চোখ বন্ধ করে একবার যুদ্ধের ময়দানের সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যটা কল্পনা করুন। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে রোমান সাম্রাজ্যের লাখো সৈন্যের বিশাল এক বাহিনী। তাদের সারা শরীর ভারী লোহার বর্মে ঢাকা। মাথা থেকে পা পর্যন্ত শুধু তলোয়ার আর বর্ষা চিকচিক করছে। আর তাদের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে মুসলমানদের একটি ছোট দল। রোমান সেনাপতি অহংকার করে মুসলমানদের দিকে তাকিয়ে হাসছে। সে ভাবছে এই সামান্য কয়েকটা মানুষ আমাদের কি করবে? ঠিক সেই মুহূর্তে মুসলিম বাহিনীর শাড়িভেদ করে একজন মানুষ ঘোড়া ছুটিয়ে সামনে এগিয়ে এলেন। রোমানরা ভাবল হয়তো কোন বড় সেনাপতি বর্ম পড়ে এসেছে। কিন্তু না ওই লোকটি ঘোড়া থেকে নেমে এমন এক কাজ করলেন যা দেখে রোমানদের চোখ কপালে উঠে গেল। তিনি তার হাতের ঢাল ফেলে দিলেন। গায়ের বর্ম খুলে ফেললেন। এমনকি নিজের পরনের জামাটাও ছুড়ে ফেলে দিলেন। তিনি একদম খালি গায়ে শুধু হাতে একটা তলোয়ার নিয়ে একা সেই হাজার হাজার লোহার বর্ম পড়া রোমান স্বৈনের দিকে পাগলের মত ছুটে গেলেন। কে ছিলেন এই অকুতভয় বীর? যাকে দেখে রোমানরা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে নাম দিয়েছিল নেকেড ওয়ারিয়ার বা খালি গায়ের যোদ্ধা। এবং সেইদিন যুদ্ধের ময়দানে কালো নেকাব পড়া আরেকজন রহস্যময় যোদ্ধা কিভাবে রোমানদের কচুকাটা করেছিল চলুন ইতিহাসের সেই রক্ত মাখা এবং রোমাঞ্চকর ময়দানে ফিরে যাই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের কয়েক বছর পরের কথা। মদিনার মসনবে তখন খলিফা হিসেবে আসিন আছেন ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু। মুসলিম বাহিনী তখন আর শুধু আরবের মরুভূমির বুকেই সীমাবদ্ধ নেই। সত্যের আলো ছড়িয়ে দিতে তারা বেরিয়ে পড়েছেন তৎকালীন বিশ্বের দুই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সুপারপাওয়ার রোমান বাইজেন্টাইন এবং পারস্য সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে। সিরিয়ার আজনাদাইন নামক এক বিশাল প্রান্তরে রোমানদের এক বিশাল সেনাবাহিনী এসে জড়ো হল। ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী সেই ময়দানে রোমান সৈনের সংখ্যা ছিল প্রায় 90 হাজার থেকে এক লাখের কাছাকাছি। তাদের সেনাপতির নাম ছিল ওয়ারদান। সে ছিল অত্যন্ত অহংকারী, নিষ্ঠুর এবং রণকৌশলে পারদর্শী এক শাসক। তার বাহিনীর প্রতিটি সৈনের গায়ে ছিল মজবুত লোহার বর্ম, মাথায় লোহার হেলমেট আর হাতে বিশাল সব ঢাল। তারা দেখতে ছিল আক্ষরিক অর্থেই এক ভয়ঙ্কর চলন্ত লোহার পাহাড়ের মতো। আর অন্যদিকে রোমানদের ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ইসলামের ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ বীর সেনাপতি আল্লাহর তরবারী হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু। কিন্তু তার সাথে সৈন্য সংখ্যা কত ছিল জানেন? মাত্র 24 হাজার। এক লাখ সুসজ্জিত রোমান সেনার বিপরীতে মাত্র 24 হাজার মুসলিম মুজাহিদ। রোমানরা যখন দূর থেকে মুসলিমদের এই ছোট বাহিনীকে দেখল তারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তারা