল যার ওপর সাদা চাতর বিছানো ছিল। যখন দুই ভাইবোন তাদের বিছানায় শুয়ে পড়ল তখন তারা খুব আরাম অনুভব করল। এমন মনে হচ্ছিল যেন তারা জান্নাতে এসে গেছে। বুড়ি মহিলা যদিও সেই শিশুদের সাথে খুব ভালোবাসার আচরণ করছিল কিন্তু বাস্তবে সে একজন খতরনাক জাদুকরী ছিল যে রাস্তা ভুলে যাওয়া মুসাফিরদের এই ভাবেই নিজের কাছে ডেকে আনত এবং তাদের খুব যত্ন করত। তারপর তাদের রেঁধে খেয়ে ফেলত। যখন আব্দুল্লাহ এবং হাবিবা দুজনেই তাদের বিছানায় ঘুমিয়ে গেল তখন সে জোরে জোরে হাসতে লাগলো। তার মুখে জল এসে গিয়েছিল এবং সে চুকচুক করে বলল, এখন এরা আমার হাতের মুঠোয়। এখন এরা কোথাও যেতে পারবে না। পরের দিন সকালের সময় বাচ্চারা ওঠেনি যে বুড়ি উঠে গেল। সে বাচ্চাদের দেখল। তারা তখনো ঘুমোচ্ছিল। ঘুমন্ত অবস্থায় সেই দুই ভাই-বোনকে খুব মিষ্টি লাগছিল। তাদের দেখে বুড়ি মহিলা হাসল এবং মনে মনে ভাবতে লাগলো এদের মাংস তো খুবই সুস্বাদু হবে। তারপর সে আব্দুল্লাহকে নিজের কোলে তুলে নিল, যেন সে খুব শক্তিশালী মহিলা, এবং তার ঝুকে যাওয়া কোমরও সোজা হয়ে গিয়েছিল। এখন তাকে দুর্বল মনে হচ্ছিল না। সে আব্দুল্লাহকে নিয়ে বাইরে আসলো এবং বাড়ির কাছেই একটি ঘরে নিয়ে গেল। সেই ঘরটি আসলে একটি খাঁচা ছিল। সে আব্দুল্লাহকে ভেতরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে খুঁটি লাগিয়ে দিল। সে যতই চিৎকার করুক কিন্তু তার আওয়াজ সেখানে শোনার কেউ ছিল না। এখন বুড়ি মহিলা ঘরে ফিরে আসলো এবং হাবিবা তখনও ঘুমোচ্ছিল। সে এটা জানতো না যে তার ভাই তার কাছে নেই। বুড়ি হাবিবাকে জোরে ঝাঁকুনি দিল। হাবিবা ভয় পেয়ে উঠে গেল। সে অবাক হয়ে বুড়ি মহিলার দিকে তাকাতে লাগলো। যার চোখে ভালোবাসার বদলে রাগ ছিল। সে রাগে বলল, ওঠ অলস মেয়ে। চল জল নিয়ে আয় এবং তোর ভাইয়ের জন্য কিছু রান্না কর। যখন সে খেয়ে খুব মোটা হবে তখন আমি তাকে খেয়ে ফেলব। হাবিবা যখন এটা শুনল, তখন সে চিৎকার করে করে কাঁদতে লাগলো। কিন্তু এখন কান্নাকাটি করার কোন ফায়দা ছিল না। হাবিবা বেচারী এখন সেটাই করতো যা তাকে করার জন্য বলা হতো। আব্দুল্লাহর জন্য খুব ভালো খাবার রান্না করা হতো। কিন্তু হাবিবা বেচারীর কপালে বাকি থাকা খাবার জুটতো। বুড়ি মহিলা প্রতিদিন খাঁচার কাছে যেত এবং চিৎকার করে বলত আব্দুল্লাহ তোর আঙ্গুল বাইরে বের কর যাতে আমি এই ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারি যে তুই কতটা মোটা হয়েছিস আব্দুল্লাহ এর বদলে একটি হাড় তার হাতে ধরে দিত বুড়ি জাদুকরী যার দৃষ্টিশক্তি খুব দুর্বল ছিল সে এটা দেখতে পারতো না যে এটা তার আঙ্গুল নাকি অন্য কিছু সে প্রতিদিন সেই হাড় ধরে দেখতো তো পেরেশান হয়ে যেত যে কি ব্যাপার আমি প্রতিদিন একে এত ভালো