সত্যিই কি হযরত জাকারিয়া (আঃ)-কে করাত দিয়ে চেরা হয়েছিল? আসল রহস্য কী? | Hazrat Zakaria Story

ইমানের আলো2,388 words

Full Transcript

একটি জীবন্ত গাছকে কড়াত দিয়ে চিড়ে দুই টুকরো করা হচ্ছে। আর তার ভেতর থেকে ঝরে পড়ছে আল্লাহর এক মহান নবীর পবিত্র রক্ত। আমাদের সমাজে প্রচলিত এই লোম হর্ষক ঘটনাটি কি আসলেই সত্য? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোন বড় রহস্য? কি ঘটেছিল হযরত জাকালিয়া এবং হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের সাথে আর কেনই বা তাদের রক্তের প্রতিশোধ নিতে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল গোটা জেরুজালেম? আজ আমরা উন্মোচন করব ইসলামের ইতিহাসের সেই ধ্রুব সত্য যা শুনলে আপনার চোখের কোন ভিজে উঠবে। তাই ভিডিওটি একদম শেষ পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে দেখুন। হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম ছিলেন বনি ইসরাইলের এক মহান নবী ও আল্লাহর প্রিয় বান্দা। তিনি এমন এক সময় পৃথিবীতে এসেছিলেন যখন মানুষ আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে যাচ্ছিল এবং নানা রকম পাপাচারে লিপ্ত হচ্ছিল। তিনি অত্যন্ত সহজ সরল এবং বিনয়ী জীবন যাপন করতেন। অনেকেই হয়তো জানেন না যে হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম তার জীবিকা নির্বাহ করার জন্য নিজের হাতে কঠিন পরিশ্রম করতেন। সহীহ মুসলিমের একটি হাদিস থেকে আমরা জানতে পারি যে তিনি পেশায় ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রী বা ছুতার। তিনি জঙ্গল থেকে কাঠ কেটে এনে সুন্দর সুন্দর জিনিসপত্র বানিয়ে তা বাজারে বিক্রি করতেন এবং সেই উপার্জিত টাকা দিয়ে অত্যন্ত সাধারণ উপায়ে নিজের সংসার চালাতেন। মানুষের কাছে হাত না পেতে নিজের কষ্টের উপার্জনে জীবন চালানোর মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের জন্য এক মহান শিক্ষা রেখে গেছেন। হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের জীবনে সবচেয়ে বড় যে দায়িত্বটি আল্লাহ দিয়েছিলেন তা হলো হযরত মারিয়াম আলাইহিস সালামের দেখাশোনা করা। হযরত মারিয়াম আলাইহিস সালামের যখন খুব ছোট ছিলেন তখন থেকেই হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম বায়তুল মুকাদ্দাসের একটি বিশেষ কামড়ায় তার লালন-পালনের ভার নেন। হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম যখনই সেই কামড়ায় প্রবেশ করতেন, তখনই একটি অলৌকিক কান্ড দেখতে পেতেন। তিনি দেখতেন যে শীতকালে সেই কামড়ায় গ্রীষ্মকালের তাজা ফল এবং গ্রীষ্মকালে শীতকালে সুস্বাদু ফল রাখা আছে যা সেই যুগে বা সেই সময়ে পাওয়া কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। [মিউজিক] একদিন হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম অবাক হয়ে হযরত মারিয়াম আলাইহিস সালামকে জিজ্ঞেস করলেন, "হে মারিয়াম, এই অসময়ের ফলগুলো তুমি কোথা থেকে পেলে? তখন হযরত মারিয়াম আলাইহিস সালাম অত্যন্ত শান্ত গলায় উত্তর দিলেন এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে নিশ্চয়ই আল্লাহ যাকে চান তাকে কোন হিসাব ছাড়াই রিজিক দান করেন হযরত মারিয়াম আলাইহিস সালামের এই সহজ ও সুন্দর কথাটি বৃদ্ধ নবী হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের হৃদয়ে এক গভীর নাড়া দিল তিনি বুঝতে পারলেন যে আল্লাহ অসময়ে শুকন গাছের তাজা ফল দিতে পারেন সেই আল্লাহ চাইলে যে কোন অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন। সেই সময় হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের নিজের বয়স ছিল অনেক বেশি। তার মাথার সব চুল পেকে ধবধবে সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং তার শরীর ও বার্ধক্যের কারণে অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছিল। সবচেয়ে বড় দুঃখের বিষয় ছিল তার কোন সন্তান ছিল না এবং তার প্রিয় স্ত্রীও ছিলেন বন্ধা যার কারণে স্বাভাবিক উপায়ে সন্তান হওয়া একেবারেই অসম্ভব ছিল। কিন্তু আল্লাহর ওপর তার বিশ্বাস ছিল পাহাড়ের মত অটাল। তিনি বায়তুল মুকাদ্দাসের সেই পবিত্র কামড়ায় দাঁড়িয়ে অত্যন্ত গোপনে এবং নরম গলায় আল্লাহর কাছে মোনাজাত করতে লাগলেন। হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের সেই মোনাজাতের কথা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি আল্লাহর কাছে হাত তুলে কেঁদে কেঁদে বললেন, হে আমার প্রতিপালক আমার শরীরের হাড়গুলো আজ দুর্বল হয়ে গেছে এবং বার্ধক্যের কারণে আমার মাথার চুলগুলো সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু হে দয়াময় আল্লাহ আপনার কাছে প্রার্থনা করে আমি তো কখনো নিরাশ বা খালি হাতে ফিরে যাইনি। আমি আমার মৃত্যুর পর আমার আত্মীয়সংক্রান্ত মানুষের ব্যাপারে খুবই চিন্তিত যে তারা ধর্মের সঠিক সেবা করবে কিনা। আর আমার স্ত্রীও বন্ধা। তাই আপনি দয়া করে আপনার বিশেষ কুদরত দিয়ে আমাকে একজন সন্তান দান করুন। যে আমার মৃত্যুর পর আমার এবং হযরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের বংশের পবিত্র উত্তরাধিকারী হবে। হে আমার প্রতিপালক, আপনি তাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুন, যার উপর আপনি নিজে সন্তুষ্ট থাকবেন। আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'আলা তার এই প্রিয় বান্দার চোখের জল এবং হৃদয়ের ব্যাকুলতা কবুল করে নিলেন। যখন হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম মেহরাবে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই ফেরেশতারা এসে তাকে এক আনন্দের সুসংবাদ দিলেন। ফেরেশতারা বললেন হে জাকারিয়া আল্লাহ আপনাকে একটি পবিত্র পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছেন যার নাম হবে হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালাম আল্লাহ নিজেই এই সন্তানের নাম ঠিক করে দিয়েছেন এবং এই নামে এর আগে পৃথিবীতে আর কোন মানুষের জন্ম হয়নি এই আনন্দের খবর শুনে হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম অবাক হয়ে বললেন হে আমার প্রতিপালক কিভাবে আমার সন্তান হবে যখন আমার স্ত্রী বন্ধা এবং আমি নিজেও বার্ধক্যের শেষ সীমা সীমায় পৌঁছে গেছি। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে উত্তর দেওয়া হলো এটা এভাবেই হবে কারণ আপনার প্রতিপালক বলেছেন এই কাজটি তার জন্য অত্যন্ত সহজ। এর আগে যখন আপনি কিছুই ছিলেন না তখনো তো আমিই আপনাকে সৃষ্টি করেছি। [মিউজিক] আল্লাহ দেওয়া এই অলৌকিক সুসংবাদ অনুযায়ী যথাসময়ে হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের ঘরে জন্ম নিলেন এক ফুটফুটে সন্তান। যার নাম রাখা হলো হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালাম। তিনি ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু পরহেজগার এবং অসাধারণ জ্ঞানের অধিকারী। আল্লাহ তাআলা তাকেও অল্প বয়সেই নবুয়ত বা নবী হওয়ার সম্মান দান