তাচ্ছিল্য করে একে অপরকে বলতে লাগল, দেখো আরবের এই সামান্য কয়েকটা ভিখারী এসেছে আমাদের সাথে লড়তে। এদের তো আমরা আজ ঘোড়ার পায়ের নিচেই পিশে ফেলব। সে যুগে যুদ্ধ শুরুর আগে একটি নিয়ম ছিল। দুই দলের সেরা বীর যোদ্ধারা আগে একা একা লড়তে আসতো। রোমানদের সেনাপতি ওয়ারদান তার বাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী, সবচেয়ে বড় এবং ভয়ঙ্কর এক যোদ্ধাকে ময়দানের মাঝখানে পাঠালো। সে ময়দানের মাঝখানে এসে চরম অহংকারের সাথে হুংকার দিয়ে বলল, কে আছিস মুসলমানদের মধ্যে যে আজ আমার এই তলোয়ারের স্বাদ নিতে চাস। সাহস থাকলে আসো আমার সামনে। তার এই দাম্ভিক কথা শেষ হতে না হতেই মুসলিম বাহিনীর শাড়ি ভেদ করে একজন ছিপছিপে গড়নের কিন্তু অত্যন্ত ক্ষিপ্র এক সাহাবী বেরিয়ে এলেন। তার নাম হযরত দিরার ইবনে আজওয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহু। হযরত দিরার রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি মৃত্যুকে কখনো ভয় পেতেন না বরং শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করার জন্য তিনি সর্বদা তৃষ্ণার্ত থাকতেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধনী এক পরিবারের সন্তান। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তার সব ধনসম্পদ বিলিয়ে দিয়ে শুধুমাত্র আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের ময়দানকে নিজের আসল ঘর বানিয়ে নিয়েছিলেন। হযরত দিলার রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন ঘোড়া ছুটিয়ে সামনে এলেন তখন সেই বিশাল দেহী রোমান যোদ্ধা তাকে দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো। সে ভাবল এই ছোটখাটো লোকটা আমার সাথে লড়বে। একে তো আমি এক কোপেই শেষ করে দেব। কিন্তু যুদ্ধ শুরু হতেই রোমানদের সেই অহংকার মাটিতে মিশে গেল। হযরত দিার রাদিয়াল্লাহু আনহুর তলোয়ার চালানোর গতি বাতাসের চেয়েও প্রখর ছিল| রোমান যোদ্ধা কিছু বুঝতে ওঠার আগেই চোখের পলক ফেলার আগেই হযরত দিনার রাদিয়াল্লাহু আনহু তার বর্ম ভেদ করে তাকে মাটিতে ফেলে দিলেন এক কোপেই সেই বিশাল রোমান যোদ্ধা শেষ এই দৃশ্য দেখে রোমানদের সেনাপতি ওয়ারদান রেগে আগুন হয়ে গেল সে ভাবল এটা হয়তো একটা দুর্ঘটনা সে তার বাহিনীর আরেকজন বড় যোদ্ধাকে পাঠালো হযরত দিার রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকেও চোখের পলকে হত্যা করলেন। এরপর আরেকজন তারপর আরো একজন হযরত দিনার রাদিয়াল্লাহু আনহু একাই ময়দানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রোমানদের বেশ কয়েকজন সেরা বীরকে মাটিতে শুইয়ে দিলেন রোমানদের চোখে মুখে এবার তাচ্ছিল্যের বদলে চরম আতঙ্ক নেমে গেল তারা বুঝতে পারল এটা কোন মানুষ নয় ওয়ারদান তখন যুদ্ধের নিয়ম ভেঙে তার সৈন্যদের হুকুম দিল ওকে একা মারা যাবে না একদল সৈন্য একসাথে যাও এবং চারদিক থেকে ওকে ঘিরে ফেলো সেনাপতির নির্দেশ পেয়ে রোমানদের একদল সুসজ্জিত সৈন্য তলোয়ার আর বর্ষা উচি করে হযরত দিার রাদিয়াল্লাহু আনহুর চারদিক থেকে ঘিরে ফেলল। তারা ভাবলো এবার এই মুসলমানকে তারা টুকরো টুকরো করে ফেলবে। কিন্তু