খাবার খাওয়াই তবুও এ মোটা কেন হয় না এইভাবে চার সপ্তাহ পার হয়ে গেল এখন বুড়ি মহিলার জন্য ধৈর্য রাখা কঠিন হয়ে গেল সে বলতে লাগলো যে এখন যাই হোক না কেন আমি এই ছেলেটিকে খেয়ে ফেলব সে হাবিবাকে ডাক দিল এ মেয়ে জল নিয়ে আয় আব্দুল্লাহ মোটা হোক বা পাতলা আমি কাল সকালে তাকে রেঁধে খেয়ে ফেলব বেচারি হাবিবার অবস্থা করুণ ছিল। সে বেচারি ফোঁস করে কেঁদে কেঁদে কাঁদছিল এবং জল আনছিল। সে বেচারি কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো যে হে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করো। এর চেয়ে ভালো তো এই ছিল যে আমাদের জঙ্গলেই হিংস্র পশুরা ছিড়ে খেয়ে ফেলতো। যাতে আমরা দুই ভাই-বোন একসাথেই মরে যেতাম। বন্ধ কর এই কান্নাকাটি। জাদুকরী বিরক্ত হয়ে বলল। পরের দিন হাবিবা বাইরে আসলো। সে জলে ভরা একটি পাতিল দুটি বাঁশের মাঝে ঝুলিয়ে দিল এবং তার নিচে আগুন জ্বালিয়ে দিল। বুড়ি মহিলা বলতে লাগলো আগে আমরা তাকে ভাজবো। আমি তন্দুর তৈরি করে ফেলেছি এবং আটাও বানিয়ে ফেলেছি। তারপর সে হাবিবাকে তন্দুরের দিকে ধাক্কা দিল যেখানে আগুনের শিখা জ্বলছিল এবং বুড়ি মহিলা হাবিবাকে বলল যে গিয়ে দেখ তন্দুর গরম হয়েছে কিনা যাতে আমি রুটি শেখতে পারি। আসলে সেই বুড়ি মহিলা হাবিবাকে এই জন্য তন্দুরের কাছে পাঠাচ্ছিল যাতে সে তাকেও ধাক্কা দিয়ে তন্দুরে ফেলে দেয় এবং তাকেও রেঁধে খেয়ে ফেলে। কিন্তু হাবিবা তার চলাকি বুঝতে পেরেছিল। সে অজানার ভান করে বলল কিন্তু আমি তো এটা দেখতে জানিনা যে তন্দুর গরম হয়েছে কিনা আমি কিভাবে দেখব এরপর বুড়ি মহিলা বলতে লাগলো আরে কাজ এড়িয়ে চলা মেয়ে এই তন্দুরের মুখ এত বড় যে আমি আমার মাথাও তার ভেতরে ঢোকাতে পারি এই বলে সেই বুড়ি জাদুকরী নিজের মাথা তন্দুরের ভেতরে ঢুকিয়েছিল যে হাবিবা তাকে পেছন থেকে তন্দুরের ভেতরে ধাক্কা মেরে দিল এবং লোহার একটি ঢাকনা দিয়ে তন্দুরের এর মুখ বন্ধ করে দিল। বুড়ির ভয়ঙ্কর চিৎকারে পুরো জঙ্গল কেঁপে উঠল। সে ভীষণ ভাবে চিৎকার করছিল। একবার তো হাবিবাও তার চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে গেল। কিন্তু সে নিজের কানে আঙ্গুল ঢুকিয়ে নিল এবং দৌড়ে সেই দিকে আসলো যেখানে তার ভাই আব্দুল্লাহ বন্দি ছিল। সে খাঁচার দরজা খুলল এবং চিৎকার করে বলল, আব্দুল্লাহ আব্দুল্লাহ আমরা মুক্ত হয়ে গেছি। বুড়ি মহিলা পুড়ে মরে গেছে। খাঁচার দরজা খুলতেই আব্দুল্লাহ এমনভাবে বাইরে আসলো, যেন কোন পাখি পিঞ্জরা থেকে বেরোচ্ছে। দুই ভাই-বোন খুশিতে লাফাতে লাগলো। এখন তাদের জঙ্গলে কারো ভয় ছিল না। তারা নির্ভয়ে বুড়ি জাদুকরীর ঘরে চলে গেল। সেখানে গিয়ে তারা দেখল তাদের অনেক ধরনের সিন্দুক নজরে আসলো। সেই সিন্দুকগুলোতে