করেছিলেন। বৃদ্ধ পিতা হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম তার এই যোগ্য সন্তানকে পেয়ে অত্যন্ত খুশি হলেন এবং পিতা-পুত্র মিলে [মিউজিক] বনী ইসরাইলের মানুষদের আল্লাহর পথে ডাকার কাজ আরো জোরদার [মিউজিক] করলেন। কিন্তু বনী ইসরাইলের মানুষ ছিল অত্যন্ত অবাধ্য এবং অহংকারী। তারা যুগে যুগে আল্লাহর প্রেরিত নবীদের কথা অমান্য করত এবং তাদের উপর নানা রকম জুলুম অত্যাচার চালাতো। সেই সময়ের শাসক বা রাজা ছিল অত্যন্ত পাপিষ্ঠ এবং চরিত্রহীন। সে নিজের এক নিকট আত্মীয় নারীকে বিবাহ করতে চাইছিল যা আল্লাহর আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ হারাম ছিল। হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালাম আল্লাহর আইনের উপর অটল থেকে রাজাকে এই পাপ কাজ করতে তীব্র ভাবে নিষেধ করেন। রাজার সেই লোভী এবং পাপিষ্ঠ নারী হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের উপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হলো এবং রাজার কাছে দাবি করল যে সে যদি হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের মাথা কেটে আনে দিতে পারে তবেই সে রাজাকে বিয়ে করবে। অন্ধ ভালোবাসায় মতো সেই পাপিষ্ঠ রাজা তার সৈন্যদের নির্দেশ দিল আল্লাহর প্রিয় নবীকে হত্যা করার জন্য। অবশেষে অত্যন্ত নির্মমভাবে সৈন্যরা হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামকে শহীদ [মিউজিক] করে দিল এবং তার পবিত্র মাথাটি কেটে থালাই করে সেই অহংকারী নারীর সামনে নিয়ে আসা হলো। একমাত্র প্রিয় সন্তানের এই নির্মম বিদায়ের খবর যখন বৃদ্ধ পিতা হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের কানে পৌঁছালো তখন তার শোকের কোন সীমা ছিল না বার্ধক্যের দুর্বল শরীর নিয়ে তিনি তার পুত্রের এই বেদনাদায়ক মৃত্যুতে গভীরভাবে ভেঙে করলেন। কিন্তু পাপিষ্ঠ রাজার সৈন্যরা এখানেই থেমে থাকলো না। তারা ভাবল হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের মৃত্যুর পর তার পিতা হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম অবশ্যই বনী ইসরাইলের সাধারণ মানুষকে রাজার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবেন। তাই রাজা এবং তার পারিষদেরা সিদ্ধান্ত নিল যে হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম কেও আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। তারা এই বয়বৃদ্ধ এবং শোক আসন্ন নবীকে হত্যা করার জন্য এক বিশাল সৈন্যদল পাঠিয়ে দিল। হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম যখন দেখতে পেলেন যে চারিদিক থেকে অস্ত্রসিত সৈন্যরা তলোয়ার আর বল্নম নিয়ে তার ঘরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তাদের একমাত্র লক্ষ্য হলো তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা তখন তিনি আল্লাহর উপর ভরসা করে নিজের জীবন বাঁচাতে বাড়ি থেকে বের হয়ে দৌড়াতে লাগলেন। মদিনা বা বায়তুল মুকাদ্দাসের সেই জনপদ ছেড়ে তিনি শহরের বাইরের একটি বিশাল বাগান এবং ঘরো বোনের দিকে ছুটে যেতে লাগলেন। আর খুনি কাফের সৈন্যরা চিৎকার করতে করতে তলোয়ার উঁচিয়ে তার ঠিক পিছু পিছু ধাওয়া করতে লাগলো। বোনের ভেতরের গভীর অন্ধকারে পথ চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন বয়বৃদ্ধ নবী হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম। তার পেছনে তখন তলোয়ারের ঝনঝনানি আর কাফের সৈন্যদের হিংস্র চিৎকার ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। নিজের জীবন রক্ষা করা এবং আল্লাহর দ্বীনকে বাঁচানোর তাগিদে তিনি বনের আরো গভীরে একটি বিশাল এবং প্রাচীন গাছের সামনে এসে দাঁড়ালেন। এই গাছটি ছিল অনেক পুরনো এবং এর কান্ড ছিল অত্যন্ত চওড়া। এখানে এসে বনী ইসরাইলের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত চমৎকার এবং জনপ্রিয় ঘটনার কথা উল্লেখ পাওয়া যায় যা আমাদের সমাজে খুব বেশি আলোচিত হয়। বলা হয়ে থাকে যে ঠিক সেই মুহূর্তে হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম যখন কঠিন বিপদে পড়লেন তখন আল্লাহর হুকুমে সেই বিশাল গাছটি মাঝখান থেকে ফেটে গিয়ে একটি দরজার মতো খুলে গেল। হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালাম নিজের সুরক্ষার জন্য সেই গাছের ভেতরের ফাঁকা অংশে প্রবেশ করলেন। তিনি ভেতরে প্রবেশ করার সাথে সাথেই গাছটি অলৌকিকভাবে আবার আগের মত জোড়া লেগে গেল। যেন সেখানে কোনদিন কিছুই ঘটেনি। ঘাতক কাফের সৈন্যরা সেখানে পৌঁছে যখন দেখল যে চারিদিকে কোনো মানুষ নেই এবং জাকারিয়া আলাইহিস সালাম হঠাৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেছেন তখন তারা চরম অস্থিরতায় পড়ে গেল তারা বোনের আনাচে কানাচে তলোয়ার উঁচিয়ে খুঁজতে লাগলো কিন্তু কোথাও তার সন্ধান পেল না কিন্তু ঠিক সেই সময় মানুষের রূপ ধরে সেখানে উপস্থিত ছিল ইবলিশ শয়তান শয়তান পাপিষ্ঠ কাফেরদের ডেকে সেই গাছটি দেখিয়ে দিল এবং বলল তোমরা যাকে খুঁজছো সে এই গাছের ভেতরেই লুকিয়ে আছে। তোমরা বিশ্বাস না করলে আমার কাছে প্রমাণ আছে। শয়তান তখন যাকারিয়া আলাইহিস সালামের পরণের চাদরের ঝুলন্ত একটি অংশ কাফেরদের দেখিয়ে দিল যা তাড়াহুড়ো করে গাছের ভেতরে ঢোকার কারণে বাইরে আটকে ছিল। তখন শয়তান পাপিষ্ঠ কাফেরদের বুদ্ধি দিল, যে তোমরা একটি বড় করাত নিয়ে এসো এবং এই গাছটিকে মাঝখান থেকে কেটে দুই টুকরো করে ফেলো। শয়তানের প্ররোচনায় পাপিষ্ঠ সৈন্যরা একটি বড় করাত নিয়ে এলো এবং সেই গাছটিকে জীবন্ত অবস্থায় চেরার কাজ শুরু করল। করাত যখন ধীরে ধীরে হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালামের পবিত্র মাথার উপর এসে পৌঁছালো তখন করাতের সেই ধারালো আঘাতে আল্লাহর এই মহান নবী দ্বিখন্ডিত হয়ে শাহাদাত বরণ করলেন। প্রিয় দর্শক বনি ইসরাইলের ইতিহাসে এবং বহু প্রাচীন বইয়ে এই গাছ চেরার লোমহর্ষক কাহিনীটি দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে। কিন্তু এই ঘটনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইসলামিক সত্যতা আপনাদের জানা প্রয়োজন। ইমাম ইবনে কাসীরের মত বড় বড় ঐতিহাসিক এবং হাদিস বিশারদগণ তাদের কিতাবে স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে এই গাছ চেরার কাহিনীটি কোন সহীহ হাদিস বা সরাসরি আল্লাহর বাণী পবিত্র কুরআন দ্বারা প্রমাণিত নয়। এটিকে বলা হয় ইসরাইল বর্ণনা। যা মূলত ইহুদিদের কিতাব ও লোকথা থেকে আমাদের ইতিহাস ও তাফসীরের বইগুলোতে চলে এসেছে। এমনকি কিছু ভিত্তিহীন বর্ণনায় বলা হয়ে থাকে যে করাতের আঘাতে যখন হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম ব্যথায় শব্দ করেছিলেন তখন নাকি আল্লাহ তাআলা অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে ধমক দিয়েছিলেন। নাউজুবিল্লাহ। এই ধরনের অবাস্তব ও কুরুচিপূর্ণ কথা নবীদের পবিত্র চরিত্রের প্রতিপথী এবং এগুলো কোনভাবেই সত্য হতে পারে না। তাহলে মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের সাথে আসলে কি ঘটেছিল? পবিত্র কুরআন এবং ইসলামের বিশুদ্ধ ইতিহাস থেকে আমরা নিশ্চিতভাবে জানতে পারি যে বনী ইসরাইলরা ছিল অত্যন্ত অবাধ্য জাতি| যারা যুগে যুগে অন্যায় ভাবে আল্লাহর নবীদের হত্যা করত। হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের নির্মম শাহাদাতের পর পাপিষ্ঠ রাজা এবং তার ঘাতক বাহিনী বৃদ্ধ হযরত যাকারিয়া আলাইহিস সালামের উপর চরম ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হত্যা করার পরিকল্পনা করেছিল। এটি নিশ্চিত যে তিনি কাফেরদের জুলুম ও হিংস্রতার শিকার হয়ে আল্লাহর পথেই শাহাদাত বরণ করেছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর সঠিক মাধ্যম বা তিনি কিভাবে শহীদ হয়েছিলেন তা কোন সহিহ ও বিশুদ্ধ হাদিসে স্পষ্টভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে উল্লেখ করা হয়নি। সহীহ মুসলিমে কেবল তার কাঠমিস্ত্রি হওয়ার বিষয়টি এসেছে এবং কুরআন নিশ্চিত করেছে বনী ইসরাইল কর্তৃক নবীদের হত্যার নির্মম ইতিহাসকে। তবে তিনি যেভাবে এবং যে পন্থায় শহীদ হোন না কেন তার এই মহান শাহাদাত এবং ধৈর্য ইতিহাসের এক চরম বেদনাদায়ক ট্রাজেডি। কাফেররা যখন তার উপর নির্যাতন চালালো এবং তার চোখের সামনেই তার একমাত্র যোগ্য সন্তান হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের পবিত্র মাথা কেটে নেওয়া হলো তখনও আল্লাহর এই মহান নবী আল্লাহর সিদ্ধান্তের উপর অবিচল ছিলেন এবং [মিউজিক] এক মুহূর্তের জন্যও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। কিন্তু মানুষের উপর এই ভয়াবহ জুলুম আর আল্লাহর নবীদের পবিত্র রক্ত যখন মাটিতে ঝরে পড়ে তখন আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে| বনী ইসরাইলের পাপিষ্ঠ শাসক এবং তার অবাধ্য প্রজারা যখন পিতা ও পুত্র এই দুই মহান নবীকে নির্মমভাবে হত্যা করল তখন আল্লাহর কঠিন আযাব আর ক্রোধ তাদের দিকে ধেয়ে আসতে শুরু করল। আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'আলা বনি ইসরাইলের উপর এমন এক ভয়াবহ ও নিষ্ঠুর জাতিকে চাপিয়ে দিলেন যার তান্ডব কল্পনাও করা যায় না। এই শত্রুর নাম ছিল বুখ নাসার। যাকে ইতিহাসে সম্রাট নেবুচাদ নেসার নামেও ডাকা হয়। সে ছিল বাবিল বা ব্যাবিলনের এক অত্যন্ত পরাক্রমশালী, শক্তিশালী এবং ভীষণ নিষ্ঠুর শাসক। বুখ নাসার তার এক বিশাল এবং অপরাজীয় সৈন্যদল নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাস বা জেরুজালেম শহরের উপর ঝড়ের গতিতে আক্রমণ চালালো। তার সৈনরা শহরে প্রবেশ করেই বনি ইসরাইলের অবাধ্য প্রজাদের উপর নির্মম ধ্বংসযোজ্ঞ শুরু করে দিল। তারা ছোট বড় নারী পুরুষ কাউকে রেহাই দিল না। শহরের রাস্তাগুলোর রক্তে লাল হয়ে গেল এবং হাজার হাজার মানুষকে তলোয়ারের আঘাতে শেষ করে দেওয়া হলো। কাফেররা যে পবিত্র নবীদের ভর বাড়ি ধ্বংস করেছিল এবং বায়তুল মুকাদ্দাসকে অপবিত্র করেছিল আজ বুখ নাসারের বাহিনী সেই পুরো শহরকে ধূলিসাৎ করে দিল। তারা হযরত সুলাইমান আলাইহিস সালামের তৈরি করা সেই ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত সুন্দর ইবাদাতখানা অর্থাৎ বায়তুল মুকাদ্দাস মসজিদকে পুরোপুরি ভেঙে মাটির সাথে মিশিয়ে দিল এবং মসজিদের ভেতরে থাকা মূল্যবান সোনা রূপ এবং পবিত্র সম্পদগুলো লুণঢ করে ব্যাবিলনে নিয়ে গেল। বনি ইসরাইলের এই ধ্বংসযোজ্ঞের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত আশ্চর্যজনক ঘটনা তাফসীরের বইগুলোতে উল্লেখ পাওয়া যায়। বলা হয়ে থাকে যে