হযরত দিরার রাদিয়াল্লাহু আনহু তখন এমন এক কাজ করলেন যা পৃথিবীর কোন যুদ্ধক্ষেত্রে কোন সেনাপতি বা যোদ্ধা কখনো কল্পনাও করেনি। তিনি দেখলেন রোমানদের হাতে লম্বা বর্ষা আর গায়ে ভারী বর্ম। তিনি নিজেও বর্ম পড়া ছিলেন। কিন্তু এই ভারী বর্মের কারণে তার নড়াচড়া করতে কষ্ট হচ্ছিল। তিনি শত্রুর আক্রমণের জবাব ততটা দ্রুত দিতে পারছিলেন না যতটা তিনি চাইছিলেন। হাতের ভারী ঢালটি সোজোরে মাটিতে ছুড়ে ফেলে দিলেন। তারপর দুই বাহিনীর লাখো সৈনের অবাক দৃষ্টির সামনে তিনি তার গায়ের লোহার বর্মটি খুলে ফেলে দিলেন। শুধু তাই নয় নিজের পরনের জামাটাও ছুড়ে ফেলে দিলেন। তিনি একদম খালি গায়ে শুধু হাতে একটা তলোয়ার নিয়ে একা সেই হাজার হাজার লোহার বর্ম পড়া রোমান সৈনের দিকে পাগলের মত ছুটে গেলেন। রোমানরা তো আর হযরত দিনার রাদিয়াল্লাহু আনহুর নাম জানতো না। তাই তারা ভয়ে তার নাম দিল নেকেড ওয়ারিয়ার বা খালি গায়ের যোদ্ধা। তার এই অভাবনীয় এবং ভয়ঙ্কর রূপ দেখে মুহূর্তের মধ্যে রোমানদের পুরো বাহিনীর মনোবল ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তবে যুদ্ধের ময়দানে পরিস্থিতি সবসময় একরকম থাকে না। লড়াই করতে করতে হযরত দিার রাদিয়াল্লাহু আনহু রোমানদের বাহিনীর অনেক ভেতরে একদম শত্রুদের হৃদপিণ্ডের কাছে চলে গিয়েছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ একা আর তার চারদিকে লাখো শত্রু। রোমানরা যখন দেখল এই লোকটা একা তাদের অনেক ভেতরে চলে এসেছে তখন তারা চালাকি করে পেছন থেকে তার রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করে দিল। তারা দূর থেকে বৃষ্টির মত তীর আর লম্বা বর্ষা ছুড়তে লাগল। শেষ পর্যন্ত অবিরাম যুদ্ধ করে ক্লান্ত এবং সম্পূর্ণ একা হযরত দিরার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে রোমানরা চারদিক থেকে আষ্টপৃষ্ঠে ঘিরে ফেলল। তারা তাকে সাথে সাথে হত্যা করল না কারণ তারা চাইল মুসলমানদের এই ভয়ঙ্কর দানবকে জীবন্ত বন্দী করে তাদের সেনাপতি ওয়ারদানের কাছে নিয়ে যাবে এবং অমানবিক নির্যাতন করে মারবে। হযরত দিার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে যখন কাফেররা ভারী লোহার শিকল পড়িয়ে বন্দী করে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু রাগে গর্জন করে উঠলেন। তিনি তার ঘোড়ার লাগাম শক্ত করে ধরে সাথীদের উদ্দেশ্যে বললেন, আল্লাহর কসম আমার ভাই দিারকে আমি কাফেরদের হাতে কিছুতেই ছেড়ে [মিউজিক] দেবো না। চলো আমরা আজ রোমানদের গৃহ ভেদ করে তাকে ছিনিয়ে আনবো। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর নেতৃত্বে একদল অকুতভয় মুজাহিদ রোমান বাহিনীর দিকে ঝড়ের বেগে ছুটে গেল। কিন্তু রোমানদের সংখ্যা তো লাখের কাছাকাছি। তারা বিশাল এক লোহার প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে মুসলিমদের পথ আটকে দিল। শুরু হলো এক ভলঙ্কর এবং রক্তক্ষই লড়াই। তলোয়ারের সাথে তলোয়ারের সংঘাত, বর্ষার আঘাত, ঘোড়ার ডাক আর আহতদের আর্তনা দেয়ে আজনা ডাইনের প্রান্তর যেন থরথর করে কাঁপতে লাগলো। ঠিক সেই মুহূর্তে যখন মুসলিম বাহিনী রোমানদের শক্ত প্রতিরক্ষার সামনে একটু থমকে দাঁড়িয়েছে, কেউ এগোতে পারছে না। তখন মুসলিম শিবিরের একদম পেছন দিক থেকে এক অদ্ভুত এবং গায়ে কাঁটা দেওয়া দৃশ্য দেখা গেল। সবাই দেখল একটি কুচকুচে কালো রঙের তেজী ঘোড়া বাতাসের চেয়েও প্রবল বেজে ছুটে আসছে। সেই ঘোড়ার পিঠে বসে আছে এক রহস্যময় যোদ্ধা। তার আপাদমস্তক কালো পোশাকে ঢাকা। তার মুখমন্ডল একটি কালো নেকাব বা কাপড় দিয়ে এমন শক্তভাবে বাঁধা যে শুধু তার জলজলে দুটি চোখ দেখা যাচ্ছে। তার ডান হাতে একটি লম্বা এবং চকচকে বর্ষা। সেই রহস্যময় যোদ্ধা কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে সেনাপতির কোন নির্দেশের অপেক্ষা না করে সোজা রোমান বাহিনীর সেই ঘন এবং দুর্ভেদ্য শাড়ির দিকে পাগলের মতো ছুটে গেল। সে এমনভাবে ঘোড়া ছোটাচ্ছিল যেন পৃথিবীর কোন কিছুর প্রতি তার মায়া নেই। এমনকি নিজের জীবনের প্রতিও নয়। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং অন্যান্য সাহাবীরা অবাক হয়ে এই দৃশ্য দেখলেন। তারা ভাবলেন, কে এই পাগল যোদ্ধা? সে কি একা লাখো সৈনের মাঝে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চায়? কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেই রহস্যময় যোদ্ধা যা করল তা দেখে হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর মত মহাবীরেরও বিশ্বয়ে চোখ কপালে উঠে গেল। যোদ্ধাটি রোমানদের শাড়ির একদম কাছে গিয়ে তার বর্ষাটি সজরে চালালো। প্রথম আঘাতেই একজন বিশালদেহী রোমান সৈন্য ঘোড়া থেকে ছিটকে মাটিতে পড়ল। তারপর সে ডানে বামে সামনে পেছনে এমন ক্ষিপ্র গতিতে বর্ষার তলোয়ার চালাতে লাগলো যে রোমানরা হতভম্ব হয়ে গেল। তারা দিশা পাচ্ছিল না যে এই একজন মানুষ কিভাবে এত দ্রুত আঘাত করছে। সেই কালো নেকাব পরা যোদ্ধা একাই রোমানদের বিহ ভেদ করে তাদের শাড়ি ছিন্ন ভিন্ন করে সোজা তাদের বাহিনীর একদম ভেতরে ঢুকে পড়ল। যেখানে হযরত দিলার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। সে ঠিক সেই দিকেই এগোতে লাগল। তার তলোয়ারের তীব্র কোপে রোমানদের মাথাগুলো যেন পাকা ফসলের মতো মাটিতে লুটিয়ে পড়তে লাগল। রোমানরা ভয়ে চিৎকার করতে শুরু করল। পালাও এটা কোন মানুষ নয়। এটা নিশ্চয়ই মুসলমানদের সেই মহাবীর সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ সে আজ একাই আমাদের শেষ করে দেবে। দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজে চরম অবাক হয়ে গেলেন। তার পাশে থাকা সাহাবীরা বিশ্বয়ের সাথে বললেন, হে সেনাপতি, ওই যোদ্ধা কি আপনি? কিন্তু আপনি তো আমাদের সাথেই এখানে দাঁড়িয়ে আছেন। তাহলে ওই লোকটা কে যে আপনার চেয়েও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে যুদ্ধ করছে। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু মুচকি হেসে বললেন আল্লাহর কসম আমি জানিনা সে কে। কিন্তু সে যেই হোক না কেন সে আল্লাহর একজন সাচ্চা মুজাহিদ। সে নিশ্চয়ই আমাদের ভাই দিলারকে উদ্ধার করতে শত্রুর গভীরে প্রবেশ করেছে। চল আমরাও তার তৈরি করা পথ ধরে তার পিছু নি। এই কথা বলে তিনি এবং তার বাহিনী সেই রহস্যময় যোদ্ধার তৈরি করা ফাঁকা পথ ধরে রোমান বাহিনীর একদম ভেতরে ঢুকে পড়লেন। তারা দেখলেন সেই কালো নেকাব পরা