হীরা, জহরত এবং সোনার মুদ্রা ভরা ছিল। আব্দুল্লাহ সেই মুদ্রাগুলো দিয়ে নিজের পকেট ভরে নিল এবং হাবিবাও যতটা মুদ্রা নিতে পারতো সে নিয়ে নিল। এরপর আব্দুল্লাহ বলল যে, এখন আমাদের এই জঙ্গল থেকে বাইরে বেরনো উচিত। কয়েক ঘন্টা ঘোরার পর তারা একটি দিঘির কাছে পৌঁছালো। এখন আমরা এর ওপার কিভাবে যাব? আব্দুল্লাহ বলল হাবিবা বলল দেখো সামনে একটি খুব বড় উট পাখি দাঁড়িয়ে আছে আমি তাকে বলছি যে সে যেন আমাদের সাহায্য করে হাবিবা বলল সে তার কাছে গেল এবং বলতে লাগলো প্রিয় উটপাখি আমরা দুই ভাইবোন খুব পেরেশান হয়ে দাঁড়িয়ে আছি এবং আমরা আমাদের বাড়িতে ফিরে যেতে চাই এরপর উট পাখি তাদের কাছে আসলো আব্দুল্লাহ উট পাখির ওপর চেপে বসল হাবিবাকে নিজের কাছে বসাতে চাই চাইল তো হাবিবা বলতে লাগল না ভাই আমরা যদি দুজনেই এর উপর বসি তবে আমাদের ওজন বেশি হয়ে যাবে আমরা এক এক করে এর পিঠে সওয়ার হব এবং দিঘিটি পার হব উটপাখি তাদের এক এক করে দিঘিটি পার করিয়ে দিল এরপর তারা একটু এগিয়ে গেল তো তাদের এমন একটি জায়গা দেখা গেল যা পরিচিত মনে হচ্ছিল কিছুক্ষণ আরো চলার পর তাদের নিজের বাড়ি দেখা গেল নিজেদের বাড়ি দেখে তারা খুশিতে লাফিয়ে উঠল এবং তাদের জান ফিরে আসলো আর দুজন দৌড়ে নিজেদের বাড়িতে ঢুকে গেল তাদের বাবা যখন তার প্রিয় সন্তানদের জীবিত দেখল তখন তার খুশির সীমা রইল না যখন থেকে সে তার নিষ্পাপ বাচ্চাদের জঙ্গলে ফেলে এসেছিল তখন থেকে তার মন শান্ত ছিল না সে সবসময় তার বাচ্চাদের স্মৃতিতে থাকতো এবং কাঁদতো তার স্ত্রী যে সেই বাচ্চাদের সৎ মা ছিল সেও অসুস্থ হয়ে মরে গিয়েছিল আবদুল্লাহ এবং হাবিবা সেই হীরা জহরতগুলো তাদের বাবার সামনে ঢের করে দিল। যেগুলো তারা বুড়ি জাদুকরীর বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল। আর এইভাবে তাদের সারা জীবনের দুশ্চিন্তা শেষ হয়ে গেল। নিষ্ঠুর সৎ মা থেকেও তাদের মুক্তি মিলল। সে নিজেই নিজের খারাপ কাজের কারণে আল্লাহর শাস্তির শিকার হলো এবং খুশিতে দুই ভাইবোন তাদের বাবার সাথে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাতে লাগল। এখানেই আমাদের আজকের গল্প শেষ হলো। যদি আপনি এই গল্পটি উপভোগ করে থাকেন এবং এটি থেকে উপকৃত হয়ে থাকেন তবে অনুগ্রহ করে আমাদের চ্যানেলটি লাইক এবং সাবস্ক্রাইব করে সমর্থন করতে ভুলবেন না। যাতে আপনি আরো অর্থপূর্ণ এবং উপভোগ্য গল্প পেতে পারেন। আপনাদের দেখার জন্য ধন্যবাদ। এবং আমরা আশা করি পরের গল্পে আপনাদের সাথে আবার দেখা হবে ইনশাআল্লাহ। ও
Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.
Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact
Browse transcripts generated by our community



