বুখনাচারের বাহিনী যখন জেরুজালেম শহরের একটি বিশেষ স্থানে প্রবেশ করল তখন তারা দেখতে পেল সেখানকার একটি পাথরের উপর থেকে অবিরাম রক্ত বেরোচ্ছে এবং সেই রক্ত ফুটন্ত বাণীর মত অনবরত টকবক করে ফুটছে। বুক নাসার অত্যন্ত অবাক হয়ে শহরের লোকদের ডেকে জিজ্ঞাসা করল যে এই রক্ত কার এবং কেন এটি এভাবে ফুটছে? কিন্তু ভয়ে কেউ প্রথমে মুখ খুলতে চাইলো না। অবশেষে যখন তাদের উপর নির্যাতন চালানো হলো তখন তারা কাঁপতে কাঁপতে স্বীকার করল যে এটি হলো আল্লাহর মহান নবী হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের পবিত্র রক্ত যাকে এদেশের পাপিষ্ঠ রাজা অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিল। বনী ইসরাইলের লোকেরা অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে বলল যে তার শাহাদাতের পর থেকে আজ দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেছে কিন্তু তার এই পবিত্র রক্ত কোনভাবেই শান্ত হচ্ছে না। মাটি দিয়ে চেপে রাখলেও এটি অনবরত এভাবে ফুটতেই থাকে। এই কথা শুনে বুখ নাসার ক্রোধে ফেটে পড়ল এবং সে কসম খেল যে যতক্ষণ না এই রক্ত শান্ত হবে ততক্ষণ সে বনি ইসরাইলের মানুষকে হত্যা করতেই থাকবে। এরপর সে এক এক করে হাজার হাজার পাপিষ্ঠ বনী ইসরাইলকে সেই রক্তের উপর এনে হত্যা করতে লাগলো এবং অবশেষে যখন বনি ইসরাইলের একটি বিশাল অংশ ধ্বংস হয়ে গেল তখন আল্লাহর কুদরতে হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের সেই পবিত্র রক্ত ফুটন্ত অবস্থা থেকে শান্ত হয়ে গেল এবং মাটির সাথে মিশে গেল আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'আলা পবিত্র কুরআনের সূরা বনী ইসরাঈলে এই ধ্বংসযজ্ঞের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। বুখ নাসারের এই আক্রমণের মাধ্যমে বনি ইসরাইলের অহংকার পুরোপুরি ধুলোই মিশে গিয়েছিল। হাজার হাজার অবাধ্য মানুষকে হত্যা করার পর যারা বেঁচে ছিল তাদের সবাইকে বুকনাসার বন্দী করে এবং লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে গোলাম বা ক্রীতদাস বানিয়ে নিজের দেশ ব্যাবিলনে নিয়ে গেল। দীর্ঘকাল ধরে তারা সেখানে পরাধীনতার চরম অপমান ও কষ্টের জীবন পার করতে বাধ্য হয়েছিল। এটি ছিল পবিত্র নবীদের হত্যা করা এবং আল্লাহর হুকুম অমান্য করার এক দুনিয়াবী কঠিন শাস্তি। প্রিয় দর্শক যে করাত দিয়ে চেরার সেই বহুল প্রচলিত ঘটনাটি কোন সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত না হলেও বনী ইসরাইল কর্তৃক হযরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম এবং হযরত ইয়াহিয়া আলাইহিস সালামের শাহাদাতের বিষয়টি এবং তার পরিণামে বনী ইসরাইলের উপর নেমে আসা আল্লাহর ভয়ঙ্কর গাজবের বিষয়টি সম্পূর্ণ ধ্রুব সত্য। আমরা যদি দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হতে চাই তবে আমাদের অবশ্যই আল্লাহর প্রেরিত নবীদের পথকে অনুসরণ করতে হবে ইসলামের সঠিক ও বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং যেকোনো বানোয়াট ঘটনা প্রচার করা থেকে বিরত থাকতে হবে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা'আলা আমাদের সবাইকে সঠিক বুঝ দান করুন এবং নবীদের দেখানোর সহজ সরল পথে চলার তৌফিক দান করুন আমিন হুম।

Need a transcript for another video?

Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.

Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact

সত্যিই কি হযরত জাকারিয়া (আঃ)-কে করাত দিয়ে চেরা হয়েছিল? আস...