যোদ্ধা রোমানদের মাঝখানে এমন তান্ডব চালাচ্ছে যে শত্রুর রক্তে তার কালো পোশাক লাল হয়ে গেছে। তার বর্ষার আঘাতে রোমানদের বড় বড় সেনাপতিরা মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। এভাবে একটানা দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধ করার পর একসময় সেই যোদ্ধাটি ক্লান্ত হয়ে পড়ল। তার ঘোড়াটি হাপাচ্ছিল। সে একটু পিছু হোটে মুসলিম বাহিনীর শাড়ির কাছে ফিরে এলো। [মিউজিক] তার সারা শরীর রক্তে মাখামাখি কিন্তু তার চোখে তখনও জ্বলছে আগুনের মত জেদ। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু তার কাছে গিয়ে ঘোড়া থামালেন। তিনি অত্যন্ত সম্মান এবং প্রবল কৌতুহল নিয়ে সেই রহস্যময় যোদ্ধাকে বললেন, হে বীর মুজাহিদ, তুমি আজ যা করেছ তা কোন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তুমি নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে আল্লাহর রাস্তায় আজ যে বিয়ত্ব দেখিয়েছো তাতে আমরা সবাই মুগ্ধ। তুমি কে? দয়া করে তোমার মুখের নেকাব খোলো। আমরা তোমার চেহারা দেখতে চাই। আমরা তোমাকে যথাযথ সম্মান জানাতে চাই। কিন্তু সেই যোদ্ধা কোন উত্তর দিল না। সে মুখ ফিরিয়ে আবার রোমানদের দিকে ঘড়া ছোটানোর প্রস্তুতি নিতে লাগলো। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবার একটু জোরে ধমকের সুরে বললেন আমি মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে তোমাকে নির্দেশ দিচ্ছি তোমার পরিচয় দাও তুমি কে সেনাপতির নির্দেশ অমান্য করার কোন সুযোগ নেই সেই রহস্যময় যোদ্ধা তখন বাধ্য হয়ে ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরল তার হাত কাঁপছিল সে ধীরে ধীরে তার মুখের কালো নেকাবটি খুলতে শুরু করল এবং যখন সে নেকাবটি ছড়ালো তখন হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং সেখানে উপস্থিত সব সাহাবীর মুখ বিশ্বয়ে হা হয়ে গেল। তাদের হাত থেকে যেন তলোয়ার খসে পড়ার উপক্রম হলো। তারা যা দেখলেন তা তারা কল্পনাতেও আনেননি। নেকাবের আড়ালে কোন পুরুষের চেহারা ছিল না। সেখানে কোন গোফ বা দাড়ি ছিল না। সেই ভয়ঙ্কর রক্ত পিপাসু যোদ্ধা যে একাই শত শত রোমানকে কচুকাটা করে তাদের বিহ ভেদ করেছিল সে আসলে কোন পুরুষ ছিল না। সে ছিল একজন নারী। হ্যাঁ। একজন নারী। তার চেহারা ধুলো আর রক্তে মাখামাখি। তার চোখ দুটো পানিতে ছলছল করছে কিন্তু সেই চোখে ভয়ের কোন লেশমাত্র নেই। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বিশ্বয়ে হতবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কে তুমি? তুমি একজন নারী হয়ে এত ভয়ঙ্কর যুদ্ধ করছো? সেই নারী তখন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, হে সেনাপতি আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি বাধ্য হয়ে এই পুরুষের বেশ ধারণ করেছি। আমি কোন যুদ্ধ করতে আসিনি। আমি এসেছি আমার কলিজার টুকরো ভাইকে বাঁচাতে। আমি হলাম হযরত খাওলা বিন্তে আজোয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহা। আর আপনারা যাকে বন্দি হতে দেখেছেন সেই খালি গায়ের যোদ্ধা দিার ইবনে আজওয়ার সে আমার আপন ভাই। সুবহানাল্লাহ। একজন বোনের ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে? একজন বোন যে তার ভাইয়ের জন্য লাখো শত্রুর মাঝখানে নিজের জীবন বাজি রেখে ঝাপিয়ে পড়েছে। হযরত খাওলা বিনতে আজওয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহা বললেন, আমি যখন মহিলাদের তাবুতে বসে শুনিলাম, আমার ভাইকে কাফেররা শিকল পড়িয়ে বন্দি করেছে, তখন আমার কলিজা ফেটে যাচ্ছিল। আমি আর তাবুতে বসে থাকতে পারলাম [সশব্দ হাসি] না। আমি ঘোড়া আর অস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে পড়েছি। আজ হয় আমি আমার ভাইকে কাফেরদের হাত থেকে মুক্ত করব না হয় আমি তার পাশেই শহীদ হয়ে যাব। হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু এই কথা শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি এই অকল্পনীয় বীরত্ব এবং ভাই বোনের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দেখে গভীরভাবে আবেগ আপৃত হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, হে খাওলা তোমার মত বোন যতদিন মুসলিম উম্মাহে থাকবে কোন ভাই কখনো পরাজিত হতে পারে না। তুমি একা নও। আমরা সবাই তোমার সাথে আছি। চলো আজ আমরা দিলারকে মুক্ত করেই তবে ময়দান ছাড়বো। পুরো মুসলিম বাহিনী আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে ফেটে পড়ল। তাদের সকল ক্লান্তি যেন মুহূর্তের মধ্যে কোথায় উধাও হয়ে গেল। হযরত খাওলা বিনতে আজওয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহা তার কালো নেকাব আবার টেনে নিলেন এবং সবার আগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলেন রোমানদের সেই দুর্ভেদ্য শাড়ির দিকে, যেখানে তার ভাই হযরত দিরার ইবনে আজওয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে রোমান সেনাপতি ওয়ারদান তার সুরক্ষিত তাবুতে বসে আনন্দে আত্মহারা। সে ভাবছে মুসলমানদের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সেই খালি গায়ের যোদ্ধাকে সে বন্দি করতে পেরেছে। এটাই তার জীবনের বড় জয়। সে হযরত দিরার ইবনে আজওয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ভারী লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে তার সামনে দাঁড় করালো। তার সারা শরীর রক্তে মাখামাখি। কিন্তু তার চোখে বিন্দুমাত্র ভয় বা অনুশোচনা নেই। তিনি ওয়ারদানের দিকে এমনভাবে তাকিয়েছিলেন যেন এক আহত সিংহ তার শিকারীর দিকে তাকিয়ে আছে। ওয়ারদান তাচ্ছিল্য করে হাসল এবং দম্ভের সাথে বলল, কিরে আরবের ভিখারী? তোর সেই অহংকার কোথায় গেল? তুই তো একাই আমার পুরো বাহিনীকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলি। এখন তো তুই আমার পায়ের কাছে শিকলে বাঁধা কুকুরের মতো পড়ে আছিস। আমি তোকে এমন শাস্তি দেবো যা ইতিহাসে কেউ কখনো দেখেনি। আমি তোর চামড়া ছিলে রোমের রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখবো। হযরত দিার ইবনে আজওয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহু একটুও না ঘাবড়ে মুচকি হাসলেন। তার সেই হাসিতে ছিল ঈমানের এক অগাধ আত্মবিশ্বাস। তিনি বললেন, হে রোমান কুকুর তুই আমার শরীরকে শিকল পড়াতে পারিস কিন্তু আমার ঈমানকে বন্দি করার ক্ষমতা তোর নেই। আমার আল্লাহ আমাকে মৃত্যু দিলে আমি হাসতে হাসতে জান্নাতে যাব। আর যদি তিনি আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন তবে মনে রাখিস আমার এই খালি হাত দিয়েই আমি তোর মাথা শরীর থেকে আলাদা করব। আমার ভাইয়েরা আমাকে এখানে রেখে যাবে না। ওয়ারদান এই কথা শুনে রেগে আগুন হয়ে গেল। সে জল্লাদকে ডাকল এবং হুকুম দিল একে এক্ষুনি আমার তাবুর বাইরে নিয়ে যাও এবং এর চামড়া ছিলে ফেলার ব্যবস্থা করো। কিন্তু আসমানের মালিক মহান আল্লাহর ফয়সালা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জল্লাদ হযরত দিরার ইবনে আজওয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়ে তাবুর বাইরে পা রাখতেই রোমান শিবিরের এক প্রান্ত থেকে শুরু হলো এক ভয়ঙ্কর হট্টগোল আর চিৎকার। ওয়ারদান তার তাবু থেকে বেরিয়ে এল। সে দেখল ধুলোর এক বিশাল কুন্ডলী আকাশ ঢেকে দিচ্ছে আর সেই ধুলোর ভেতর থেকে জ্বলন্ত তরবারি হাতে বের হয়ে আসছে সেই কালো নেকাব পরা রহস্যময় যোদ্ধা এবং তার ঠিক পেছনে সেনাপতি হযরত খালিদ বিন ওয়ালিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু সহ হাজার হাজার মুসলিম মুজাহিদের এক উত্তাল স্রোত হযরত খাওলা বিন্তে আজওয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহার ঘোড়াটি ঝড়ের বেগে রোমানদের বিহভেদ করে ঠিক সেখানে চলে এল তিনি ডানে বামে উন্মত্তের মত তলোয়ার চালাচ্ছিলেন এবং চিৎকার করে ডাক ছিলেন। হে আমার ভাই দিার তুমি কোথায়? আমি আসছি। রোমান সৈন্যরা এই অপ্রত্যাশিত এবং প্রচন্ড আক্রমণে পুরোপুরি দিশেহারা হয়ে পড়ল। তারা স্বপ্নেও ভাবেনি যে মুসলিমরা এত দ্রুত এবং এত ভয়ঙ্করভাবে তাদের শিবিরের ভেতরে ঢুকে পড়বে। সেনাপতির অসাধারণ রণকৌশল এবং একজন বোনের উন্মাদনার সামনে রোমানদের বিশাল বাহিনী তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে লাগল। লড়াই করতে করতে তারা একসময় ঠিক সেই জায়গায় পৌঁছে গেলেন যেখানে শেকল পড়িয়ে রাখা হয়েছিল। হযরত খাওলা বিনতে আজওয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহা চলন্ত ঘড়া থেকে লাফিয়ে নেমে এক কোপে প্রহরীদের শেষ করে দিলেন। চোখের পলকে তিনি তার ভাইয়ের গায়ের শেকলগুলো কেটে ফেললেন। হযরত দিরার ইবনে আজোয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহু যখন মুক্ত হলেন তখন তার সেই চিরচেনা খালি গায়ে যোদ্ধার রূপ যেন শতগুণ শক্তি নিয়ে আবার ফিরে এল। তিনি মাটি থেকে পড়ে থাকা একটি তলোয়ার তুলে নিলেন। তার চোখে তখন প্রতিবাদের আগুন। তিনি চিৎকার করে বললেন, হে আমার বোন, আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুন। এবার দেখো আমি এই কাফেরদের সাথে কি করি। হযরত দিরার ইবনে আজোয়ার রাদিয়াল্লাহু আনহু আবার সেই খালি গায়ে রক্তমাখা শরীরে সিংহের মত রোমানদের উপর ঝাপিয়ে পড়লেন।
Get free YouTube transcripts with timestamps, translation, and download options.
Transcript content is sourced from YouTube's auto-generated captions or AI transcription. All video content belongs to the original creators. Terms of Service · DMCA Contact